The Barter System - অধ্যায় ১৯
একাদশ পরিচ্ছেদ: বাষ্পার্ত দেওয়াল এবং এক চূড়ান্ত সমর্পণ
১১.১. চার দিনের তপস্যার ফল
শনিবার, রবিবার, সোমবার এবং মঙ্গলবার—এই চারটে দিন সেন বাড়ির ভেতরে যেন এক দমবন্ধ করা স্তব্ধতায় কেটে গেল। এপ্রিল মাসের শেষের দিক, কলকাতার বাইরের আকাশ থেকে তখন যেন আগুনের হলকা নামছে। পিচগলা রাস্তা, গাছের পাতায় জমে থাকা ধুলো, আর রোদের তীব্র চোখরাঙানি—সব মিলিয়ে বাইরের পৃথিবীটা যখন দহনজ্বালায় পুড়ছে, ইন্দিরার ফ্ল্যাটের ভেতরে তখন চলছিল এক অন্য রকম মনস্তাত্ত্বিক দহন।
রাহুলের নিভৃতবাস ছিল নিখুঁত। সম্পূর্ণ, নিশ্ছিদ্র এবং নিখাদ মনোযোগে অনন্য। ওর মোবাইল ফোনটা ইন্দিরার ড্রয়ারের ভেতর বন্ধ করা। ল্যাপটপটা কেবলই উইকিপিডিয়া আর পড়ার বই বা নোটস-এর পিডিএফ খোলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল। সারাদিনে রাহুল নিজের ঘর থেকে বেরোত শুধু খাওয়ার জন্য। সুব্রত বাড়িতে থাকলে হয়তো তাঁর মতো নিয়মানুবর্তিতার পরাকাষ্ঠার কাছেও রাহুলের এই আচরণ প্রয়োজনাতিরিক্ত ঠেকত, কিন্তু কাজের চাপে সে নিজেও বাড়িতে থাকাকালীন নিজের ঘরেই বেশি সময় কাটিয়েছে।"
ইন্দিরা এই চারটে দিন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝেই রাহুলের ঘরের ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরেছেন। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ছেলেটার ঝুঁকে থাকা পিঠ, বইয়ের পাতার ওপর দিয়ে দ্রুত চলতে থাকা কলম, আর ওর কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম—এই দৃশ্যটা ইন্দিরার বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত দোলাচল তৈরি করত। একদিকে এক চরম মাতৃসুলভ গর্ব, যে তাঁর ছেলে কতটা বাধ্য, কতটা শৃঙ্খলাপরায়ণ; আর অন্যদিকে এক চোরা, উষ্ণ আর্তি—যে এই ছেলেটা, এই উনিশ বছরের তরতাজা যুবক, শুধুমাত্র তাঁর শরীরের একটুখানি ছোঁয়া, একটুখানি সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য এতটা তীব্র সাধনা করছে। এই ভেবে ইন্দিরার নিজের শরীরের ভেতরেই এক অচেনা, নিষিদ্ধ উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ত। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, ছেলেটা কি পারবে? কিন্তু রাহুলের এই পাগলের মতো পরিশ্রম দেখে তিনি মনে মনে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তি অনুভব করছিলেন।
মঙ্গলবার রাত। প্রায় নটা বাজে। লিভিং রুমের আলো প্রায় সবই নেভানো, কেবল কোনের দিকে একটা স্ট্যান্ড ল্যাম্প থেকে নরম, মায়াবী হলুদ আলো ঘরের কার্পেটের ওপর এসে পড়েছে। বাইরের রাস্তায় গাড়ির শব্দ কমে এসেছে; অনেক দূরে কোনো এক নেড়ি কুকুরের একটানা ডাক ভাসছে। সুব্রত নিজের ঘরে আগামীকালের মিটিংয়ের খসড়া বানাতে ব্যস্ত।
ঠিক সেই সময় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে লিভিং রুমে এসে দাঁড়াল রাহুল। ওর পরনে একটা ঢিলেঢালা সুতির টি-শার্ট আর শর্টস। কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে পড়েছে, চোখের নিচে কালচে ছোপ, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু ওই ক্লান্তির মধ্যেও ওর চোখের মণি দুটো এক তীক্ষ্ণ, নতুন আত্মবিশ্বাসে চকচক করছে।
ইন্দিরা সোফায় বসেছিলেন। কোলে রাখা মহাভারতের ফেমিনিস্ট ইন্টারপ্রিটেশনের পেপারটিতে তাঁর চোখ থাকলেও, মন ছিল না। তিনি রাহুলের দিকে তাকালেন।
"মা," রাহুল খুব নিচু, ফিসফিস করা গলায় শুরু করল, "আজ আমি ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনা করেছি। অ্যাটমিক স্ট্রাকচার, কেমিক্যাল বন্ডিং আর মলিকিউলার অরবিটাল থিওরি..."
