The Barter System - অধ্যায় ২৭
(rest of the Chapter...)
১৪ই আগস্ট। শুক্রবার।
রাহুলের প্রজেক্ট শিডিউল অনুযায়ী, প্রতি শুক্রবার ওর সুপারভাইজারের সাথে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রিভিউ মিটিং থাকে। ইন্দিরা এই রুটিনটা খুব ভালো করেই জানেন। আর তাই, গত আড়াই মাস ধরে প্রতি শুক্রবার সকালে তিনি নিয়ম করে রাহুলকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা লম্বা, উৎসাহব্যঞ্জক টেক্সট পাঠান। ওই কয়েকটা শব্দ, ওই মাতৃস্নেহে মোড়ানো আশীর্বাদগুলো রাহুলের কাছে কোনো সঞ্জীবনীর চেয়ে কম কিছু নয়; ওগুলো পড়লেই ওর মনে হয়, ওর মায়ের সেই উষ্ণ হাতটা যেন ওর পিঠের ওপর এসে বসেছে।
আজ সকালেও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না। সকাল সাড়ে আটটা বাজতেই ইন্দিরার ফোন থেকে মেসেজটা উড়ে গেল চেন্নাইয়ের আকাশে।
**ইন্দিরা:** "গুড মর্নিং রাহুল। আজকের মিটিংয়ের জন্য তোকে অনেক অনেক গুড উইশেস। জানি তুই ফাটিয়ে দিবি। অল দ্য বেস্ট সোনা। ❤️"
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেসেজটা ব্লু-টিক হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপরে ভেসে উঠল ‘typing...’।
**রাহুল:** "গুড মর্নিং মা! থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু আজ আসলে কোনো মিটিং নেই। স্যার আজ ছুটি নিয়েছেন।"
ইন্দিরা একটু অবাক হয়ে নিজের কি-বোর্ডে আঙুল রাখলেন।
**ইন্দিরা:** "তাই নাকি? হঠাৎ ছুটি কেন?"
**রাহুল:** "কাল তো ১৫ই আগস্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে। আর সেটা এমনিতেই শনিবার পড়ে গেছে, তাই এক্সট্রা কোনো উইকেন্ড হলিডে পাওয়া গেল না। সেই জন্যই স্যার আজকে ফ্রাইডে-টা অফ নিয়ে নিয়েছেন, যাতে একটা লং উইকেন্ড কাটাতে পারেন।"
ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
**ইন্দিরা:** "বাহ্! তোদের স্যারের তো দেখছি বেশ সুবিধে! আমার যদি এমন অপশন থাকত! আমাকে তো আজকেও কলেজ ছুটতে হবে। লাঞ্চের পর একটা টানা দু'ঘণ্টার ক্লাস আছে আমার থার্ড ইয়ারের সাথে।"
**রাহুল:** " সবাই তো আর আমার মায়ের মতো এত ডেডিকেটেড আর সিরিয়াস প্রফেসর নয়! তুমি তো জাস্ট একটা ওয়ার্কাহোলিক রিংমাস্টার!"
**ইন্দিরা:** "পাকা ছেলে! মাকে নিয়ে ইয়ার্কি? ❤️"
এর পর বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের মধ্যে সেই চিরচেনা, রুটিনমাফিক অথচ অত্যন্ত আন্তরিক মা-ছেলের কথোপকথন চলতে লাগল। ইন্দিরা জানতে চাইলেন গতকাল রাতে হস্টেলের মেসে কী খেতে দিয়েছিল। রাহুল যথারীতি মেসের পনিরের তরকারির তীব্র নিন্দা করল, আর বলল যে ও ইন্দিরার হাতের সেই মাটন কষা আর চিকেন কোরমা কতটা মিস করছে। ইন্দিরা ওকে বকা দিলেন, কেন ও রোজ রাতে এত দেরি করে ঘুমোচ্ছে; চোখের নিচে কালি পড়ে যাচ্ছে কি না সেটার খোঁজ নিলেন। আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ওর নতুন সেমিস্টার শুরু হয়ে যাবে, সেটা নিয়ে ওর প্রিপারেশন কেমন—সেসব নিয়েও বেশ কিছু কথা হলো।
ধীরে ধীরে, আলোচনার মোড়টা প্রজেক্টের দিকে ঘুরে গেল।
**ইন্দিরা:** "তা, মিটিং না থাকলেও প্রজেক্টের কাজ কতদূর এগোল তোর? আর তো মোটে দুটো সপ্তাহ বাকি। কমপ্লিট করতে পারবি তো ডেডলাইনের আগে?"
