গহীন গ্রামের অন্দরমহল - অধ্যায় ২২
**আড়াল হওয়ার খেলা**
**
এভাবেই অন্দরমহলের দেয়ালগুলো এখন রবির জন্য এক মায়াবী বৃত্ত। সখিনা, রানি আর টুকটুকি—তিনজনেই এখন রবির প্রতিটি ইশারা চিনে নিয়েছে। তাদের জীবন আবর্তিত হয় রবির ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু রবি এখন নিজের অজান্তেই একঘেয়েমি অনুভব করছে। সে এমন কিছু খুঁজছে যা অন্দরমহলের এই পরিচিত গণ্ডির বাইরের, যেখানে কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই।
গ্রামের বাজারে যাওয়ার পথটা রবি আজ একটু অন্যভাবে ব্যবহার করতে শুরু করল। এতদিন সে সোজা পথে বাজার যেত, কিন্তু এখন সে বেছে নিল মাঠের মাঝখানের ওই মেঠো পথটা, যেটার পাশেই মফিজের বাড়ি। মফিজ মানুষটা সহজ-সরল, দিনমজুরের কাজ করে দিনভর বাড়ির বাইরে থাকে। তার বৌ, ফাতেমা, সারাদিন ঘরের আনাচে-কানাচে আর উঠোনেই কাটিয়ে দেয়।
ঘটনাটা ঘটল এক দুপুরের রোদে। রবি বাজার থেকে ফেরার পথে তৃষ্ণার্ত হয়ে মফিজের বাড়ির সামনের কুয়োর পাড়ে থামল। কুয়োর ধারের সেই পুরোনো আমগাছটার ছায়ায় ফাতেমা দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে একটা কাঁসার ঘটি। রবিকে দেখে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার পরনের সাধারণ শাড়িতে ঘামের দাগ, কপালে ছোট ছোট বিন্দু বিন্দু জল। ফাতেমার চোখের কোণে একধরনের গ্রাম্য লাজুকতা, যা রবির অন্দরমহলের নারীদের মধ্যে এখন আর নেই।
"রবি ভাই, এই ভরদুপুরে মেঠো পথে? বড় রোদ লেগেছে মনে হয়," ফাতেমা মৃদু স্বরে বলল।
রবি ঘটিটা হাতে নিয়ে জল খেতে খেতে ফাতেমার দিকে তাকাল। তার চাহনিটা সাধারণ নয়, তীক্ষ্ণ।
"তৃষ্ণাটা একটু বেশিই ছিল ফাতেমা। রাস্তাটা আজ বড্ড বড় মনে হচ্ছে।"
ফাতেমা আলতো হেসে ঘটিটা নিল। তার হাতের কঙ্কন ঝনঝন করে উঠল। রবি লক্ষ্য করল, ফাতেমার কব্জিটা সরু হলেও তার শরীরের গঠন বেশ ঋজু। ফাতেমা কোনো তাড়াহুড়ো করল না। সে কুয়োর পাড় থেকে জল টেনে রবির দিকে এগিয়ে দিল। এই সামান্য আদান-প্রদানটুকুর মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা কাজ করছিল।
"মফিজ তো বিকেলে ফেরে?" রবি প্রশ্ন করল, যেন সাধারণ আলাপচারিতা।
"হ্যাঁ, সূর্য ডোবার ঠিক আগে আগে," ফাতেমা নিচের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল।
রবি একটু এগিয়ে এল আমগাছটার ছায়ায়। ফাতেমার শরীরের কাছাকাছি আসতেই তার নাকে ভেসে এল মাটির সোঁদা গন্ধ আর ঘামের এক চিমটি লোনা সুবাস। এটা অন্দরমহলের নারীদের সেই গদবাধা সুগন্ধ নয়, এটা এক আলাদা জীবনের ঘ্রাণ। রবি কোনো অশালীন কথা বলল না, কোনো সরাসরি স্পর্শও করল না। সে শুধু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, ফাতেমার দিকে তাকিয়ে একটা হালকা হাসল।
"আবার দেখা হবে ফাতেমা," বলে রবি ধীর পায়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