এরপর রাহুল একটানা প্রায় দশ মিনিট ধরে, নিখুঁতভাবে ওর সারাদিনের পড়াশোনার সামারি দিয়ে গেল। ওর গলার স্বরে কোনো বিরতি ছিল না, কোনো জড়তা ছিল না।
ইন্দিরা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন ওর মুখের দিকে। ওর বলা থিয়োরিগুলো তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি আটকে ছিল ওর মুখের ওই শ্রান্ত রেখাগুলোতে। ওর কণ্ঠস্বর থামতেই ইন্দিরা একটা গভীর শ্বাস নিলেন। তাঁর গলার স্বরে এক অদ্ভুত, মুগ্ধতার রেশ, যা তিনি শত চেষ্টা করেও ঢাকতে পারলেন না।
"অ্যাটমিক স্ট্রাকচার..." তিনি একটু টেনে, অত্যন্ত নিচু ও গাঢ় স্বরে ফিসফিস করলেন। "দ্যাটস আ টাফ সাবজেক্ট। আজ খুব খাটনি গেছে, তাই না রে সোনা? চোখের কোলটায় তো কালি পড়ে গেছে।"
রাহুল একটা ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত হাসি হাসল। "হ্যাঁ মা... খুব খাটনি গেছে আজ। কিন্তু অনেক কিছু শিখেছি।"
ইন্দিরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সোফা থেকে সামান্য উঠে দাঁড়িয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন ওর মুখের দিকে। খুব আলতো করে, পরম মমতায় ওর কপালের ওপর এসে পড়া রুক্ষ, অবাধ্য চুলের গোছাটা সরিয়ে দিলেন। তাঁর এই ছোঁয়াটা ছিল একদম মাতৃসুলভ, কিন্তু তাঁর ফর্সা আঙুলগুলো রাহুলের কপালের ঘর্মাক্ত, উষ্ণ ত্বকের ওপর প্রয়োজনের চেয়ে অন্তত কয়েক সেকেন্ড বেশি স্থির হয়ে রইল। লিভিং রুমের ওই আবছা আলোয়, ওই নিস্তব্ধতার মধ্যে মা আর ছেলের মাঝখানের বাতাসে যেন এক পবিত্র, অথচ নিষিদ্ধ তৃষ্ণা কম্পিত হতে লাগল।
"খুব সুন্দর বুঝিয়েছিস তুই," ইন্দিরা খুব নিচু, প্রায় গলার ভেতরের স্বরে বিড়বিড় করলেন। "আমার মতো নন-কেমিস্ট্রির ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন কে এতো গুছিয়ে ব্যাপারটা বোঝাতে পেরেছিস, এটা একদমই সহজ কাজ নয় রাহুল..." তিনি একটু থামলেন, চোখদুটো রাহুলের চোখের ওপর একদম স্থির রেখে ফিসফিস করলেন, "কালকের জন্য রেডি তো তুই?"
রাহুলের চোখদুটো আশায় আর এক তীব্র আবেগে বড় বড় হয়ে গেল। ও মায়ের ওই চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল, "তাহলে... তুমি স্যাটিসফায়েড, মা? আমি কি তোমাকে খুশি করতে পেরেছি?"
ইন্দিরার বুক চিরে একটা দীর্ঘ, কাঁপানো শ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি আরও এক পা এগিয়ে এলেন। কিছুক্ষণের জন্য তিনি ভুলে গেলেন ওপরের ঘরে সুব্রতর উপস্থিতির কথা। নিজের দুটো সুন্দর, নরম হাত দিয়ে রাহুলের মুখটা একদম কাপের মতো করে ধরলেন। তাঁর বুড়ো আঙুলদুটো খুব আদরে রাহুলের চোখের নিচের ওই ক্লান্তির কালো দাগগুলোর ওপর বুলিয়ে দিতে লাগল। তাঁর গলার স্বর এবার এক আন্তরিক পূজারিণীর মতো শ্রদ্ধায় আর ভালোবাসায় বুজে এল:
"সোনা... তুই তো সবসময়ই আমার মুখ উজ্জ্বল করিস... হ্যাঁ। আমি পুরোপুরি স্যাটিসফায়েড।" তাঁর গলার কাছে একটা ঢোক গেলার শব্দ হলো, শ্বাসটা একটু আটকে গেল। "কাল... কাল আমি আমার প্রমিস রাখব।"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই রাহুলের মুখের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক জাদুমন্ত্রে উবে গেল। ওর চোখদুটো আনন্দে নেচে উঠল। "ওহ মা! সত্যি? আমি...আই অ্যাম সো হ্যাপি! আমার লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে ইচ্ছে করছে..."
"উশশশ..." ইন্দিরা সাথে সাথে নিজের একটা তর্জনী ওর ঠোঁটের ওপর চেপে ধরলেন, চোখদুটো সতর্কতায় বড় বড় হয়ে গেল। "আস্তে, সোনা... একদম চুপ! তোর বাবা শুনতে পাবে।"
তাঁর হাতদুটো রাহুলের মুখ থেকে পিছলে নেমে এসে ওর দুই কাঁধের ওপর স্থির হলো। তিনি ওর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। ইন্দিরার চোখের ওই দৃষ্টিতে তখন এক অদ্ভুত, জটিল ঝড়—একদিকে আগামীকালের সেই চরম মুহূর্তের প্রত্যাশা, অন্যদিকে এক অজানা ভয়, আর তার সাথে মিশে থাকা এক অবদমিত কামনা। তাঁর গলার স্বর এবার বেশ নিচু, ভারী এবং কিছুটা ফ্যাসফ্যাসে শোনাল:
"আমাকে একটা প্রমিস কর... প্রমিস কর যে আজ রাতে তুই খুব ভালো করে ঘুমোবি। তোর এখন ভালো মতন রেস্ট দরকার। তোকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে, সোনা।"
রাহুল ওর সেই চিরচেনা, চপল আনন্দে ঘাড় নাড়ল। "হ্যাঁ হ্যাঁ, অফকোর্স আমি ঘুমাব। কিন্তু তার আগে... আমার ফোনটা দাও। চার দিন ধরে ওটার মুখ দেখিনি আমি!"