রাহুলের তরফ থেকে রিপ্লাই আসতে এবার কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় লাগল।
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা, একদম লাস্ট ফেজে আছি। আর সেই জন্যই প্রেশারটা এখন দশ গুণ বেড়ে গেছে। ডেটা অ্যানালিসিসগুলো কিছুতেই ঠিকঠাক মিলছে না, বারবার রান করাতে হচ্ছে। খুব স্ট্রেসফুল যাচ্ছে গত কয়েকটা দিন। মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক ঝটকায় ভারী হয়ে উঠল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর এই ছেলেটা পড়াশোনা নিয়ে কতটা সিরিয়াস, আর কতটা নিখুঁতভাবে ও কাজ করতে চায়। কিন্তু এই প্রথমবার, ওর এত বড় একটা মানসিক চাপের সময়, তিনি ওর পাশে নেই। তিনি ওর কপালের ঘামটা মুছে দিতে পারছেন না, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করতে পারছেন না। তাঁর মাতৃসত্তা এক অদ্ভুত অসহায়তায় ডুকরে কেঁদে উঠল।
**ইন্দিরা:** "ওহ্ সোনা আমার... আমি বুঝতে পারছি তোর ওপর কতটা চাপ যাচ্ছে। প্লিজ বাবু, মাঝে মাঝে একটু ব্রেক নিবি। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবি না। আর মাত্র তো কয়েকটা দিন... তারপরই তো তুই বাড়ি ফিরে আসবি। জাস্ট হোল্ড অন সোনা, অ্যান্ড কিপ গোয়িং।"
**রাহুল:** "আমি জানি মা... কিন্তু আমি সত্যি আর পারছি না। আমি তোমাকে বড্ড মিস করছি মা... জাস্ট বড্ড বেশি মিস করছি।"
এই কথাটা এর আগেও রাহুল বহুবার বলেছে, কিন্তু আজকের এই 'মিস করছি' শব্দগুলোর ওজন যেন অনেক বেশি। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম অবসাদ আর একাকীত্বের হাহাকার। ইন্দিরার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে এল।
**ইন্দিরা:** "আমি জানি রে বাবু... আমারও কি তোকে ছাড়া এক মুহূর্ত ভালো লাগে? তুই ফিরে আয়... আমি কথা দিচ্ছি, তুই বাড়ি ঢুকলে তোকে আমি এমন শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরব যে তুই সব স্ট্রেস ভুলে যাবি। তোকে আমি ছাড়বই না।"
রাহুলের ঘর থেকে আবার 'typing...' দেখা গেল।
**রাহুল:** "শুধু জড়িয়ে ধরবে? কতদিন হয়ে গেল... আমি তোমাকে একটু চুমু খেতে পারিনি মা..."
ইন্দিরার বুকটা ধক করে উঠল। তাঁর আঙুলগুলো স্ক্রিনের ওপর স্থির হয়ে গেল। তিনি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন, যদিও তিনি নিজের স্টাডি রুমেই একা বসে আছেন।
**ইন্দিরা:** "রাহুল! সোনা, প্লিজ... চ্যাটে এসব লিখিস না বাবু। তুই জানিস এটা ঠিক নয়।"
**রাহুল:** "কেন মা? প্লিজ... আমি এখানে বড্ড একা ফিল করছি... সারাক্ষণ শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছে আমার। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না... ঠিক আছে, তুমি যদি চ্যাটে লিখতে না চাও, আমি তোমাকে কল করছি?"
ইন্দিরা দ্রুত, প্রায় প্যানিকের সাথে টাইপ করলেন।
**ইন্দিরা:** "না না না! একদম কল করবি না এখন সোনা! তোর বাবা ওই পাশের ছোট স্টাডি রুমটায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে, ও পরিষ্কার সব শুনতে পাবে। প্লিজ সোনা, ট্রাস্ট মি... তুই যদি এখন আমার সামনে থাকতিস, আমি তোকে হাজার হাজার বার আদর করতাম, তোকে সারা মুখে চুমু খেতাম... আমার সোনা ছেলে, আমার বাবু, আমার পুচু... প্লিজ মা-কে একটু বোঝার চেষ্টা কর।"
রাহুলের দিক থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো রিপ্লাই এল না। তারপর একটা মেসেজ ঢুকল।
**রাহুল:** "জানো মা... মাঝে মাঝে রাতে যখন আমি শুয়ে থাকি, আমি চোখ বন্ধ করে ইমাজিন করি যে তুমি আমার ঠিক পাশেই শুয়ে আছো... একদম সেই রাতের মতো... আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছি..."
ইন্দিরা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর নিজের গালদুটো তখন ভিজে উঠেছে।
**ইন্দিরা:** "ওহ্ সোনা... তুই আমাকে কাঁদাবি এবার। তুই কি সারাক্ষণ এভাবেই স্যাড হয়ে থাকিস ওখানে?"
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা... তুমি তো জানো তুমিই আমার সবকিছু... যখন আমি পড়াশোনা করি না, তখন আমার মাথায় শুধু তুমি আর তুমিই ঘুরপাক খাও। আর যখন এই স্ট্রেস আর ফ্রাস্ট্রেশনটা একদম লিমিট ক্রস করে যায়... তখন আমি তোমার ওই ছবিটা বের করে দেখি... আর বিশ্বাস করো, কিছুক্ষণ ওই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার ভেতরটা অনেকটা শান্ত হয়ে যায়।"
ইন্দিরা ভুরু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। ছবি? কোন ছবির কথা বলছে রাহুল? তাঁর মগজটা একটু পেছনের দিকে দৌড়ল, আর পরক্ষণেই তাঁর স্মৃতিতে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল।
**ইন্দিরা:** "কোন ছবি? তুই... তুই কি কয়েক মাস আগের সেই বাথরুমের ছবিটার কথা বলছিস? ওহ্ মাই গড, সোনা! তুই এখনও ওই ছবিটা নিজের ফোনে রেখে দিয়েছিস? আমি তোকে সেদিন ওটা ডিলিট করতে বলেছিলাম না? কেউ দেখে ফেললে কী কেলেঙ্কারিটা হতে পারে ভাবতে পারছিস?"
ইন্দিরার আঙুলগুলো এবার রাগে নয়, এক চরম উদ্বেগে কাঁপতে শুরু করল। তিনি দ্রুত টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "তোর তো একজন রুমমেট আছে না? কী যেন নাম ওর?"
**রাহুল:** "উদয়ন।"
**ইন্দিরা:** "হ্যাঁ, উদয়ন! যদি ও কোনোভাবে তোর ফোন ঘাঁটতে গিয়ে ওটা দেখে ফেলে? তুই ডিলিট করিসনি কেন রাহুল? তুই মায়ের কথা কেন শুনিসনি?"
