The Barter System - অধ্যায় ২২

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74260-post-6285147.html#pid6285147

🕰️ Posted on August 12, 2026 by ✍️ andygarfield (Profile)

🏷️ Tags:
📖 3625 words / 16 min read

Parent
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: নিষিদ্ধ মোহনা ১২.১. একটি অনভিপ্রেত বিকেল ও অপরাধবোধের প্রতিধ্বনি করিডোরের সেই বদ্ধ, আধো-অন্ধকার পরিসরটায় বাতাস যেন জমাট বেঁধে পাথর হয়ে গিয়েছিল। রাহুলের দুটো পা মেঝের মার্বেলের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে আছে, শিরা-উপশিরা বেয়ে নেমে যাচ্ছে এক হিমশীতল স্রোত। বন্ধ বাথরুমের ওপার থেকে ভেসে আসা সেই জলের একটানা ঝমঝম শব্দের আড়ালে, ওর মায়ের—ডক্টর ইন্দিরা সেনের—সেই আদিম, রুদ্ধশ্বাস, এবং আত্মভোলা গোঙানিগুলো ওর মগজের ভেতর একটা প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন তৈরি করছিল। "উফ্... রাহুল... আহ্... হ্যাঁ... আমার বাবুটা..." শব্দগুলো কোনো অলীক কল্পনা ছিল না। ওগুলো আছড়ে পড়ছিল ওর কানের পর্দায়, ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল ওর উনিশ বছরের সাজানো, শৃঙ্খলাপরায়ণ পৃথিবীটাকে। ওর নিজের নামটা মায়ের ওই চরম তৃষ্ণার্ত, স্খলিত কণ্ঠস্বরে শুনে রাহুলের মনে হলো ওর হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে উঠে এসে সজোরে আছড়ে পড়ছে। এক তীব্র, দমবন্ধ করা অপরাধবোধ, ভয়, আর তার সাথে মিশে থাকা এক ব্যাখ্যাহীন, ঘোর-লাগা উত্তেজনা ওকে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করেছিল। ও নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে, স্তব্ধতাকে ফালাফালা করে বেজে উঠল কলিং বেল। ‘ডিং-ডং...’ প্রথমবার শব্দটা রাহুলের কানে পৌঁছলই না। ওর চেতনা তখন ওই বন্ধ দরজার ওপারের বাষ্পার্ত, নিষিদ্ধ দুনিয়ায় বন্দি। কয়েক সেকেন্ড পর, আবারও শব্দটা বেজে উঠল, এবার আরও একটু দীর্ঘ, আরও একটু অধৈর্য। ‘ডিং-ডং... ডিং-ডং...’ রাহুলের ঘোর কাটল এক তীব্র বৈদ্যুতিক শকের মতো। ও চমকে উঠে ঘাড় ঘোরাল সিঁড়ির দিকের শূন্যতার দিকে। ওর পুরো শরীরটা একটা অজানা ত্রাসে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। কে হতে পারে এই সময়ে? ঘড়িতে তো সবে তিনটে বাজে! গঙ্গা মাসি তো আজ আর আসবে না। কোনো পার্সেল? কোনো আত্মীয়? ও আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। নিজের কাঁপতে থাকা পা দুটোকে কোনোমতে টেনে নিয়ে ও সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। প্রতিটি ধাপে পা ফেলার সময় ওর মনে হচ্ছিল ওর শরীরটা যেন তুলোর মতো হালকা, অথচ মগজটা সীসার মতো ভারী। ওর পরনে সেই তাড়াহুড়ো করে গলানো ছাই রঙের শর্টস আর সাদা টি-শার্ট। নিজের শরীরের ভেতরের সেই সদ্য-সমাপ্ত স্খলনের ক্লান্তি আর শূন্যতাটা তখনও ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। নিচে নেমে, সদর দরজার কাছে এসে ও কাঁপা হাতে ছিটকিনিটা নামিয়ে লকটা ঘোরাল। দরজাটা খুলতেই, দুপুরের তপ্ত রোদের হলকা আর বাইরের চড়া আলো ওর চোখে এসে পড়ল। আর সেই আলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে রাহুল ভূত দেখার মত থতমত খেয়ে গেল। সুব্রত সেন। ওর বাবা। সুব্রতর হাতে তাঁর সেই চিরচেনা চামড়ার ব্যাগ, কপালের দু-পাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, আর চেহারায় এক চরম বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। রাহুলের মগজটা যেন সম্পূর্ণ ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। বাবা? এই সময়ে? বাবার তো রোটারি ক্লাবে থাকার কথা! রাত আটটার আগে তো ফেরার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না! ও প্রায় অস্ফুট, তোতলানো