ছেলের এই শিশুসুলভ রূপটা দেখে ইন্দিরা নিজের সমস্ত টেনশনের মধ্যেও একটা নরম, খিলখিল হাসি হাসলেন। তাতে কোনো বিরক্তি ছিল না, পুরোটাই প্রশ্রয়। তিনি একটা হাত ওর কাঁধ থেকে নামিয়ে সোফার ওপর রাখা নিজের ছোট হ্যান্ডব্যাগটার চেইন খুললেন। সেখান থেকে রাহুলের ফোনটা বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, "এই নে তোর প্রাণভোমরা।"
রাহুল ফোনটা হাতে নিতেই ওর আঙুলগুলো দ্রুত স্ক্রিনের ওপর চলতে শুরু করল। কিন্তু ওর মগজ তখন ফোন নয়, অন্য এক হিসাবে ব্যস্ত।
"থ্যাঙ্কস মা," রাহুল চোখ না তুলেই ফিসফিস করে বলল। "তাহলে... কাল আমি কলেজ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসব। খুব জোর দুটো বাজবে। তুমি কখন ফিরছ?"
ইন্দিরা একটু মাথাটা একপাশে হেলিয়ে, গলার স্বরে হালকা কৌতুক মিশিয়ে বললেন, "কাল? আমার তো চারটের মধ্যে ফেরার কথা। তবে মিটিং তাড়াতাড়ি শেষ হলে আগেও চলে আসতে পারি।" তিনি ওর হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে একটু অনুযোগের সুরে বললেন, "আর শোন, ফোন পেলি বলে সারারাত যেন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকিস না। ঘুমোবি কিন্তু, সোনা।"
রাহুল ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে বড্ড অস্থিরভাবে একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল। ওর চোখেমুখে এক নতুন উদ্দীপনার ছাপ। "হ্যাঁ হ্যাঁ, ঘুমাব। কিন্তু আগে কালকের প্ল্যানটা ফাইনালাইজ করে নিই। তুমি প্লিজ চেষ্টা কোরো তিনটের মধ্যে বাড়ি ঢুকে যাওয়ার। বাবা তো দুপুর দেড়টা নাগাদ বেরিয়ে যাচ্ছে, তাই না? আর বাবার যা শিডিউল, রাত আটটার আগে তো কিছুতেই ফিরবে না। এই ক্লাবের মিটিংগুলো তো বড্ড লম্বা চলে, তাই না মা?"
ছেলের এই নিখুঁত প্ল্যানিং দেখে ইন্দিরার ভুরু দুটো কপালে উঠল। তাঁর গলার স্বরে এক মজামিশ্রিত বিস্ময় আর সামান্য বিরক্তি ফুটে উঠল: "বাপ রে! তুই তো দেখছি একদম অঙ্কের মতো সব হিসেব কষে বসে আছিস! হ্যাঁ... ঠিকই বলেছিস। তোর বাবা দেড়টা নাগাদ বেরোবে। আর রোটারি ক্লাবের এই মিটিং-গুলো বছরে দু-একবারই হয়, তাই অনেক রাত অবধি চলে, আটটা-ন'টার আগে তো ফিরবেই না।" তিনি ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, প্রশ্রয়ের হাসি ঝুলিয়ে ওর চোখের দিকে তাকালেন, "আচ্ছা ঠিক আছে... আমি চেষ্টা করব তিনটের মধ্যে চলে আসার।"
রাহুল এক চরম স্বস্তিতে আর আনন্দে মায়ের একটা হাত নিজের দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরল। ওর গলার স্বরে এক অদ্ভুত আকুলতা। "আমি প্রচন্ড এক্সাইটেড, মা। কাল... কাল আমি আবার আমার ছোটবেলার ওই মেমরিটা রিক্রিয়েট করতে পারব। ওটা জাস্ট...অসাধারণ হবে মা, খুব মজা হবে! আমি এখনই ফিল করতে পারছি।"
ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় আর রোমাঞ্চে কেঁপে উঠল। তিনি রাহুলের কাঁধে আলতো করে একটা চাপ দিলেন। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি তখন এক জটিল ধাঁধা—যাতে মিশে আছে গভীর স্নেহ, লোকলজ্জার ভয়, এবং পরাস্ত হওয়ার হাসি।
"উফ্, তুই যে কী লেভেলের একটা একগুঁয়ে ছেলে, তুই জানিস সেটা?" তিনি মাথা নাড়তে নাড়তে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আমি এখনও নিজের মনকে বিশ্বাস করাতে পারছি না যে তুই আমাকে দিয়ে শেষমেশ এই কাজটা করাচ্ছিস... আর তুই বলছিস এটা মজা?" তিনি একটা শুকনো, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। "তুই একদিন হার্ট অ্যাটাকে আমার প্রাণটা নিবি, আমি বলে দিচ্ছি। দেখবি, হয়তো কাল ওই শাওয়ারের ভেতরেই..."