রাহুল বুঝতে পারল মা কতটা প্যানিক করছে। ও অত্যন্ত শান্তভাবে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে লিখল:
রাহুল: "মা, প্লিজ... আগে একটু শান্ত হও মা। তুমি যদি এটা ভেবে ভয় পাও যে অন্য কেউ ছবিটা দেখে ফেলবে, তাহলে বিশ্বাস করো, এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কারো ওটা দেখার কোনো চান্স নেই। ছবিটা আমার ফোনের এমনি গ্যালারিতে নেই মা, ওটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা একটা হিডেন ফোল্ডারের ভেতর সেভ করা আছে। আর উদয়ন? ও তো আমার অনেক আগেই রাতে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যায়। তাছাড়া ওর বিছানাটা এমন দিকে যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখারও কোনো উপায় নেই আমি ফোনে কী করছি। তাই প্লিজ মা, তুমি একদম চিন্তা কোরো না।"
ইন্দিরা মেসেজটা পড়ে একটু স্বস্তি পেলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই অভিভাবক সত্তাটা তখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি।
**ইন্দিরা:** "ওকে, আমি মানলাম উদয়ন দেখবে না। কিন্তু আমি তো তোকে সেদিনই ওটা ডিলিট করতে বলেছিলাম, তাই না? তুই কেন করিসনি? মায়ের কথা শুনতে তোর কী প্রবলেম হয় রাহুল?"
**রাহুল:** "মা, প্লিজ... আমার সিচুয়েশনটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। হ্যাঁ, আমার অনেক আগেই তোমাকে বলা উচিত ছিল যে আমি ওটা ডিলিট করিনি। আই অ্যাম সো সরি ফর দ্যাট মা। আসলে এত কিছু হচ্ছিল তখন, আমি সুযোগই পাইনি তোমাকে বলার। কিন্তু মা, আমি তোমার পায়ে পড়ছি... প্লিজ আমাকে ওটা ডিলিট করতে বোলো না।"
ইন্দিরা একটু নরম হলেন। তাঁর আঙুলের গতি ধীর হয়ে এল।
**ইন্দিরা:** "কী হয়েছে সোনা? তুই এমনভাবে কথা বলছিস কেন?"
রাহুল: "আমার ফোনে তোমার খুব বেশি ছবি নেই মা। এমনিতে তো তুমি ছবি তুলতে বা ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে একদম পছন্দ করো না, আমি জানি। কিন্তু এই ছবিটা... এই ছবিটা আমার কাছে বড্ড স্পেশাল, মা। এটা তুমি নিজের হাতে তুলেছিলে... শুধুমাত্র আমার জন্য। এটা তোমার তরফ থেকে পাওয়া আমার সবচেয়ে দামি উপহার। আর সত্যি বলতে কী, এটাই এখন আমার একমাত্র ওষুধ মা। যখন প্রচণ্ড স্ট্রেস হয়, যখন মনে হয় আমি আর একদম পারছি না... আমি তখন ওই ফোল্ডারটা খুলে তোমার ওই রূপটার দিকে তাকিয়ে থাকি। তখন আমার মনে হয়, তুমি আমার একদম পাশেই আছো। আমার ভেতরটা কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়, মা।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা যেন একটা বিশাল, অতলস্পর্শী ভালোবাসার সমুদ্রে পরিণত হলো। তাঁর চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নেমে এল। তাঁর এই বাচ্চা ছেলেটা, তাঁর বাবুসোনাটা, তাঁর পাঠানো ওই চরম ব্যক্তিগত, নিষিদ্ধ একটা ছবিকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রত্নের মতো আগলে রেখে দিয়েছে! ও ওই ছবিটার মধ্যে খুঁজছে ওর মায়ের সেই আদিম, নিঃশর্ত আশ্রয়টাকে।
ইন্দিরা কি নিজেও এই ছেলেটার জন্য ঠিক এমনটাই অনুভব করেন না? তিনি একজন পরিণতমনস্কা নারী, তিনি তাঁর আবেগগুলোকে সমাজের কঠিন আবরণে ঢেকে রাখতে জানেন। কিন্তু তাঁর এই ছোট্ট ছেলেটা, যে আজ হাজার কিলোমিটার দূরে, সম্পূর্ণ একা, তার নিজের মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিনের পর দিন একটা অচেনা পরিবেশে লড়াই করছে—সে যদি তার মায়ের একটুখানি সান্নিধ্যের জন্য ওই ছবির দ্বারস্থ হয়, তবে সেটা কি খুব অস্বাভাবিক?
ইন্দিরা ভাবলেন, রাহুল কতটা ম্যাচিওর! ও ছবিটাকে একটা পাসওয়ার্ড-প্রোটেক্টেড ফোল্ডারে লুকিয়ে রেখেছে, শুধু তাঁর প্রাইভেসি, তাঁর সম্মান রক্ষা করার জন্য। এমন একটা সমঝদার, মিষ্টি আর দায়িত্বশীল ছেলের কাছ থেকে তিনি কীভাবে ওর ওই একমাত্র বাঁচার রসদটুকু কেড়ে নিতে পারেন? কোন অধিকারে?
তিনি নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখদুটো মুছে নিয়ে অত্যন্ত নরম, মমতায় মোড়ানো আঙুলে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "সোনা... প্লিজ শুধু একটু সাবধান থাকিস, ওকে? তুই খুব ভালো করেই জানিস ওটা মায়ের কতটা প্রাইভেট আর সেনসিটিভ একটা ছবি... জাস্ট খেয়াল রাখিস যাতে কারও চোখে না পড়ে।"
এতক্ষণ ইমোশনাল হয়ে থাকলেও, রাহুল মায়ের এই মেসেজটা পেয়ে নিজের সেই চিরচেনা, ফাজিল ফর্মে ফিরে এল।
**রাহুল:** "কেউ না? তাহলে তো আমিও আর দেখতে পাব না..."
ইন্দিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা কপট রাগের ইমোজি ( ) দিলেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি এক অদ্ভুত তৃপ্তি আর আনন্দ পাচ্ছিলেন এই ভেবে যে, তাঁর ছেলেটা অন্তত একটু হলেও হালকা ফিল করছে।
**ইন্দিরা:** "তোর কি মুখের কোনো লাগাম নেই রে বাঁদর ছেলে? এত সিরিয়াস ইমোশনাল কথার মাঝখানেও তোকে একটা স্টুপিড ইয়ার্কি মারতেই হবে, তাই না?"