গলায় বিড়বিড় করে উঠল, "বা... বাবা? তুমি... তুমি এত তাড়াতাড়ি?" সুব্রত কপালের ঘামটা বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে মুছে একটা বিরক্তিকর শব্দ করে ভেতরে ঢুকলেন। রাহুলের মুখের ওই পাংশুটে, হতবাক চেহারাটা তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল, কারণ তাঁর নিজের মাথার ভেতর তখন অন্য বিরক্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। "আর বলিস না!" সুব্রত ব্যাগটা ড্রয়িংরুমের সেন্টার টেবিলের ওপর একরকম ছুঁড়ে দিয়েই ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। "রোটারি ক্লাব না ছাই! পলিটিক্স করে করেই সব শেষ হয়ে গেল দেশের। আজ আর মিটিং বসলই না।" রাহুল কোনোমতে দরজার লকটা আটকে দিয়ে বাবার দিকে ঘুরল। ওর বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ও আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজের গলার স্বরটাকে স্বাভাবিক রাখার। "বসল না মানে? দুপুরের পর থেকে তো থাকার কথা ছিল... তুমি তো ওই জন্যই..." "আরে সে তো ছিল বটেই," সুব্রত নিজের গলার টাইটা একটু আলগা করতে করতে চরম উষ্মার সাথে বললেন। "কিন্তু ক্লাবের ওই যে নতুন সেক্রেটারি হয়েছে—পরিমল, ওই লোকটা পুরো মিটিংটাকে একটা রাজনৈতিক মঞ্চ বানিয়ে ছাড়ল। লাস্ট মোমেন্টে খবর এল, শাসক দলের ওই যে স্থানীয় বিধায়ক, সে নাকি হঠাৎ প্রধান অতিথি হয়ে জাঁকিয়ে বসবে। অথচ আমাদের প্রোগ্রামটা ছিল পুরোপুরি অরাজনৈতিক, একটা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি নিয়ে আলোচনা।" "তাতে... তাতে কী হলো?" রাহুল যন্ত্রচালিতের মতো প্রশ্ন করল। ওর কান খাড়া হয়ে আছে ওপর তলার দিকে। ওই নিস্তব্ধতার মধ্যে যদি কোনোভাবে মায়ের একটা শব্দ, জলের একটা আওয়াজ নিচে নেমে আসে! "তাতে কী আর হবে!" সুব্রত সোফার গদিতে পিঠ এলিয়ে দিয়ে পা দুটো ছড়িয়ে দিলেন। "সিনিয়র মেম্বাররা বেঁকে বসল। সোজা বলে দিল, ক্লাবের ফ্লোরে কোনো নেতার দাদাগিরি বা চাটুকারিতা চলবে না। ব্যস, হলের বাইরেই দুই পক্ষের মধ্যে এমন একচোট কথা কাটাকাটি আর সিন ক্রিয়েট শুরু হয়ে গেল যে শেষমেশ আজকের মতো প্রোগ্রামটাই প্যাক-আপ করে দিতে বাধ্য হলো প্রেসিডেন্ট। বুঝলাম ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু শুধু প্রেশার বাড়িয়ে লাভ নেই, তাই সোজা ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে। জঘন্য একটা দিন।" সুব্রত কথাগুলো বলতে বলতেই নিজের পায়ের জুতো দুটো খুলতে শুরু করলেন। তারপর একটা গভীর, ক্লান্ত শ্বাস ফেলে ওপরের দিকে তাকালেন। "যাই, ওপরে গিয়ে আগে একবার গা ধুয়ে একটু রেস্ট নিই। মাথাটা বড্ড ধরেছে এই রোদে আর চেঁচামেচিতে।" কথাটা শোনার সাথে সাথেই রাহুলের মগজে যেন একটা সাইরেন বেজে উঠল। ওপরে যাবে? বাবা ওপরে যাবে? যদি বাবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠে, তাহলে তো সোজা নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ওই লম্বা করিডোরটা পার হতে হবে। আর ঠিক সেই করিডোরের মাঝখানেই মায়ের বাথরুম। বাথরুমের দরজাটা হয়তো লক করা আছে, কিন্তু বাবা যদি ওই দরজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মায়ের কোনো... মায়ের কোনো শব্দ শুনে ফেলে? যদি কলিং বেলের আওয়াজ মায়ের কানে না গিয়ে থাকে? যদি মা এখনও... রাহুলের মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফ-শীতল আতঙ্কের স্রোত নেমে গেল। না, বাবাকে কোনোভাবেই এখন ওপরে যেতে দেওয়া যাবে না। অন্তত আরও পনেরো-কুড়ি মিনিট বাবাকে নিচে আটকে রাখতেই হবে। সুব্রত সোফা থেকে ওঠার জন্য সদ্য হাতে ভর দিয়েছেন, ঠিক তখনই রাহুল প্রায় মরিয়া হয়ে, নিজের গলার স্বরটাকে একটু চড়িয়ে বলে উঠল, "বাবা! তুমি... তুমি একটু চা