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রাহুলের মুখের হাসি এক লহমায় উবে গিয়ে সেখানে এক ভয়ার্ত গাম্ভীর্য ফুটে উঠল। ও মায়ের দুটো কাঁধ খুব শক্ত করে চেপে ধরল। "না না... একদম মরার কথা বলবে না... তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? এসব কী অলক্ষুণে কথা বলছ!"
ইন্দিরার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল, আর পরক্ষণেই তিনি এক গভীর, বাঁধনহারা নরম হাসিতে গলে গেলেন। ছেলের এই নিখাদ ভালোবাসা তাঁকে সবসময় বড্ড দুর্বল করে দেয়। তিনি একটু ঝুঁকে এসে নিজের ফর্সা, নরম আঙুলগুলো রাহুলের গালের ওপর বুলিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত করার সুরে বললেন:
"আহা, রিল্যাক্স সোনা... রিল্যাক্স! আমি তো জাস্ট কথার কথা বলছিলাম। তোর মা কোথাও যাচ্ছে না তোকে ছেড়ে।"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই রাহুল কোনো নিয়মকানুন, কোনো ভয়ডরের তোয়াক্কা না করে এক ঝটকায় মাকে নিজের বুকের সাথে বড্ড শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর মুখটা ইন্দিরার ঘাড়ের কাছে গোঁজা। "ওহ মা..."
ইন্দিরার মেরুদণ্ড বেয়ে এক ঝটকা বিদ্যুৎ বয়ে গেল। তিনি মুহূর্তের জন্য ওই আলিঙ্গনে সাড়া দিলেও, পরক্ষণেই তাঁর পারিপার্শ্বিক জ্ঞান ফিরে এল। তিনি খুব সাবধানে, কিন্তু শক্ত হাতে ওর বুক থেকে নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিলেন।
"আহ্ সোনা... আবার পাগলামি শুরু করলি! এখানে নয়। এটা লিভিং রুম, ভুলে গেলি? তোর বাবা যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে..." তাঁর গলার স্বর আতঙ্কে ফিসফিস করছিল।
রাহুল একটু পিছিয়ে গিয়ে মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল, "ওকে ওকে, বুঝতে পেরেছি। কিন্তু কাল... কাল বাথরুমের ভেতর... তুমি আমাকে যত খুশি হাগ করতে দেবে, প্রমিস করো! ওখানে তো বাবা থাকবে না, সো ওখানে তোমার কোনো এক্সকিউজ শুনব না আমি।"
এক চাপা নার্ভাসনেস আর মাতাল করা হাসি মেখে ইন্দিরা নিজের চোখ বুজলেন। তাঁর হৃৎপিণ্ডটা তখন পাগলের মতো দৌড়চ্ছে। "উফ্... তুই বড্ড ন্যাকা, আর বড্ড নিডি একটা ছেলে! আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, প্রমিস।"
রাহুল আলতো করে বলে উঠল, "আর চুমু খেতেও দেবে তো, মা?"
ইন্দিরা চট করে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। মুখে এক কৃত্রিম বিরক্তি ফুটিয়ে ফিসফিসিয়েই বললেন, "উফফ, যা তো! রাত হয়ে গেছে, শুতে যা।"
রাহুল একগাল হেসে, গুডনাইট বলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
লিভিং রুমের ওই আবছা, হলুদ আলোর নিচে ইন্দিরা সেন একা দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি ওই শূন্য করিডোরের দিকে। তাঁর মুখের ওপর দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে হাজারটা ইমোশন বয়ে গেল—কখনও অপরাধবোধ, কখনও এক সুপ্ত ভয়, কখনও বা এক অজানা কামনার তাপ। তিনি নিজের দুহাতের আঙুল দিয়ে কপালের দুপাশটা টিপে ধরলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, কাল দুপুরে ওই বাথরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার পর তাঁরা দুজনে এমন এক সীমারেখা পার হতে চলেছেন, যার ওপারে বাইরের জগৎটা একই থাকবে—শুধু বদলে যাবে তাঁদের নিজেদের মাঝখানের পৃথিবীটা। তিনি ফাঁকা ঘরটার দিকে তাকিয়ে, একটা গভীর, কাঁপানো শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলেন:
"আমার পাগল... মা ন্যাওটা ছেলে একটা।"
১১.২. আগাম প্রত্যাবর্তন এবং এক উষ্ণ অভ্যর্থনা
পরের দিন। বুধবার।
এপ্রিলের সেই রুক্ষ, দহনক্লান্ত দুপুর। বাইরের রাস্তায় রোদের তাপে যেন আগুন ঝরছে। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুপুর দুটো। রাহুল কলেজ থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকেছে। সুব্রত কাঁটায় কাঁটায় দুপুর একটাতেই ফাইলপত্তর নিয়ে ক্লাবের মিটিংয়ে বেরিয়ে গেছে। পুরো ফ্ল্যাটটাই এখন নিঝুম, খাঁ খাঁ করছে; গঙ্গামাসিও সকালের কাজ সেরে বেরিয়ে গেছে।
ঠিক সওয়া দুটো।
সদর দরজার লকে চাবি ঘোরার একটা মৃদু 'খট' শব্দ হলো। নিজের বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও দরজাটা খুব সন্তর্পণে খুলে ভেতরে ঢুকলেন ইন্দিরা। তাঁর পরনে বাদামি পাড়ের একটা অফ-হোয়াইট শাড়ি। কাঁধের সাইডব্যাগটা তিনি সোফার সামনের ছোট টেবিলটার ওপর নামিয়ে রাখলেন। তারপর সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে, চোখ বুজে একটা দীর্ঘ, কম্পিত শ্বাস ছাড়লেন। এই শ্বাসের মধ্যে যেমন ছিল এক অপরাধবোধের ক্লান্তি, তেমনই লুকিয়ে ছিল এক বাঁধভাঙা উত্তেজনা।
তিনি চোখ খুলে করিডোরের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করা গলায় ডাকলেন: "সোনা? আছিস?"