**রাহুল:** "সরি মা ... দেখলে তো? তোমার সাথে জাস্ট একটুখানি চ্যাট করলেই আমার সারা দিনের মুড কেমন ম্যাজিকের মতো ভালো হয়ে যায়। এনিওয়ে... তার মানে তুমি বলছ, আমি তোমার ওই ছবিটা দেখতে পারি, তাই তো মা?"
ইন্দিরা: "হ্যাঁ রে বাবা হ্যাঁ, আমার সোনা বাবু তার মায়ের ছবি যখন খুশি, যতবার খুশি দেখতে পারে। কারণ... ওটা তো শুধুই তোর জন্য তোলা রে সোনা।"
রাহুলের দিক থেকে এবার কোনো ইয়ার্কি এল না। ও অত্যন্ত আন্তরিকতা আর গভীরতার সাথে লিখল:
**রাহুল:** "মা, তোমাকে আমি বড্ড ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার চোখের জল আর বাধা মানল না। একজন মা হিসেবে তিনি বুঝতে পারছিলেন ওই ছোট্ট বাক্যটার পেছনে কতটা তীব্র আর খাঁটি আবেগ লুকিয়ে আছে। তাঁর মনে হচ্ছিল, সব কাজ, সব দায়িত্ব ফেলে এক্ষুনি একটা ফ্লাইট ধরে চেন্নাই চলে যান, আর ছেলেটাকে বুকের মধ্যে এমনভাবে পিষে ধরেন যাতে ওর সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যায়। আর... আর ওর সারা মুখে আর গায়ে নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে চুমু খেতে থাকেন।
তিনি চোখের জল মুছে হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকালেন। ন'টা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তাঁকে এবার রেডি হতেই হবে। কিন্তু তিনি কিছুতেই এই চ্যাটটা এখন ছেড়ে উঠতে পারছিলেন না। তাঁর ছেলের এখন তাঁকে দরকার, আর তিনি যতক্ষণ সম্ভব ওর সাথে এভাবেই কথা বলে যাবেন। তাই তিনি ঠিক করলেন, চ্যাট করতে করতেই তিনি রেডি হবেন।
**ইন্দিরা:** "আমিও তোকে বড্ড ভালোবাসি রে সোনা। শোন, আমাকে তো এবার কলেজের জন্য রেডি হতে হবে। তুই ততক্ষণ বল তো, প্রজেক্টে আর নতুন কী কী করলি?"
রাহুল উৎসাহের সাথে বলতে শুরু করল, কীভাবে ওদের টিমের একটা বড় ক্যালকুলেশন আটকে ছিল, আর তারপর ওদের প্রফেসর কীভাবে একটা ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া দিয়ে পুরো প্রবলেমটা সলভ করে দিলেন।
এদিকে, নিজের ঘরের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে ইন্দিরা তাঁর পরনের আরামদায়ক, হালকা সুতির ঘরের শাড়িটার আঁচল খসিয়ে দিলেন। ফোনটা বিছানার ওপর রাখা। শাড়িটা খুলে ইজিচেয়ারের ওপর রাখতেই মে মাসের গুমোট গরমের মাঝে সিলিং ফ্যানের বাতাস তাঁর অনাবৃত ত্বকে একটা অদ্ভুত আরাম বুলিয়ে দিল। তিনি ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "বাহ্! তোদের স্যার তো দেখছি সত্যি খুব ব্রিলিয়ান্ট। এমন প্রফেসরের আন্ডারে কাজ করাটাও তো একটা বড় এক্সপেরিয়েন্স।"
মেসেজটা পাঠিয়ে তিনি নিজের ঘরের সুতির ব্লাউজ আর ব্রা-টার হুক খুলতে শুরু করলেন। হুকগুলো খুলতেই তাঁর মনে পড়ে গেল সেই সকালের কথা, যেদিন রাহুলের উষ্ণ, আনাড়ি আঙুলগুলো এই হুকগুলোর ওপর দিয়েই খেলা করেছিল। একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ শিহরণ তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। আজ সকালে স্নান সেরে ওঠার পর পরা পরিষ্কার সায়া আর প্যান্টিটা পাল্টানোর কোনো দরকার ছিল না, তাই নিম্নাঙ্গের সেই আবরণটুকু শরীরে অবিকৃত রেখেই তিনি সম্পূর্ণ অনাবৃত বক্ষে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
রাহুলের রিপ্লাই এল:
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা, কিন্তু প্রবলেম হলো স্যার ব্রিলিয়ান্ট ঠিকই, কিন্তু মানুষ হিসেবে বড্ড খিটখিটে। একটু ভুল হলেই এমন রিয়্যাক্ট করেন যেন আমরা মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছি। এই লাস্ট উইকগুলোতে ওই জন্যই স্ট্রেসটা বেশি।"
ইন্দিরা আলমারি থেকে তাঁর বাইরে পরার পোশাকটা বের করলেন—সাদা মোটিফ করা একটা গাঢ় বাদামি রঙের সুতির শাড়ি। সাথে মানানসই একটা বাদামি ব্লাউজ আর নিখুঁত ফিটিংয়ের ব্রা। তিনি অভ্যস্ত হাতে ব্রা-টা পরে নিয়ে, ব্লাউজের বোতামগুলো আটকাতে শুরু করলেন।
**ইন্দিরা:** "ওটা সব ফিল্ডেই হয় রে সোনা। বড় মানুষদের একটু টেম্পারামেন্টাল ইস্যু থাকেই। তুই জাস্ট নিজের কাজে ফোকাস রাখ, স্যারের কথায় পার্সোনালি কিছু নিস না।"
ব্লাউজটা পরার পর তিনি বাদামি শাড়ির কুঁচিগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধরতে শুরু করলেন। শাড়ির খসখস শব্দটা নিস্তব্ধ ঘরে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছিল। তিনি শাড়িটা পরে, আঁচলটা কাঁধের ওপর পিন-আপ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বসলেন।
**রাহুল:** "চেষ্টা তো করছি মা... কিন্তু মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে সোজা বাড়িতে পালিয়ে আসি। তোমার কোলে মাথা রেখে জাস্ট ঘুমিয়ে পড়ি।"
রাহুলের এই ফিরে আসা স্ট্রেস আর হতাশার কথাটা ইন্দিরার বুকের ভেতর আবার একটা ধাক্কা দিল। তিনি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে নিজের চুলগুলো চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করলেন। তাঁর মুখের রেখাগুলোতে এক প্রচ্ছন্ন ক্লান্তি আর বিষণ্ণতা। তিনি চিরুনিটা নামিয়ে রেখে, নিজের সবচেয়ে প্রিয়, হালকা মেরুন রঙের লিপস্টিকের টিউবটা খুললেন। ঠোঁটে নিখুঁতভাবে রংটা লাগাতে লাগতে তিনি ভাবতে লাগলেন, এই ছেলেটাকে শান্ত করার জন্য তিনি ঠিক কী করতে পারেন?