খাবে? তোমায় বড্ড টায়ার্ড দেখাচ্ছ... বরং একটু চা হলে..." সুব্রত থমকে গেলেন। তিনি একটু অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। "চা? হ্যাঁ, চা একটা হলে মন্দ হতো না। ওই ঝামেলার পর থেকে গলাটা শুকিয়ে আছে।" তিনি আবার সোফায় বসে পড়লেন, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর নজর গেল সিঁড়ির দিকে। "দাঁড়া, তোর মা তো এতক্ষণে ফিরে আসার কথা, তাই না? ও কি ঘরে আছে? দাঁড়া, ডাকছি..." এই বলে সুব্রত স্বভাববশতই একটু গলা চড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁক পাড়লেন, "ইন্দিরা?.... শুনছ? আমি চলে এসেছি..." "না, না, না!" রাহুল প্রায় চিৎকার করে উঠল, ওর দুটো হাত অবচেতনভাবেই সামনের দিকে উঠে এসেছে বাবাকে থামানোর জন্য। "মা... মা ব্যস্ত আছে বাবা! ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে কীসব ইম্পরট্যান্ট কাজ নিয়ে বসবে বলেছিল, এখন আর ডিসটার্ব করার দরকার নেই। আমি...ইয়ে মানে... আমি করে দিচ্ছি তোমায় চা।" সুব্রত ভুরু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এবার স্পষ্ট কৌতূহল এবং এক চিমটে বিস্ময়। রাহুল, যে ছেলে সারাদিন বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে, যে নিজের এক গ্লাস জল গড়িয়ে খায় না, সে আজ নিজে থেকে চা বানাতে চাইছে? "তুই চা বানাবি?" সুব্রতর ঠোঁটের কোণে একটা হালকা, ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে উঠল। "তুই জানিস চা বানাতে? কবে শিখলি এইসব?" রাহুলের হাত-পা তখন আক্ষরিক অর্থেই ঘামছে। ও ঢোক গিলে, কোনোরকমে একটা নার্ভাস হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল, "হ্যাঁ... হ্যাঁ, আমি জানি। আমি তো মাকে চা বানাতে দেখেছি অনেকবার... ইটস প্রিটি সিম্পল বাবা, আমি ঠিক পারব।" সুব্রত একটু হেসে হাত নাড়লেন। "থাক বাবা, তোকে আর ওসব করতে হবে না। ওই দুধ আর জল গুলিয়ে একটা অখাদ্য কিছু বানাবি। তার চেয়ে তুই যা, নিজের হোমওয়ার্ক কর গিয়ে। আমি তোর মাকে ডেকে নিচ্ছি, ও দু-মিনিটে বানিয়ে দেবে।" "আমি আমার হোমওয়ার্ক সব আগেই করে নিয়েছি," রাহুল এবার একগুঁয়েমির ভান করে বলে উঠল, যেন বাবার এই তাচ্ছিল্য ওর ইগোতে লেগেছে। "তুমি আমাকে একবার সুযোগ তো দাও! আমি প্রমিস করছি, একদম খারাপ হবে না। প্লিজ লেট মি ডু ইট।" সুব্রত এবার সত্যিই অবাক হলেন। ছেলের এই হঠাৎ জেগে ওঠা গৃহকর্মের শখ তাঁকে বেশ হতবাক করল। তিনি একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, "কী যে হলো তোর হঠাৎ করে... আচ্ছা ঠিক আছে, কর। বানা তোর চা। বেশি করিস না কিন্তু, আমি কিন্তু ওই মিডিয়াম সাইজের যে কাপটায় নরম্যালি খাই, ওইটারই এক কাপের একটু কম খাবো। " "শুধু তোমার জন্য কেন, আমি নিজের জন্যও বানাব," রাহুল তড়িঘড়ি বলল, পরিস্থিতিটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টায়। "ঠিক আছে। ওহ এক সেকেন্ড, দেখি তোর মা-ও হয়তো চা খেতে পারে এখন, জিজ্ঞেস করে দেখছি। দাঁড়া..." সুব্রত আবার মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, "ইন্দি—" "বাবা, বললাম তো মা বড্ড বিজি!" রাহুল মরিয়া হয়ে মাঝপথেই তাঁকে থামিয়ে দিল। ওর মগজ তখন বাঁচার জন্য নতুন একটা মিথ্যের জাল বুনছে। "মা... মা তো অলরেডি আমার হাতের চা খেয়েছে আগে! ওই তো সেদিন, তুমি যখন ছিলে না। মায়ের এখন লাগবে না। মা এখন ফুল কনসেন্ট্রেশন দিয়ে কাজ করছে, এখন ডিস্টার্ব করলে রেগে যাবে। আমি পরে আবার মা কে চা করে খাওয়াব খন।" রাহুলের এই ডাহা মিথ্যে কথাটা—যে ইন্দিরা ওর হাতের চা খেয়েছে—সুব্রতর কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো। তিনি জানেন, ইন্দিরা কাজের সময় কতটা মুড-সুইং করেন এবং ডিস্টার্বড হতে কতটা অপছন্দ করেন। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফার গদিতে আরও একটু রিল্যাক্স করে বসে পড়লেন। "ঠিক আছে, যা। উদ্ধার কর গিয়ে তোর চা নিয়ে। আমি একটু বসছি এখানেই, পেপারটা দেখি।" রাহুলের বুকের ওপর থেকে যেন এক টন ওজনের একটা পাথর নেমে গেল। ও ঘাড় নেড়ে অত্যন্ত দ্রুতপায়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল। রান্নাঘরে ঢুকে ও প্রথমে স্ল্যাবের ওপর দুটো হাত রেখে একটা গভীর, কাঁপানো শ্বাস ফেলল। ওর বুকটা তখনো ধড়ফড় করছে। কিন্তু এখন স্বস্তি পাওয়ার সময় নয়। আসল বিপদ তো সামনে। ও তো জীবনেও চা বানায়নি! চা পাতা কতটা দিতে হয়, চিনি কতটা লাগে, জল কতক্ষন ফোটাতে হয়—এর বিন্দুমাত্র ধারণাও ওর নেই। আর বাবার মতো খুঁতখুঁতে মানুষকে যদি ও এখন একটা অখাদ্য কিছু বানিয়ে দেয়, বাবা সোজা মাকে ডাকতে শুরু করবে। ওর মনের ভেতর কেমন যেন পাগল পাগল করতে লাগল। হঠাৎ ওর পকেটে থাকা ফোনটার কথা মনে পড়ল। ও দ্রুত ফোনটা বের করে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) অ্যাপটা খুলল। কাঁপাকাঁপা হাতে টাইপ করল: "Give me step-by-step instructions for a first-timer on how to make Indian milk tea. Very simple, proper measurements for two cups. Start from turning on the induction oven." কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্ক্রিনে একটা ঝকঝকে, নিখুঁত তালিকা ভেসে উঠল। রাহুল ফোনটা রান্নাঘরের স্ল্যাবের হেলান দিয়ে রেখে, ঠিক একজন বাধ্য কেমিস্ট্রি ল্যাবের স্টুডেন্টের মতো ইনস্ট্রাকশনগুলো ফলো করতে শুরু করল। প্রথমে ইনডাকশন ওভেনটা অন করল। একটা সসপ্যানে মেপে দেড় কাপ জল বসাল। জলটা সামান্য গরম হতেই, ফোনের নির্দেশমতো দু-চামচ চা-পাতা দিল। জলের রঙটা ধীরে ধীরে কালচে হতে শুরু করল। এরপর চিনি দিল। চা-পাতার সেই বুনো, চেনা গন্ধটা যখন রান্নাঘরে ছড়াতে শুরু করল, রাহুলের মনে হলো ওর নার্ভাসনেসটা কিছুটা হলেও কমছে। সবশেষে একটু দুধ ঢেলে দিল। ফুটন্ত চায়ের রঙটা যখন সেই নিখুঁত বাদামি রঙে পরিণত হলো, ও বুঝল যে এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল। চা-টা ছাঁকনি দিয়ে দুটো সুন্দর চিনামাটির কাপে ঢেলে একটা ট্রে-তে সাজাল ও। ঠিক তখনই ওর নজর গেল কাউন্টারের এক কোণে রাখা এক কাঁদি টাটকা কলাগুলোর দিকে। ওর মনে পড়ে গেল, বাথরুমের সেই চরম উত্তেজক মুহূর্তের পর মা ওকে বলেছিল, "খালি পেটে থাকিস না সোনা... দুটো কলা অন্তত খেয়ে নিস।" মায়ের কথাগুলো মনে পড়তেই রাহুলের বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ ব্যথায় আর লজ্জায় মোচড় দিয়ে উঠল। ওই বাথরুম, মায়ের ওই ভেজা নগ্ন শরীর, ওর নিজের সেই অনিয়ন্ত্রিত স্খলন, আর তারপর... মায়ের ওই একাকী, তীব্র গোঙানি। ও দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে ওই চিন্তাগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। এখন এসব ভাবলে চলবে না। ট্রে-টার একপাশে দুটো কলা রেখে ও সোজা ড্রয়িংরুমের দিকে বেরিয়ে এল। সুব্রত তখন সোফায় হেলান দিয়ে বসে ওইদিনের আনন্দবাজারটা ঘাঁটছিলেন। রাহুল ট্রে-টা সেন্টার টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। "এই নাও বাবা, তোমার চা।" সুব্রত কাগজটা নামিয়ে রেখে একটু সন্দিহান চোখে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। একটা ছোট চুমুক দিলেন। তারপর তাঁর ভুরু দুটো সামান্য ওপরে উঠে গেল। "অ্যাঁ! খারাপ করিসনি তো! বেশ একটা কড়া টেক্সচার এসছে। আমি তো ভেবেছিলাম তুই পুরো দুধ-জল করে আনবি।" সুব্রত বেশ তৃপ্তির সাথেই আরেকটা চুমুক দিলেন। "ইন্দিরার মতো ওই পারফেক্ট ফ্লেভারটা আসেনি ঠিকই, ও তো আবার একটু আদা-এলাচ দিয়ে বানায়, কিন্তু ফার্স্ট-টাইমার হিসেবে তুই লেটার মার্কস