কথাটা শেষ হতে না হতেই রাহুলের ঘরের দরজা খুলে গেল এবং সে প্রায় দৌড়তে দৌড়তে নেমে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত, বন্য আনন্দ।
"মা! তুমি চলে এসেছ! তুমি তো বললে তিনটেয় ফিরবে, তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এলে! ওহ গড, দিস ইস পারফেক্ট!"
ইন্দিরার ফর্সা মুখে এক চওড়া, মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণগুলো স্নেহে কুঁচকে গেল। তিনি দু-পা এগিয়ে গিয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে রাহুলের মুখটা পরম মমতায় তুলে ধরলেন। "বলেছিলাম তো, তাই না? কিন্তু আমার মিটিংটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল, আর... আর মনে হলো একটু জলদিই বাড়ি ফিরে যাই।" তিনি ওর চোখের ওই জ্বলজ্বলে উত্তেজনার দিকে তাকিয়ে একটু কৌতুকী সুরে বললেন, "তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুই একটু বেশিই এক্সাইটেড হয়ে আছিস।"
রাহুল এবার মায়ের দুটো কাঁধ ধরে একদম ছোট বাচ্চাদের মতো লাফাতে শুরু করল। "কী বলছ মা! আমি এক্সাইটেড হব না? আমি তো আনন্দে পাগল হয়ে যাচ্ছি! এত এত এত এক্সাইটেড আমি!"
ইন্দিরা খিলখিল করে হাসতে হাসতে এক হাত দিয়ে ওর লাফানো থামানোর চেষ্টা করলেন, অন্য হাতটা তখনও ওর গালে। "ওকে, ওকে, শান্ত হ সোনা! ওরম ভাবে লাফায় কেউ! তোকে দেখে এখন কী মনে হচ্ছে বল তো? ঠিক যেন একটা ছটফটে কুকুরছানা!"
রাহুল ওর লাফানো থামিয়ে, আদুরে ভঙ্গিতে মায়ের কাঁধের ওপর নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল। তারপর ঘাড়ের কাছে নাকটা ঘষে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল:
"হ্যাঁ মা... আমি তোমার কুকুরছানাই তো... স্নিফ স্নিফ... হুমমম... তুমি আজ সকালে স্নান করোনি মা... ঠিক আমারই মতো... তোমার গায়ের গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারছি..."
ইন্দিরার ফর্সা গাল, কান, গলা—সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে এক গাঢ়, লাল রক্তিমাভায় ভরে উঠল। এই অন্তরঙ্গ, ব্যক্তিগত কথাটায় তিনি একই সাথে চমকে গেলেন, লজ্জা পেলেন, আবার তাঁর ভেতরের নারীসত্তা এক অদ্ভুত, উষ্ণ রোমাঞ্চে শিউরে উঠল। তিনি ওকে নিজের গা থেকে না সরিয়েই, কাঁধের ওপর একটা হালকা, আদুরে চড় কষালেন।
"ওহ মাই গড, চুপ কর অসভ্য ছেলে! সব ব্যাপারে পাকা পাকা কমেন্ট না করলে চলে না তোর?" তিনি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ওর কানের কাছে মুখটা নামালেন; তারপর এক প্রচ্ছন্ন ষড়যন্ত্রের সুরে ফিসফিস করে উঠলেন, "হ্যাঁ মিস্টার ব্যোমকেশ বক্সী, ঠিক ধরেছিস। আমি স্নান করিনি। এবার খুশি তো তুই?"
রাহুল মুখটা তুলে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলল, "আমার বয়েই গেল! তুমি সকালে স্নান করেছ কি করোনি তাতে আমার কী? আমার কাছে শুধু একটাই ব্যাপার ম্যাটার করে... তুমি এখন স্নান করবে কি না..."
ইন্দিরা চোখ উলটোলেন। তাঁর গাল তখনও গোলাপি। গলার স্বর এবার নরম হয়ে খাদে নেমে এল। তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ফিসফিস করলেন:
"হ্যাঁ, সোনা... এখন স্নান করব... আমার এই পাগল ছেলেটার সাথে..."
রাহুল আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ও সটান মায়ের একটা হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। "চলো চলো চলো... আর এক সেকেন্ডও লেট করা যাবে না..."