**ইন্দিরা:** "আর তো মাত্র দু'সপ্তাহ, সোনা। একটু কষ্ট করে ম্যানেজ করে নে। আমি তো আছি।"
রাহুলের তরফ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো রিপ্লাই এল না। তারপর স্ক্রিনে একটা মেসেজ ফুটে উঠল:
**রাহুল:** "মা, একটা রিকোয়েস্ট করব?"
ইন্দিরা লিপস্টিকের ক্যাপটা আটকে রেখে ফোনটা হাতে নিলেন। তাঁর ভুরুদুটো সামান্য কুঁচকে গেল।
**ইন্দিরা:** "কী রিকোয়েস্ট, সোনা? তুই আবার এমনভাবে বলছিস কেন?"
স্ক্রিনে আবার 'typing...' ভেসে উঠল।
**রাহুল:** "আই মিন... মা... তুমি কি আমাকে আরেকটা ছবি পাঠাবে?"
ইন্দিরা কিছু একটা রিপ্লাই দেওয়ার কথা ভাবছেন, ঠিক তখনই দেখলেন রাহুলের মেসেজটা এডিট হয়ে গেল।
**রাহুল:** "আই মিন... মা... তুমি কি আমাকে ঠিক ওইরকম আরেকটা ছবি পাঠাবে?"
ইন্দিরা এবার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন ছেলেটা ঠিক কী চাইছে। তাঁর বুকের ভেতরটা এক প্রবল, বন্য ধাক্কায় কেঁপে উঠল। তাঁর হাতদুটো সামান্য কাঁপছে। তিনি ঢোক গিলে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "সোনা... আরেকটা ছবি? এখন?"
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা, প্লিজ।"
ইন্দিরা অত্যন্ত নার্ভাস হয়ে, পরিস্থিতিটাকে একটু ঘোরানোর চেষ্টা করে লিখলেন:
**ইন্দিরা:** "ওয়েল, আমি তো কলেজের জন্য পুরো রেডি হয়ে গেছি সোনা। আমি বরং এখনকার মতো একটা কুইক সেলফি তুলে পাঠিয়ে দিই? সেটা হলে হবে, বাবু?"
রাহুল খুব ভালো করেই জানে, মায়ের ওই অত্যন্ত মার্জিত, শাড়ি-পরা প্রফেশনাল মুখটার ছবি দেখলে ওর মন ভালো হবে ঠিকই, কিন্তু ওর শরীরের ভেতরে জমে থাকা ওই চরম স্ট্রেস আর অবদমিত তৃষ্ণাটা কিছুতেই মিটবে না। আর ইন্দিরাও সেটা খুব ভালো করেই জানতেন। তিনি শুধু নিজের ভেতরের ওই প্রবল, নিষিদ্ধ অনুভূতিটাকে কোনোমতে আটকানোর জন্যই এই কথাটা লিখেছিলেন।
**রাহুল:** "মা প্লিজ। ওই ছবিটার মতো। প্লিজ মা।"
**ইন্দিরা:** "কিন্তু সোনা, আমি তো বললাম আমি বেরোনোর জন্য পুরো রেডি হয়ে গেছি। প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর সোনা।"