পেছনে দাঁড়িয়ে ফাতেমা দেখছিল রবির চলে যাওয়া। তার মনের মধ্যে এক অস্থিরতার ঢেউ খেলে গেল, সে নিজেও জানে না কেন। আর রবি? অন্দরমহলের পথে হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবছিল ফাতেমার চোখের সেই ভীরু চাহনিটার কথা। সে জানে, এই বীজটা আজ কেবল বোনা হলো। অন্দরমহলের খবর সখিনা, রানি বা টুকটুকি বিন্দুমাত্র পেল না, তারা ঘরে তখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। রবির মনের গহীন কোণে এখন নতুন এক শিকারের পরিকল্পনা দানা বাঁধছে।
পরের কয়েকদিন রবি ঠিক একই সময়ে ওই পথ দিয়ে যাওয়া শুরু করল। কখনো জলের বাহানায়, কখনো বা মাঠের আলপথের খবর নেওয়ার অছিলায়। তাদের মধ্যে কথা বাড়ল, চোখের চাহনি গভীর হলো। রবি তার পৌরুষের এক নতুন খেলা শুরু করল—যেখানে শিকারি খুব ধীরস্থির, আর শিকার ধীরে ধীরে নিজের অজানতেই সেই মোহময়ী ফাঁদে পা দিচ্ছে।
পরপর তিনদিন রবি ঠিক একই সময়ে মফিজের বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াত করেছে। প্রতিটি দিন তাদের কথোপকথন একটু একটু করে দীর্ঘ হচ্ছে। প্রথম দিন ছিল শুধু কুশল বিনিময়, দ্বিতীয় দিন রবি তাকে জিজ্ঞেস করল মাঠের ফসলের অবস্থা কেমন, আর আজ, চতুর্থ দিনে এসে রবি থামল একদম মফিজের বাড়ির বারান্দার খুব কাছে।
ফাতেমা আজ শাড়িটা একটু অগোছালোভাবে জড়িয়েছে। রবির উপস্থিতি যেন তাকে একটু নার্ভাস করে তুলেছে, আবার একইসাথে এক গোপন ভালো লাগার আবেশে জড়িয়ে ফেলেছে। সে রবির দিকে তাকাল, এবার আর মাথা নিচু করে নয়, বরং তার চোখে এক অদ্ভুত কৌতূহল।
"রবি ভাই, বাড়ির সবাই কি ভালো আছে? আপনার ঘরের কোনো আওয়াজই তো বাইরে আসে না," ফাতেমা হঠাৎ প্রশ্নটা করে বসল।
রবি মৃদু হাসল, তার চোখে এক রহস্যময় দ্যুতি। সে বারান্দার খুঁটিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
"ঘরের ভেতরটা অন্দরমহল, ফাতেমা। বাইরের কোলাহল সেখানে পৌঁছায় না। আর অন্দরমহল সব সময় শান্ত হয় না, কখনো কখনো তা আগ্নেয়গিরির চেয়েও উত্তপ্ত থাকে।"
ফাতেমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল রবির কথার গভীরতায়। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রবির দিকে এক পা এগিয়ে এল। রবির শরীরের পুরুষালি গন্ধটা ফাতেমার নাকে ধাক্কা মারল। রবির পরনের পাঞ্জাবির হাতাটা গোটানো, তার শক্ত পেশিবহুল হাতগুলো ফাতেমার দৃষ্টি কেড়ে নিল। ফাতেমা নিজের আঁচলটা হাতের আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
"আমার জীবনটা কত সাধারণ, রবি ভাই। তুমি এই কয়েকটা দিন আমাকে সময় দিচ্ছো, কথা বলছেন, এটা খুবই ভালো লাগে আমার। আপনি যখন চলে যান, আমার মনে হয় যেন বড় কোনো কিছু মিস করছি।"
রবি ফাতেমার দিকে এক পা এগিয়ে এল। এবার তাদের মাঝখানে খুব কম দূরত্ব। রবি ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"সাধারণ জীবন তো শুধু অভ্যাসের দাস, ফাতেমা। সেই অভ্যাসের খাঁচা ভাঙার ক্ষমতা কিন্তু তোর হাতের মুঠোতেই আছে।"
রবি তার হাতের আলতো স্পর্শ রাখল ফাতেমার কাঁধের ওপর। কাপড়টা খুব পাতলা। স্পর্শের সাথে সাথে ফাতেমার সারা শরীর শিউরে উঠল। এটা শারীরিক স্পর্শের চেয়েও বেশি ছিল এক মানসিক দোলাচল। ফাতেমা পিছু হটল না, বরং রবির হাতের স্পর্শের তীব্রতায় তার নিশ্বাস ঘন হয়ে এল।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার ওপার থেকে কারো হাঁটার শব্দ পাওয়া গেল। ফাতেমা দ্রুত রবির থেকে এক হাত দূরে সরে গেল। রবি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের জামা ঠিক করতে করতে বলল,