"উফ্, কী যে করি তোকে নিয়ে! কী একগুঁয়ে, ইনসাফারেবল ছেলে তৈরি হচ্ছিস দিন দিন!" ইন্দিরা এক হাতে ওঁর সাইডব্যাগ টা তুলে নিয়ে হাসতে হাসতে ওর টানে পা মেলালেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠে করিডোর ধরে মা আর ছেলের এই হেঁটে যাওয়াটা যেন কোনো এক অলিখিত, নিষিদ্ধ স্বর্গের দিকের যাত্রা।
তারা দুজনে এসে পৌঁছল ইন্দিরার শোবার ঘরের সামনে। শোবার ঘরের ঠিক উল্টোদিকেই তাঁর ব্যক্তিগত বাথরুমটি, আর সুব্রতর নিজস্ব বাথরুমটি এই দীর্ঘ করিডোরের একদম অন্য প্রান্তে। বাথরুমটা বেশ বড়সড়, ভেতরেই জামাকাপড় নিয়ে অনায়াসে বদলে নেওয়া যায়। রাহুল ভেবেছিল মা হয়তো সোজা বাথরুমের দিকেই এগোবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ইন্দিরা নিজের শোবার ঘরে ঢুকলেন, তারপর সাইডব্যাগ থেকে ল্যাপটপটা বের করে সোজা বিছানায় গিয়ে বসলেন এবং ল্যাপটপটা অন করলেন।
রাহুলের মুখটা এক লহমায় চুপসে গেল। ও চরম হতাশায় আর বিরক্তিতে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল: "মা! হোয়াট ইজ দিস? এটা কিন্তু একদম আনফেয়ার হচ্ছে! তুমি এখন কাজ করবে? আমাকে এত বড় একটা প্রমিস করার পর? এটা কী ধরণের জোক মা?"
ইন্দিরা ওর এই ফ্রাস্ট্রেশন দেখে একগাল উষ্ণ, প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন। "মাই গড, সোনা! একটু রিল্যাক্স কর, রিল্যাক্স! আমি জাস্ট দুটো ইমেইল সেন্ড করব, দ্যাটস ইট। ওহ্ বাই দ্য ওয়ে, তোর স্নান সেরে পরার জামাপ্যান্ট কোথায়? যা, ওরম মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের ঘর থেকে ওগুলো নিয়ে আয় আগে। এনে বাথরুমের রডটার ওপর মেলে রাখিস। এক্ষুনি যা...আমি জাস্ট এইটুকু শেষ করেই আসছি। ওহ্ ভালো কথা, তোর তোয়ালেটাও তো লাগবে! ওটাও তোর বাথরুম থেকে নিয়ে আয়।"
রাহুল একটু শান্ত হলো। "ওকে ওকে, বুঝতে পেরেছি। আমি যাচ্ছি।"
মায়ের আদেশ শুনে রাহুল নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের আলমারিটা খুলে সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর নার্ভাসনেসে তার হাত দুটো কাঁপছিল। শেষমেশ সে আলগা সুতোর একটা ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট আর একটা ছাই রঙের শর্টস বেছে নিল—এমন পোশাক যা এই চড়া গরমে শরীরে আরাম দেয়। নিজের বাথরুমে ঢুকে সে আলনা থেকে তোয়ালেটা টেনে নিল। তোয়ালের খসখসে টেক্সচারটা হাতের মুঠোয় আসতেই তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় আর তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ধক করে উঠল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মায়ের সাথে স্নান করতে চলেছে—পুরো বিষয়টা যে কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, এক অমোঘ বাস্তব, সেটা যেন সে নিজের মনকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না।
রাহুল আলতো পায়ে ইন্দিরার শোবার ঘরের ঠিক উল্টোদিকে থাকা সেই বড়সড় বাথরুমটায় ঢুকল। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে, নিজের ঘর থেকে আনা জামাকাপড় আর তোয়ালেটা সে যত্ন করে ঝুলিয়ে রাখল ভেতরের রডটার ওপর। সবকিছু গুছিয়ে রাখার সময় তার হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল, কারণ সে অনুভব করতে পারছিল এই বাথরুমের প্রতিটা কোনায় তার মায়ের একান্ত ব্যক্তিগত সুবাস মিশে আছে।
বাইরে, বিছানায় বসে থাকা ইন্দিরার আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর শুধু অর্থহীনভাবে ঘুরছিল। তিনি আসলে কোনো ইমেইল পাঠাচ্ছিলেন না। এই ল্যাপটপ খোলাটা ছিল তাঁর একটা মনস্তাত্ত্বিক বাহানা। একটা ডিলে ট্যাকটিক্স। বাথরুমের ওই দরজার ওপারে যে চরম, অলঙ্ঘনীয় সীমারেখাটা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, সেটার মুখোমুখি হওয়ার আগে তাঁর নিজের শ্বাসটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার দরকার ছিল।
রাহুলের বাথরুমে ঢোকার শব্দ তিনি পেয়েছেন। ইন্দিরা মনে মনে ভাবলেন, এবার যেতে হবে, ছেলেটা অপেক্ষা করে আছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিলেন। বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে নিজের আলমারির সামনে এসে দাঁড়ালেন। আলমারির ভেতর থেকে তিনি বের করে নিলেন নিত্যদিনের চেনা এক সুতির শাড়ি। হালকা হলুদ রঙের ওপর ছোট ছোট সাদা ফুলের প্রিন্ট—একেবারে সাদামাটা, ঘরে পরার মতো হালকা কাপড়, যা এই তপ্ত গরমে শরীরে আরাম দেয়। এর পর বের করলেন শাড়ির রঙের সাথে মেলানো একটি কচি কলাপাতা সবুজ রঙের ব্লাউজ, আর সাদা রঙের সায়া। সবশেষে আলমারির ভেতরের ড্রয়ার থেকে তুলে নিলেন তাঁর পরিপাটি করে রাখা অন্তর্বাস দুটি। একটি দুধসাদা রঙের বক্ষবন্ধনী আর অন্যটি গাঢ় বাদামি রঙের প্যান্টি।
ইন্দিরা এসে দাঁড়ালেন বাথরুমের দরজার সামনে। বুকের ভেতরের স্পন্দনটা যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক চরম গতিতে ছুটছিল। তিনি চোখ বুজে, একটা লম্বা, নিয়ন্ত্রিত শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার শেষ চেষ্টা করলেন। তারপর খুব আলতো করে দরজাটা ঠেলে দিলেন।
দরজাটা খুলতেই রাহুলের মুখোমুখি হলেন। বুকের ভেতরের ধকধকানিটা আড়াল করে তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন,"কী রে? সব নিয়ে এসেছিস তো?"