পেলি।" "থ্যাঙ্কস বাবা," রাহুল নিজের চায়ের কাপটা আর একটা কলা নিয়ে সোফার অন্য প্রান্তে বসল। চা-টা মুখে দিয়ে ও নিজেও বেশ অবাক হলো। সত্যিই খারাপ হয়নি। তারা দুজনে মুখোমুখি বসে চা খেতে লাগল। সুব্রতর মেজাজ এখন অনেকটাই শান্ত। তিনি রাহুলের পড়াশোনা, সামনের সেমিস্টারের রুটিন, আর ওর কিছু বন্ধুদের কথা জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। রাহুলও অত্যন্ত মেকানিক্যালি, একদম মুখস্থ করা উত্তরের মতো হ্যাঁ-হুঁ করে জবাব দিয়ে যাচ্ছিল। ওর বাইরের খোলসটা একদম শান্ত, বাধ্য ছেলের মতো, কিন্তু ওর ভেতরের রাডারটা তখনো ওপর তলার সামান্যতম শব্দের দিকে ফোকাস করা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতাকে হালকা ভেদ করে ওপর তলার করিডোর থেকে রাহুলের কানে একটা অত্যন্ত মৃদু, অথচ তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল। 'ক্লিক।' বাথরুমের দরজার লক খোলার শব্দ। রাহুলের চায়ের কাপ ধরা হাতটা শূন্যে থমকে গেল। ওর হৃৎপিণ্ডটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্পন্দিত হতে ভুলে গেল। কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর করিডোরের মেঝেতে হেঁটে যাওয়ার খুব অস্পষ্ট, নরম আওয়াজ। আর ঠিক তার সাত সেকেন্ড পর... 'খট।' শোবার ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। রাহুল একটা দীর্ঘ, নিঃশব্দ স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ওর পুরো শরীরটা যেন একটা রবারের মতো আলগা হয়ে সোফার ওপর এলিয়ে পড়ল। মা সেফ। মা নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। বাবা আর কিচ্ছু জানতে পারবে না। ওর এই ছোট্ট মিথ্যের নাটকটা অন্তত মায়ের ওই চরম ব্যক্তিগত, নিষিদ্ধ মুহূর্তটাকে পৃথিবীর চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে পেরেছে। বাকি চায়ের পর্বটা বড্ড একঘেয়েভাবেই কাটল। সুব্রত তাঁর অফিসের কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলছিলেন, রাহুল শুধু মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছিল। ওর আর কিছুই শোনার বা বোঝার দরকার ছিল না। ওর একমাত্র তৃপ্তি ছিল, বাবা মায়ের ওই প্রাইভেট টাইমটায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। দিনের বাকি অংশটা একটা দমবন্ধ করা, থমথমে অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে কাটল। রাহুল নিজের ঘর থেকে আর বেরোয়নি। অবশেষে এল রাতের ডিনারের সময়। ডাইনিং টেবিলের তিনটে চেয়ারে তিনজন মানুষ বসে আছে। সুব্রত টেবিলের মাথায়, তাঁর ডানদিকে ইন্দিরা, আর বাঁ-দিকে রাহুল। টেবিলে গঙ্গা মাসির সকালে বানিয়ে রাখা রুটি, ডাল, আর চিকেনের একটা লাইট প্রিপারেশন। কিন্তু পরিবেশটা মোটেই লাইট নয়। রাহুল নিজের প্লেটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রুটির টুকরোটা ডালের বাটিতে ডোবাচ্ছিল। ওর একবারের জন্যও মায়ের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না। ওর ভেতরে থাকা সেই অপরাধবোধটা এখন এক বিশাল পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। ইন্দিরা খাচ্ছিলেন খুব ধীরে ধীরে। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তিনি কোনো দীর্ঘ গভীর ঘুম ভেঙে এইমাত্র উঠেছেন। তাঁর চোখের কোলটা সামান্য ফোলা, গালদুটোয় এক অদ্ভুত ফ্যাকাসে, ক্লান্ত আভা। তাঁর নড়াচড়াগুলো বড্ড ধীর, বড্ড মন্থর। তিনি খাবার খাচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মন যেন এই ঘরে নেই, অন্য কোনো এক পরাবাস্তব দুনিয়ায় আটকে আছে। সুব্রত এই নিস্তব্ধতাটা ভাঙলেন। "তা, ইন্দিরা, তোমার কাজ তো দেখছি শেষই হচ্ছে না। দুপুরেও তো বেরোলে না ঘর থেকে। এই প্রেশারটা নিলে তোমার শরীর টিকবে কী করে?" সুব্রত একটা রুটির