"আগামীকাল বাজারে যাওয়ার সময় আমি একটু তাড়াতাড়ি ফিরব। তখন সময় পাওয়া যাবে।"
ফাতেমা কোনো কথা বলল না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রবি যখন সেখান থেকে বেরিয়ে এল, তার মনে এক অমোঘ জয়ের হাসি। অন্দরমহলের সখিনা, রানি বা টুকটুকি—কেউই জানে না রবি এখন অন্দরমহলের বাইরে এক নতুন কামনার সাম্রাজ্য গড়ার ভিত্তি স্থাপন করছে।
বাড়িতে ফেরার সময় রবির মনে হলো, এই যে নিষিদ্ধ কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা, তা অন্দরমহলের তৃপ্তির চেয়েও অনেক বেশি নেশার। সন্ধ্যা নামার আগে রবি বাড়িতে পৌঁছাল। ঘরের ভেতরে সখিনা রান্নায় ব্যস্ত, রানি কলপাড়ে জল তুলছে। তাদের চেনা রূপ, চেনা ঘ্রাণ। রবি তাদের দিকে একবার তাকিয়েই নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। তার মন পড়ে আছে মফিজের বাড়ির সেই বারান্দায়, যেখানে ফাতেমার ভীরু চাহনি এখন তার পৌরুষের নতুন লক্ষ্য। অন্দরমহলে এখন শান্তি, কিন্তু রবির ভেতরের সেই আগ্নেয়গিরিটা যেন বাইরে নতুন চারণভূমি খুঁজছে।
**
পরদিন বিকেলের আকাশটা ছিল অদ্ভুত রকমের লাল। মফিজের বাড়িটা তখন বেশ নির্জন, কারণ মফিজ মাঠ থেকে ফিরতে এখনো দেরি আছে। রবি আজ বাজারের পথে নয়, সোজা মফিজের বাড়ির পেছনের বাগানটার দিকে এগিয়ে গেল। ঝোপঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে একটা শব্দ করল—পাখির ডাকের মতো, যা ফাতেমার সাথে তাদের গোপন সংকেত।
ফাতেমা দেরি করল না। সে যেন রবির ডাকের অপেক্ষাতেই ছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে সে যখন বাগানটার কোণায় এল, তার পরনের কাপড়টা আজ কিছুটা অগোছালো। সে রবির দিকে তাকাতেই তার চোখের কোণে এক দারুণ অস্থিরতা ফুটে উঠল।
"আপনি এত ঝুঁকি কেন নেন, রবি ভাই?" ফাতেমা নিচু স্বরে বলল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল উত্তেজনা।
রবি কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে ফাতেমার দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝোপের আড়ালে একটা পুরনো কাঠের গুঁড়ির ওপর তাকে বসিয়ে দিল। এরপর সে ফাতেমার একদম কাছে দাঁড়িয়ে তার চুলের বিনুনি নিয়ে খেলতে শুরু করল। রবির স্পর্শ আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী, অনেক বেশি অধিকারপূর্ণ।
"ঝুঁকি না থাকলে কি আর তৃপ্তি পাওয়া যায়, ফাতেমা?" রবি ফিসফিস করে বলল। সে ফাতেমার কানের কাছে মুখ নিয়ে তার নিশ্বাসের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। ফাতেমার সারা শরীর শিউরে উঠল, সে নিজের দুহাতে নিজের বুক চেপে ধরল, যেন রবির এই ক্রমবর্ধমান উত্তাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইছে।
রবি তার হাতের আঙুলগুলো ফাতেমার গলার কাছে আলতো করে বোলাল। "তোর এই সহজ-সরল জীবনটা কি তোকে কখনো সুখ দিয়েছে? নাকি শুধু সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে নিজের আসল রূপটাকেই ভুলে গেছিস?"