**রাহুল:** "নিশ্চয়ই কোনো না কোনো উপায় আছে, মা..."
ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ভাবলেন। আর পরক্ষণেই তাঁর মাথায় একটা সাংঘাতিক ভয়ংকর চিন্তার উদয় হলো। উদয়ন! রাহুলের রুমমেট! হায় ভগবান! এই মুহূর্তে যদি তিনি এমন কোনো ছবি পাঠান, আর উদয়ন যদি সেটা কোনোভাবে দেখে ফেলে? না, না, তিনি কিছুতেই এই রিস্ক নিতে পারবেন না। তাঁর পেটের ভেতরটা এক অজানা, স্নায়বিক আতঙ্কে গুলিয়ে উঠল।
ঠিক তখনই স্ক্রিনে রাহুলের পরের মেসেজটা ফুটে উঠল।
**রাহুল:** "মা প্লিজ... এখানে কেউ নেই। উদয়ন তো লোকাল ছেলে। স্যার যেহেতু আজ নেই, ও কাল রাতেই নিজের বাড়ি চলে গেছে। সোমবার ফিরবে। এই গোটা ঘরে শুধু আমি আছি, মা। আর আমার ফ্লোরের বাকি স্টুডেন্টদের আজ ক্লাস আছে, নয়তো প্রজেক্টের কাজ আছে, তাই পুরো ফ্লোরটাই একদম ফাঁকা। আমাকে কেউ ডিস্টার্ব করবে না মা। ট্রাস্ট মি।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বুকের ওপর থেকে শুধু যে এক বিশাল পাথর নেমে গেল তা-ই নয়, তিনি এক গভীর বিস্ময় এবং প্রবল আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি তো নিজের আশঙ্কার কথা বা উদয়নের কথা চ্যাটে ঘুণাক্ষরেও লেখেননি! তাহলে রাহুল কী করে এক লহমায় বুঝে গেল যে ওর মা ঠিক কোন ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছেন? এই অলৌকিক মানসিক বোঝাপড়াটা ইন্দিরার বুকের ভেতর ভালোবাসার এক নতুন, অতলস্পর্শী জোয়ার নিয়ে এল। তাঁর এই একমাত্র সন্তান, তাঁর নাড়ি-ছেঁড়া ধন—তাঁর নিজের হৃৎপিণ্ডটা যেমন ওর জন্য প্রতি মুহূর্তে স্পন্দিত হয়, ছেলেটার হৃদয়ও ঠিক সেভাবেই মায়ের প্রতিটি না-বলা কথা, প্রতিটি লুকোনো ভয় নিমিষে পড়ে ফেলতে পারে। বাহ্যিক দুটো আলাদা শরীর হলেও, তারা তো আসলে একটাই সত্তা, একটাই আত্মা! এই অমোঘ সত্যটা উপলব্ধি করতেই তাঁর সেই দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাসের সাথে সাথেই ধীরে ধীরে এসে বাসা বাঁধল এক শিরশিরে, গোপন উত্তেজনা। তাঁর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো আবার কিপ্যাডের ওপর চলতে শুরু করল।
**ইন্দিরা:** "সোনা... তুই সত্যিই এখন ওরকম একটা ছবি চাস?"
**রাহুল:** "মা... এটা পেলে আমার সব স্ট্রেস, সব কষ্ট এক নিমিষে গায়েব হয়ে যাবে... আমি অনেক বেশি হ্যাপি ফিল করব..."
ইন্দিরা বুঝতে পারছিলেন না তিনি কী লিখবেন। তাঁর ভেতরের সমস্ত লজিক, সমস্ত সমাজ-সংস্কার তখন ওই ছেলেটার আকুলতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তিনি শেষমেশ নিজের মনের ওই কাঁপানো, লাজুক অনুভূতিটাই টাইপ করে বসলেন।
**ইন্দিরা:** "সোনা, মায়ের বড্ড লজ্জা করছে রে... অনেকগুলো দিন কেটে গেছে তো..."
**রাহুল:** "মা, এতে লজ্জার কী আছে? আমিই তো আছি এখানে... অন্য কেউ তো নয়, তাই না?"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। "আমিই তো... অন্য কেউ তো নয়"—এই প্রায় একই রকম কথাটা তিনি নিজেই তো রাহুলকে বলেছিলেন, সেই এপ্রিল মাসের ওই দুপুরে, যখন রাহুল বাথরুমের ভেতর তাঁকে প্রথমবার সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায় দেখে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা!
ইন্দিরা ফোনটা নামিয়ে রেখে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকালেন। জানলার পর্দাগুলো খোলা থাকায় পূর্বাহ্ণের কড়া, উজ্জ্বল রোদ এসে পড়েছে তাঁর মুখের ওপর। আয়নার প্রতিবিম্বটায় তিনি দেখলেন, সেখানে রাহুলের সেই আদুরে, প্রশ্রয়দাত্রী 'মা' বসে নেই; সেখানে বসে আছেন ডক্টর ইন্দিরা সেন। তাঁর সেই নিখুঁতভাবে পরা বাদামি শাড়ি, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, আর ঠোঁটের ওই মেরুন লিপস্টিক—সব মিলিয়ে তিনি এখন এক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, সম্মানিত এবং মাঝে মাঝে ভয়-জাগানো এক অধ্যাপিকার প্রতিমূর্তি। এই প্রখর আলোর নিচে, এই নিখুঁত প্রফেশনাল রূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে রাহুলের সেই আকাঙ্ক্ষিত, আদরের 'মা' হয়ে ওঠাটা বড্ড কঠিন ঠেকছিল। এই অবয়বটা বড্ড বেশি কেতাদুরস্ত, বড্ড বেশি আনুষ্ঠানিক। তাঁকে এই আলো আর এই প্রফেশনাল আবরণ থেকে মুক্তি পেতেই হবে।
তিনি ধীর পায়ে উঠে গিয়ে জানলার ভারী, গাঢ় রঙের পর্দাগুলো একে একে টেনে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই কড়া রোদ বাইরে আটকে গিয়ে ঘরের ভেতর নেমে এল এক আবছা, মখমলি অন্ধকার। এই আধো-অন্ধকার পরিবেশে তাঁর ওই রাশভারী প্রফেসরের মুখোশটা যেন ধীরে ধীরে খসে পড়তে লাগল। চারপাশের এই ছায়াঘেরা প্রচ্ছায়া তাঁকে এক নিবিড় নিরাপত্তা দিল; যেন এই অন্ধকারের অবগুণ্ঠনেই তাঁর ভেতরের সেই সত্যিকারের নারী, সেই সমর্পিত মাতৃত্ব তার সমস্ত আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলে নির্ভয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি বিছানায় ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "দাঁড়া সোনা, দেখছি কী করা যায়... আমি তো বেরোনোর জন্য একদম শাড়ি-টারি পরে রেডি হয়ে গেছি, তাই একটু অসুবিধা হবে... আর শোন, ছবিটা কিন্তু একটু অন্ধকার আসবে রে, ঠিক আছে?"