টুকরো মুখে পুরে বললেন। ইন্দিরা মুখ না তুলেই অত্যন্ত নিচু, শান্ত গলায় বললেন, "কাজ তো করতেই হবে। পেপারটা আজকে না পাঠালে ডেডলাইন মিস হতো। তা... তোমার ক্লাবের মিটিংটা তো ক্যানসেল হলো শুনলাম?" "হ্যাঁ, আর বোলো না। ওই পলিটিক্যাল গুন্ডাদের জন্য..." সুব্রত আবার তাঁর সেই দুপুরের বিরক্তিটা প্রকাশ করতে লাগলেন। রাহুল মাথা নিচু করেই খাচ্ছিল। হঠাৎ সুব্রত রাহুলের দিকে ফিরে একটু হাসলেন। "ওহ, ভালো কথা, ইন্দিরা! তুমি তো জানো না, তোমার ছেলে আজ আমাকে বেশ সারপ্রাইজ দিয়েছে।" ইন্দিরা এবার মুখ তুলে সুব্রতর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এক ক্লান্ত জিজ্ঞাসা। "সারপ্রাইজ?" "আমি দুপুরে ফিরে এসে যখন বললাম চা খাব, ও বলল ও নাকি বানিয়ে দেবে। আমি তো অবাক! জীবনে যে ছেলে এক গ্লাস জল গড়িয়ে খায় না, সে বানাবে চা! কিন্তু বিশ্বাস করো, চা-টা বেশ ভালোই বানিয়েছিল। ও আমাকে বলল যে ও নাকি তোমাকে চা বানাতে দেখে দেখেই শিখে গেছে। তুমিই নাকি ওকে শিখিয়েছ পরোক্ষে। আর তোমাকেও নাকি চা খাইয়েছিল আগে এক দিন। ওর কিন্তু এ-বিষয়েও ট্যালেন্ট আছে।" সুব্রত বেশ গর্বিত ভঙ্গিতেই কথাটা বললেন। টেবিলের ওপর মুহূর্তের জন্য একটা পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। ইন্দিরা প্রথম কয়েক সেকেন্ড সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিটা শূন্য। তারপর খুব ধীরে ধীরে, হালকা হেসে বললেন, "বেশ, ভালো কথা।" কিন্তু তাঁর সেই প্রখর, বুদ্ধিজীবী মগজটা তখন ইতিমধ্যেই এই ছোট্ট, আপাত-নিরীহ তথ্যটাকে প্রসেস করতে শুরু করে দিয়েছে। রাহুল চা বানিয়েছে? দুপুরে সুব্রত ফেরার পর? ইন্দিরা খুব ভালো করেই জানেন, তিনি তাঁর উনিশ বছরের ছেলেকে জীবনে কোনোদিন চা বানানো শেখাননি। এমনকি রাহুল তাঁর রান্না দেখতে বা শিখতে কোনোরকম আগ্রহও কোনোদিন দেখায়নি। তাহলে রাহুল সুব্রতকে এই ডাহা মিথ্যে কথাটা কেন বলল? হিসেবটা মেলাতে ইন্দিরার মগজে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। সুব্রত দুপুরে ফিরেছিল। সুব্রত নিশ্চয়ই ওপরে আসতে চেয়েছিল। আর রাহুল... রাহুল নিজের বাবাকে আটকে রাখার জন্য, তাঁকে নিচে বসিয়ে রাখার জন্য এই মিথ্যে চা বানানোর নাটকটা করেছে। কেন করেছে? কারণ... কারণ ওই সময়ে ইন্দিরা বাথরুমের ভেতরে ছিলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ইন্দিরার ফর্সা মুখমণ্ডলটা এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। তাঁর চোখের তারা দুটো আতঙ্কে, আর এক চরম, অবর্ণনীয় লজ্জায় প্রসারিত হয়ে গেল। তাঁর হাতের চামচটা প্লেটের ওপর একটা মৃদু 'ঠং' শব্দ করে খসে পড়ল। তাঁর মনে পড়ে গেল ওই দুপুরের কথা। ইন্দিরা বুঝতে পারলেন। তিনি সবটা বুঝতে পারলেন। রাহুল জানত তিনি বাথরুমের ভেতরে আছেন। রাহুল জানত সুব্রত ওপরে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। তার মানে... রাহুল ওই বাথরুমের দরজার ঠিক বাইরেই ছিল। রাহুল তাঁর ওই গোঙানি শুনেছে। রাহুল তাঁর ওই নাম ধরে ডাকাটা শুনেছে। রাহুল সবটা... সবটা জানে। এই চরম, হিমশীতল সত্যটা ইন্দিরার মগজে আছড়ে পড়তেই তাঁর মনে হলো কেউ যেন তাঁর গলাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। লজ্জায়, ঘৃণায়, আর এক গভীর ত্রাসে তাঁর মাথাটা আপনাআপনি বুকের কাছে নেমে এল। তিনি আর এক মুহূর্তের জন্যও মাথা তুলে সুব্রত বা রাহুলের দিকে তাকাতে পারলেন না। "হ্যাঁ... মানে..." ইন্দিরা অত্যন্ত তোতলানো, ফিসফিস করা গলায় কোনোমতে বললেন, তাঁর চোখদুটো প্লেটের ওপর স্থির, "ও তো... ও তো সব দেখেই শেখে... ও খুব... স্মার্ট ছেলে..." সুব্রত এই অস্বাভাবিকতাটা খেয়াল করলেন না। তিনি নিজের খাওয়া আর বকবক কন্টিনিউ করলেন। কিন্তু রাহুল বুঝতে পারল। মায়ের ওই চামচ পড়ে