ফাতেমা রবির চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন কোনো লজ্বা নেই, আছে শুধু এক তীব্র তৃষ্ণা। সে রবির বুকের পাঞ্জাবিটা মুঠো করে ধরল। "আমি... আমি জানি না। আপনি এলে আমার মনে হয়, আমি অন্য কোনো জগতে আছি।"
রবি জানে ফাতেমা এখন পুরোপুরি তার হাতের মুঠোয়। সে তার হাতের তালু ফাতেমার গালের ওপর রাখল। স্পর্শের তীব্রতায় ফাতেমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। রবি জানে, এখনই শরীরী মিলনের তাড়াহুড়ো করলে এই নেশাটা বেশিদিন স্থায়ী হবে না। সে ফাতেমাকে আরও একটু তৃষ্ণার্ত রাখতে চায়, যাতে ফাতেমা নিজেই রবির পৌরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য পাগল হয়ে ওঠে।।।
রবি তার মুখ সরিয়ে নিল, কিন্তু হাতটা ফাতেমার কাঁধে রাখল। "কাল রাতে মফিজের বাজার থেকে ফিরতে দেরি হবে, তাই না?"
ফাতেমা রবির দিকে তাকাতে তাকাতে ধীর গলায় বলল, "হ্যাঁ... সে রাতে একা থাকে না। সে ঘরেই ফিরবে।"
"ভালো," রবি একটা চুরমার করা হাসি হাসল। "আমি আসব তখন, যখন তোর শরীর আর মন—দুটোই আমার জন্য ছটফট করবে।"
রবি পেছন ফিরে হাঁটা দিল। ফাতেমা অনেকক্ষণ সেই ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল, রবির রেখে যাওয়া স্পর্শটুকু নিজের শরীরে অনুভব করতে করতে। তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে তখন কেবল রবির নাম।
বাড়িতে ফিরে রবি দেখল সখিনা বেগম বারান্দায় বসে একা এক মনে কী যেন ভাবছেন। তাকে দেখে রবি মৃদু হাসল, কিন্তু তার মনের অন্দরমহল তখন পুরোপুরি ফাতেমার শরীর ও তার কামনার নেশায় বুঁদ। অন্দরমহলের তিন নারী এখন রবির কাছে কেবল অভ্যাসের সঙ্গী, কিন্তু বাইরের ফাতেমা—যে তাকে দিনের পর দিন অসম্পূর্ণ রেখে তীব্রতর করে তুলছে—সে এখন রবির আসল নেশা।।
ফাতেমার এই মনস্তাত্ত্বিক ছটফটানি আর রবির এই ঠান্ডা মাথার শিকারি চাল—এই দুইয়ের মেলবন্ধন অন্দরমহলের বাইরে এক নতুন কামনার ইতিহাস তৈরি করছে।