**রাহুল:** "ওহ্ মা, তোমাকে এসব কিচ্ছু বলতে হবে না। তুমি যাই পাঠাও না কেন, সেটা আমার কাছে ওই আগের ছবিটার মতোই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহার হয়ে থাকবে।"
এরপর বেশ কয়েক মিনিট চ্যাটবক্সে একটা পিনপতন নীরবতা।
ইন্দিরা ভাবছেন তিনি ঠিক কী করবেন। এক প্রবল, উথালপাথাল করা মাতৃত্ব আর নারীত্বের জলোচ্ছ্বাস তাঁর ভেতরে আছড়ে পড়ছে। অবশেষে তিনি একটা উপায় বের করলেন... হ্যাঁ, এভাবেই করা যেতে পারে... খুব বেশি সময় লাগবে না... আর তাছাড়া... তাঁর ওই বাচ্চা ছেলেটার বুকের ওই পুঞ্জীভূত হাহাকারটাকে তো শান্ত করতেই হবে।
চেন্নাইয়ের হস্টেলের ঘরে বসে রাহুল তখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। ওর হৃৎপিণ্ডটা পাগলের মতো বুকের পাঁজরে ধাক্কা মারছে।
অবশেষে, স্ক্রিনে একটা ইমেজ ফাইল লোড হতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছবিটা পুরোটা ফুটে উঠল।
একটা সেলফি।
https://iili.io/Cs8qWWx.png
ছবিটা খুলতেই রাহুলের বুকের ভেতর সেই পুরনো, চেনা আগ্নেয়গিরিটা সজোরে ফেটে পড়ল। এপ্রিলের সেই প্রথম ছবিটা দেখে ওর যে তীব্র উষ্ণতা আর শিহরণ হয়েছিল, এই মুহূর্তের অনুভূতিটা তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি শক্তিশালী, দশ গুণ বেশি মাদকতাময়। ওর মগজের শিরা-উপশিরাগুলো যেন এক প্রবল উত্তেজনায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। ওর চোখদুটো ছবিটার প্রতিটা ইঞ্চিতে আটকে গেল। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন নিমেষে নেমে এল ওর তলপেটে। অবচেতনভাবেই ওর হাতদুটো চলে গেল ওর ট্র্যাকপ্যান্টের ওপর। কাপড়ের ওপর দিয়েই ও নিজের সেই ঋজু, স্পন্দনশীল, এবং চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৌরুষটিকে শক্ত করে চেপে ধরল।
ঠিক দু-তিন মিনিট পর, ছবির নিচে ইন্দিরার একটা লম্বা মেসেজ ফুটে উঠল। মেসেজটা আদ্যোপান্ত এক মায়ের তার ছেলের প্রতি অন্ধ, নিঃশর্ত এবং সর্বগ্রাসী ভালোবাসায় মোড়ানো।
**ইন্দিরা:** "রাহুল, এটা শুধুই তোর জন্য। আবার বলছি সোনা, প্লিজ সাবধানে রাখিস এটা, বাইরের কারও চোখে যেন না পড়ে। তুই তো জানিস মা তোকে কতটা ভালোবাসে, তাই না? আমার বাচ্চা, আমার সোনা, আমার বাবু, আমার পুচু... মা তোকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না রে। তুই-ই মায়ের সব, মায়ের গোটা পৃথিবী। মা তার বাবুর জন্য সবকিছু করতে পারে, সব..."
মেসেজটা পড়তে পড়তেই রাহুলের শরীরের ভেতরের ওই দাবানলটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। ও ট্র্যাকপ্যান্টের দড়িটা টেনে আলগা করে দিল এবং নিজের ওই উত্তপ্ত, কাঁপতে থাকা স্পন্দনটিকে সরাসরি হাতের মুঠোয় বের করে আনল। স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করতে থাকা মায়ের ওই মোহময় রূপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেই ওর হাতটা চলতে শুরু করল। হাতের ওই ওঠানামার ছন্দে ওর মগজে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল সেই এপ্রিলের দুপুরের স্মৃতিটা। বাথরুমের সেই ঠান্ডা জলের নিচে মায়ের নরম, ফর্সা আঙুলগুলো ঠিক এভাবেই তো ওকে ধরেছিল! মায়ের হাতের সেই জাদুকরী, পিচ্ছিল ছন্দের কথা মনে করে রাহুল নিজের হাতের মুঠোটাকে ঠিক সেইভাবেই চালাতে লাগল, যেন ওর নিজের হাত নয়, স্বয়ং মা-ই ওকে আদর করে দিচ্ছে।
ও মেসেজের পরের অংশটা পড়তে শুরু করল:
**ইন্দিরা:** "প্লিজ আর একটুও মন খারাপ করে থাকিস না। আমার ছবিটার দিকে তাকা সোনা, আর ভাব যে মা তোর একদম পাশেই আছে। মা তোকে শান্ত করে দিচ্ছে, ঠিক যেমনটা মা সবসময় করে। মা তোকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে পিষে ধরে আছে, যেন আর কোনোদিন তোকে ছেড়ে দেবে না। তোর সারা মুখে, কপালে হাজার হাজার চুমু খাচ্ছে মা। আর হ্যাঁ... ঠোঁটেও খাচ্ছে সোনা... ওই যে... তোর যেরম ভাল লাগে... ঠিক ওইভাবেও চুমু খাচ্ছে সোনা... জিভ দিয়ে... ঠিক সেই দিনের মতো... শুধুই তোর জন্য।"
রাহুলের হাতের ওঠানামার গতি এবার বন্য, রাক্ষুসে হয়ে উঠল। স্ক্রিনের ছবিটার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে ওর মুখ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসতে লাগল অস্ফুট, ঘোরে-থাকা কিছু শব্দ। "ওহ্ মা... আমার মা... আমার সুন্দরী মা... বড্ড ভালোবাসি তোমায়..."