যাওয়া, ওই মুখ লাল হয়ে যাওয়া, আর ওইভাবে মাথা নিচু করে নেওয়া—রাহুল খুব ভালো করেই বুঝতে পারল যে মা সমীকরণটা মিলিয়ে ফেলেছে। মা জেনে গেছে যে রাহুল সব শুনেছে। রাহুলের নিজেরও মনে হলো ওর যেন এখনই মাটি ফুঁড়ে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে। ও আর একটা দানাও মুখে তুলতে পারল না। কোনোমতে হাতের রুটির টুকরোটা শেষ করে ও উঠে দাঁড়াল। "আমার... আমার খাওয়া হয়ে গেছে বাবা। আমি শুতে যাচ্ছি। গুডনাইট মা... গুডনাইট বাবা।" ইন্দিরা মাথা তুলেও দেখলেন না। শুধু একটা অস্ফুট শব্দ করলেন। রাহুল প্রায় ছুটে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। রাহুল নিজের ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে সোজাসুজি বিছানায় গিয়ে আছড়ে পড়ল। ঘরের আলোটা জ্বালানোরও প্রয়োজন বোধ করল না ও। শুধু রাস্তার স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ আলোটা জানলা দিয়ে এসে বিছানার এক কোণে পড়েছে। ও একটা সাইড-বালিশ শক্ত করে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকের ভেতরটা তখন একটা কুরুক্ষেত্র। অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি, আর এক ব্যাখ্যাহীন আদিম সুখ—এই তিনটে জিনিস ওর মগজকে ফালাফালা করে দিচ্ছিল। ও একজন খারাপ ছেলে। ও একটা জঘন্য, নোংরা ছেলে। এই কথাটা ওর মনের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল। মা ওকে এত ভালোবাসে, ওকে নিজের বুকে জায়গা দিয়েছে, ওকে নিজের ছোটবেলার স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে, আর ও কী করল? ও নিজের শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ওর এই উনিশ বছরের অবাধ্য শরীরটা মায়ের ওই পবিত্র, স্নেহমাখা ছোঁয়ার মর্যাদা রাখতে পারল না। ওই বাথরুমের ভেতরে, মায়ের ওই নরম হাতের তালুতে ওর যে বিস্ফোরণটা ঘটেছিল, সেটা তো কোনোভাবেই হওয়ার কথা ছিল না! ও কেন আটকাতে পারল না নিজেকে? মায়ের ওই ফর্সা, সুন্দর হাতের ও পেটের ওপর ওর শরীরের ওই নোংরা, আঠালো জিনিসটা ছিটকে পড়ার দৃশ্যটা ওর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল। লজ্জায় রাহুলের চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল। ও বালিশের কভারে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। ও মায়ের ভালোবাসার অপব্যবহার করেছে। মায়ের বিশ্বাস ভেঙেছে ও। মা কি ওকে ঘেন্না করছে এখন? কিন্তু... কিন্তু পরক্ষণেই ওর মগজের অন্য একটা অন্ধকার, অবদমিত কোণ থেকে একটা অন্য স্বর ভেসে এল। 'কিন্তু তোর তো ভালো লেগেছিল, রাহুল...' হ্যাঁ, লেগেছিল। ওর মনে পড়ল, যখন মায়ের আঙুলগুলো ওর শরীরে ওই চরম ম্যাজিকটা তৈরি করছিল, তখন ওর মনে হয়েছিল ও যেন স্বর্গে পৌঁছে গেছে। ওর মনে হয়েছিল, পৃথিবীর আর কেউ ওকে এতটা ভালোবাসতে পারে না, এতটা তৃপ্তি দিতে পারে না। ওই চরম মুহূর্তে ওর মায়ের প্রতি যে তীব্র, উদ্দাম ভালোবাসা জন্মেছিল, তা কোনো সাধারণ সম্পর্কের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। কিন্তু এই চিন্তাটাই ওকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলল। না, না! এটা ঠিক নয়! এটা নরমাল নয়! একজন ছেলের তার মায়ের সামনে এভাবে... এভাবে উত্তেজিত হওয়াটা সম্পূর্ণ পাপ! এটা বিকৃতি! ও কি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে? ভগবান, ও কী করে ফেলল! রাহুল বালিশটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ঠিক একই সময়ে, লম্বা করিডোরের একদম অন্য প্রান্তে, ইন্দিরার ঘরের পরিবেশটাও ছিল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক কুরুক্ষেত্র। সুব্রত তখন নিচে বসে টিভিতে নিউজ দেখছেন, ওপরে আসতে তাঁর আরও অন্তত আধ ঘণ্টা দেরি হবে। ঘরের সমস্ত আলো নেভানো। ইন্দিরা