"হ্যাঁ মা... একদম... ওই তো রডটার ওপর রেখে দিয়েছি।" রাহুল মিষ্টি ও নরম গলায় বলে উঠল।
ইন্দিরা ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। লকের 'ক্লিক' শব্দটা বাথরুমের টাইলসে প্রতিধ্বনিত হলো। এটা কোনো সাধারণ দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ নয়, এই শব্দটা যেন চেনা পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম আর শাসনকে তাঁদের থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিল।
ইন্দিরা ভেতরে ঢুকে নিজের হাত থেকে শাড়ি, ব্লাউজ আর অন্তর্বাসগুলো বাথরুমের সেই লম্বা রডটার ওপর যত্নে গুছিয়ে রাখলেন। ঠিক পাশেই রাখা রাহুলের জামাকাপড়গুলোর সাথে তাঁর পোশাকের এই আলতো স্পর্শটুকুও যেন এক নীরব স্বীকারোক্তি। বাথরুমের ভেতরটা তখন এক ভারী, সংবেদনশীল আবহে থমথম করছে। এপ্রিলের চড়া দুপুরের আর্দ্রতা আর বদ্ধ বাতাসের নিস্তব্ধতা দেওয়ালগুলোতে আছাড় খাচ্ছিল। সেই থমথমে নীরবতার মাঝে শুধু কাঁপছিল ইন্দিরার গায়ের সেই চেনা ফ্রেঞ্চ পারফিউম আর গ্রীষ্মের হালকা ঘামের এক নিজস্ব, তীব্র সুবাস। মা আর ছেলের মাঝখানের মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে বাতাসের উত্তাপ তখন এতটাই চড়া যে, একে অপরের নিশ্বাসের শব্দটুকুও যেন এক আচ্ছন্ন করা মাদকতা তৈরি করছিল।
ইন্দিরা শাওয়ারের জায়গাটার ঠিক বাইরে, কাঁচের পার্টিশনের পাশে এসে দাঁড়ালেন। নিজের কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচলটা আলগা করে নিচে নামিয়ে দিলেন। তাঁর মুখে এক অদ্ভুত লাজুক, নার্ভাস হাসি, যা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মুখে একেবারেই বেমানান। তিনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে, হাতদুটো নিজের ব্লাউজের বোতামের কাছে নিয়ে গিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন:
"একটু... একটু ঘুরে দাঁড়া তো, সোনা।"
রাহুল ঘুরতে গিয়েও থমকে গেল। ওর চোখে এক বিস্ময় আর যুক্তি। "কেন মা? ঘুরে দাঁড়াব কেন? গত শুক্রবার রাতেই তো আমি তোমার...মানে তোমাকে... ওটা খোলা অবস্থায় দেখেছি... আমরা তো ওভাবেই স্কিন-টু-স্কিন ছিলাম। আর...স্নান করার সময় তো...সবটাই...সবটাই দেখা যাবে..."
এই কথাগুলো সরাসরি ইন্দিরার ফর্সা মুখে এক তীব্র লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। গত শুক্রবার রাতের ও তার পরবর্তী কিছু মুহূর্তের সেই চরম আদিম স্মৃতি—রাহুলের খালি বুকের সাথে তাঁর নিজের অনাবৃত শরীরের ঘর্ষণ, তাঁর কাঁধের নিচের জন্মদাগে রাহুলের জিভের স্পর্শ, তাঁর স্তনবৃন্তে ছেলেটার ওই পাগল করা চোষন—সবকিছু এক নিমেষে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। তাঁর হাতদুটো ব্লাউজের ওপরেই কাঁপতে লাগল। তিনি তীব্র এক সংকোচে, কাঁপানো গলায় ফিসফিস করে উঠলেন:
"আমি... আমি জানি তুই দেখেছিস... কিন্তু আমি— প্লিজ, রাহুল। একটু ঘুরে দাঁড়া।"
রাহুল এবার একটু টিজিং হাসি হাসল। "কে এখন বোকার মতন কথা বলছে, মা?"