ও হাঁপাতে হাঁপাতে মেসেজের পরের অংশটা পড়তে লাগল:
**ইন্দিরা:** "তোর কি এখন একটু ভালো লাগছে, সোনা? আমার মিষ্টি বাবুটা... মা যখন তোর কাছেই আছে, তখন তুই কী করে এত কষ্ট পাস বল তো... মা তো আছেই..."
রাহুলের হাতের মুঠো আরও শক্ত, আরও দ্রুত হয়ে উঠল। "হ্যাঁ মা... আমার বড্ড ভালো লাগছে... খুব খুব ভালো লাগছে... শুধু তোমার জন্য মা... আমার মা... আহ্..." ওর গলা দিয়ে এখন কেবলই কিছু অবাধ্য, স্যাঁতসেঁতে গোঙানি বেরিয়ে আসছিল।
**ইন্দিরা:** "সোনা, আর মাত্র দুটো সপ্তাহ... দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তারপরই তুই বাড়ি ফিরে আসবি... তোর মায়ের কাছে ফিরে আসবি। মা তোর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে সোনা। তুই বাড়ি ফিরলে, আমি তোকে আগের সব বারের চেয়ে আরও অনেক বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরব... আমি তোকে এমনভাবে আদর করব, এমনভাবে চুমু খাব যা তুই আগে কোনোদিন পাসনি। সেদিন তুই যেভাবে মায়ের ঘাড়ে আর গলায় তোর জিভ দিয়ে আদর করছিলি... তুই ফিরে এলে আবার ওভাবেই করবি সোনা, যতক্ষণ তোর মন চায়। মা তোকে একটুও বাধা দেবে না। আর মায়ের ওই তিলটা... মা তো জানে মায়ের বাবুসোনা ওই ছোট তিলটা কত ভালোবাসে। তুই ওটাতেও তোর ঠোঁট ছোঁয়াবি, জিভ দিয়ে চাটবি, যেভাবে খুশি আদর করবি। মায়ের বগলের ওই যে গন্ধটা তোকে পাগল করে, ওই যে ছোট ছোট চুলগুলোতে মুখ গুঁজে তুই চুমু খেতে ভালোবাসিস... তুই ফিরে আয় সোনা, মা তোর জন্য ওগুলো আর শেভ করবে না কথা দিয়েছে না? তুই ওখানে যত খুশি মুখ ঘষবি, নাক ঘষবি, চুমু খাবি, চাটতে ইচ্ছে করলে চাটবি... আর সেদিনের মতো যদি দু-একটা চুল তোর মুখে চলেও যায়, তুই একদম চিন্তা করবি না, মা নিজের হাতে তোর মুখ থেকে সেগুলো বের করে দেবে। ওসব তো শুধু তোর জন্যই রে... আর... সোনা... তোর যখনই দরকার হবে... আমি তোকে... তোকে খাওয়াব... মায়ের ঠিক ওইখান থেকে... যেটা তুই এখন ছবিতে দেখছিস..."
মায়ের এই কথাগুলো—অক্ষরের পর অক্ষরে বোনা এক আদিম, সর্বগ্রাসী সমর্পণের প্রতিশ্রুতি—যখন স্ক্রিনে ভাসতে থাকা সেই মোহময়, অনাবৃত দৃশ্যপটের সাথে মিশে গেল, রাহুলের অবচেতন মন আর শরীরের মাঝের শেষ বাঁধটুকুও নিমিষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ওর চোখের তারায় তখন এক ঘোরলাগা, উন্মত্ত নেশা। নিশ্বাসের শব্দগুলো ততক্ষণে এক রুদ্ধশ্বাস, ভারী গোঙানিতে পরিণত হয়েছে।
নিচে নেমে যাওয়া ট্র্যাকপ্যান্টের বাঁধন থেকে আগেই মুক্ত হওয়া ওর উন্মুক্ত, ঘর্মাক্ত তলপেট আর নিম্নাঙ্গ এক অপ্রতিরোধ্য, চূড়ান্ত স্পন্দনে টানটান হয়ে গেল। হাতের মুঠোটার শেষ, মরিয়া ওঠানামার সাথে সাথে ওর পুরো শরীরটা শূন্যে একটা ধনুকের মতো প্রবলভাবে বেঁকে এল। মগজের কোষে কোষে আছড়ে পড়া সেই অবর্ণনীয় আবেগের জলোচ্ছ্বাসকে ও আর এক মুহূর্তের জন্যও আটকে রাখতে পারল না।
"আআআহহহহ মাআআআআআআ!!!!"
হস্টেলের ওই ফাঁকা, নিস্তব্ধ ঘরে ওর গলা চিরে একটা বন্য আর্তনাদ বেরিয়ে এল। আর তার সাথেই ওর শরীর থেকে এক উষ্ণ, ঘন, তপ্ত স্রোত প্রবল বেগে ছিটকে বেরিয়ে এসে আছড়ে পড়ল ওর নিজেরই পেটের ওপর, ওর হাতের আঙুলগুলোর ফাঁকে। একটা নিবিড়, অন্ধকারী তৃপ্তি আর তারপর ধেয়ে আসা এক চূড়ান্ত ক্লান্তির ঝলকানি ওর সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিল।
কয়েক মিনিট পর।
রাহুলের বুকটা তখন হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। ও কোনোমতে, ওই ঝাপসা, অশ্রুসজল চোখদুটো দিয়ে মেসেজের একদম শেষ লাইনগুলো পড়ল:
ইন্দিরা: "আর তো মোটে দুটো সপ্তাহ, সোনা। প্লিজ নিজের খেয়াল রাখিস। মন দিয়ে পড়াশোনা করিস, একদম ফোকাস হারাবি না। মায়ের ভালোবাসা আর আশীর্বাদ সবসময় তোর সাথে আছে।"