নিচের তলার সব কাজ সেরে এসে বিছানায় শুয়ে আছেন, তাঁর চোখদুটো খোলা, আর সেই চোখ দিয়ে অনর্গল, নিঃশব্দে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে কানের পাশ দিয়ে। অপরাধবোধ। এক ভয়ংকর, সর্বগ্রাসী অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তিনি কী করেছেন আজ দুপুরে? বাথরুমের ওই বদ্ধ দরজার আড়ালে তিনি ঠিক কী করেছেন? ইন্দিরার মনে পড়ে গেল সেই চরম মুহূর্তের কথা। হাতের ফর্সা মুঠোয় যখন তিনি রাহুলের সেই অমূল্য সম্পদটিকে তার সম্পূর্ণ, দৃঢ় এবং স্পন্দনশীল রূপে ধারণ করেছিলেন, তখন এক বাঁধভাঙা, অনন্ত ভালোবাসায় তাঁর বুকটা যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উথলে উঠেছিল। এক অদ্ভুত বিস্ময় আর নিবিড় মমতায় তাঁর মন বারবার ফিসফিস করে বলছিল—তাঁর ছোট্ট সোনাটা আজ সত্যিই কত বড় হয়ে গেছে! তারপর, রাহুল যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল, যখন ওর ওই চরম স্খলনের উষ্ণতাটা তাঁর পেটের ত্বকে তখনও লেগে ছিল, তখন তাঁর ভেতরে যেন একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি সজোরে ফেটে পড়েছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, ওই মুহূর্তে তাঁর নারীসত্তা এবং মাতৃসত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর মনে হয়েছিল, ছেলের ওই চরম সমর্পণটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর সেই ঘোরের বশেই... সেই আদিম, পাগলপারা ভালোবাসার ঘোরেই তিনি নিজের শরীরে হাত দিয়েছিলেন। তিনি নিজের শরীরকে তৃপ্তি দিয়েছিলেন, আর সেই তৃপ্তির চরম সীমায় পৌঁছে তিনি তাঁর নিজের সন্তানের নাম ধরে আর্তনাদ করেছিলেন। তখন... ঠিক ওই মুহূর্তে... জিনিসটাকে একটুও ভুল মনে হয়নি। মনে হয়েছিল, এটাই তো স্বাভাবিক! এটাই তো মাতৃত্বের আর প্রেমের এক চরম, অলৌকিক মাত্রা! ওর প্রতি তাঁর যে তীব্র টান, সেটাকে এক্সপ্রেস করার আর কোনো উপায় তাঁর শরীর খুঁজে পায়নি। কিন্তু এখন, এই রাতের অন্ধকারে, যুক্তিবাদী, প্রাজ্ঞ ডক্টর ইন্দিরা সেনের মনে হলো, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে চরিত্রহীনা নারী। "আমি কী করে পারলাম..." ইন্দিরা অন্ধকারে ফিসফিস করে ফুঁপিয়ে উঠলেন, নিজের হাতদুটো দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফেললেন তিনি। "ওটা... ওটা আমার ছোট্ট ছেলে... আমার নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধন... আর আমি জাস্ট... আমি ওর কথা ভেবে..." তিনি নিজের চিন্তাকেও একটা রূপ দিতে পারছিলেন না আত্মগ্লানিতে। একজন মা হয়ে তিনি এমন একটা নোংরা কাজ করেছেন! তিনি একটা খারাপ মা। তাঁর ওই পিএইচডি ডিগ্রি, ইউনিভার্সিটির সম্মান, সমাজের চোখে তাঁর ওই আভিজাত্যের মুখোশ—সবকিছু তাঁর কাছে এখন একতাল আবর্জনার মতো মনে হচ্ছিল। আর তার চেয়েও বড় ভয়ংকর সত্যিটা হলো... রাহুল সব শুনেছে। ইন্দিরার সারা শরীর একটা তীব্র আতঙ্কে শিউরে উঠল। ছেলেটা ওই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওর মায়ের ওই জঘন্য রূপটা টের পেয়েছে। ও কি ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে? ও কি ওর মাকে এখন ঘেন্না করছে? তিনি কি নিজের ছেলের জীবনটা চিরকালের মতো শেষ করে দিলেন? একটা দীর্ঘ, অন্ধকার করিডোর। তার দুই প্রান্তে দুটো আলাদা ঘর। আর সেই দুটো ঘরে, দুটো আত্মা, যারা একে অপরকে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, তারা আজ রাতের এই নিস্তব্ধতায় এক ব্যাখ্যাহীন, নিষিদ্ধ, এবং চরম অপরাধবোধের দহনে নিঃশব্দে কেঁদে চলল। তাদের এই কান্নার কোনো ভাষা ছিল না, কোনো সান্ত্বনা ছিল না, ছিল কেবল এক ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের হাহাকার। (continued in the next post...)
Parent