ইন্দিরা একটা নরম, অসহায় হাসি হাসলেন, নিজের এই অহেতুক আড়ষ্টতার কাছে নিজেই যেন হেরে যাচ্ছেন। "ওকে, ওকে, ইউ আর রাইট। আমিই বোকামো করছি। এটা সত্যিই খুব স্টুপিড। আমি জানি সেটা।" তিনি গলার স্বর থেকে সেই অনিশ্চয়তাটা ঝেড়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। "কিন্তু আমি...ইয়ে মানে... আমি হয়তো একটু... নার্ভাস। জাস্ট... জাস্ট একটু ঘুরে দাঁড়া না, প্লিজ।"
রাহুল আর কথা না বাড়িয়ে বাধ্য ছেলের মতো ঘুরে দাঁড়াল। ওর পিঠটা এখন ইন্দিরার দিকে।
ইন্দিরা একটা দীর্ঘ, কাঁপা শ্বাস ছাড়লেন। তাঁর কাঁপতে থাকা ফর্সা আঙুলগুলো এবার অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে ব্লাউজের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। প্রতিটা বোতাম খোলার সাথে সাথে তাঁর ঠোঁট থেকে একটা করে ছোট, নার্ভাস নিশ্বাস বেরোচ্ছিল। অবশেষে ব্লাউজটা খুলে ফেললেন। তারই সাথে আলগা হয়ে গেল কোমরের শাড়ির বাঁধনটা, নিথর হয়ে নেমে এল পায়ের কাছে। তারপর পেছনের হুকটা খুলে নিজের ব্রা-টাকেও শরীর থেকে আলগা করে দিলেন। শাড়ি, ব্লাউজ, আর ব্রা একটা নরম খসখস শব্দ করে পাশে রাখা লন্ড্রি বাস্কেটের ওপর গিয়ে পড়ল। তিনি এখন সম্পূর্ণ অনাবৃত বক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন, অনেকটা সেই গত শুক্রবার রাতের মতো। কিন্তু তিনি খুব ভালো করেই জানেন, আজকের গণ্ডিটা আরও অনেক দূর যাবে। কোমরের নিচে এখন কেবল সায়াটা জড়ানো। সেটা খোলার পালা এবার।
"তোমার কি হলো? এখনও কমপ্লিট হয়নি?" রাহুল ওপাশ থেকেই অধৈর্য গলায় চেঁচিয়ে উঠল। "এতক্ষণে তো আমি একটা আস্ত সিনেমা দেখে শেষ করে ফেলতাম!"
ইন্দিরা এই দমবন্ধ করা টেনশনের মধ্যেও একটু খিলখিল করে হেসে উঠলেন। ছেলের এই ছেলেমানুষিটাই ওঁর নার্ভাসনেস কাটানোর সবচেয়ে বড় ওষুধ।
"আবার পাকা পাকা কথা! আমি তোকে বলেছি না, ওদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকতে? যতক্ষণ না আমি বলছি, একদম ঘাড় ঘোরাবি না। আর না, আমার এখনও কমপ্লিট হয়নি। চুপ করে দাঁড়া। একটু পেশেন্স রাখ।"
ইন্দিরা দেখলেন, রাহুল ওভাবেই উলটো দিকে দাঁড়িয়ে নিজের টি-শার্টটা এক টানে মাথা গলিয়ে খুলে ফেলল। ওর পিঠের সেই চওড়া, মসৃণ পেশিগুলো বাথরুমের আলোয় চকচক করে উঠল। ওর পরনে এখন শুধু একটা কালো শর্টস। ইন্দিরা মনে মনে এক চরম মাতৃত্বের আদরে ভাবলেন: 'আমার দুষ্টু, একগুঁয়ে ছেলেটা...'
এবার ইন্দিরার হাত নেমে গেল সায়ার বাঁধনের কাছে। তাঁর আঙুলগুলো বড্ড কাঁপছিল। তিনি খুব ধীর, মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানে সায়ার দড়িটা আলগা করে দিলেন। কাপড়টা তাঁর কোমর থেকে খসে পড়ে একদম পায়ের কাছে মেঝেতে একটা অর্ধবৃত্ত তৈরি করল। তিনি এখন প্রায় বিবস্ত্র, পরনে কেবল তাঁর লাল রঙের প্যান্টি।
"সোনা..." ইন্দিরা ডাকলেন, গলার স্বর বড্ড নিচু। "তুই এখনও ঘুরিসনি তো?"
"না না..." রাহুল বিরক্তির সুরে বলল, "কিন্তু জলদি করো মা... তুমি কিন্তু প্রেশাস টাইমগুলো ওয়েস্ট করছ..."
ইন্দিরা একটা প্রশান্ত, পরাস্ত হাসি হাসলেন। তিনি নিজের প্যান্টিটাও সম্পূর্ণ খুলে ফেললেন। এবার তিনি আক্ষরিক অর্থেই সম্পূর্ণ নগ্ন। তিনি এক পা এগিয়ে গিয়ে শাওয়ারের কলের কাছটায় গিয়ে দাঁড়ালেন। নিচের ঠান্ডা মেঝের স্পর্শে তাঁর পায়ের ফর্সা উষ্ণ ত্বকটা এক লহমায় শিরশির করে উঠল।
তিনি অত্যন্ত নরম, মায়ের আদর মাখানো গলায় ডাকলেন। "রাহুল, আমার হয়ে গেছে; এবার ঘুরতে পারিস।"
(...continued in the next post)