আলোকিত শহরের অন্ধকারে - অধ্যায় ১২
পর্ব-১২
আচ্ছা চন্দ্রিমা, আপনার মা আপনাকে ফোন না করে হঠাথ একা বেরোতে গেলো কেনো? না মানে তিনি তো একা এতো রাতে আসতেও পারবেন না। " পলাশ চন্দ্রিমার দিকে তাকায়। খোলা জানালার পাশে বসা চন্দ্রিমার মুখে বিষন্নতা আর ভয়। ওর সুন্দর সিল্কি চুলগুলো হাওয়ায় উড়ে বার বার চোখ ঢেকে দিচ্ছে।
হাত দিয়ে সেগুলো সরিয়ে দেয় ও, পলাশের কথায় সেভাবে গুরুত্ব না দিয়ে বলে, " জানি না পলাশ দা..... এখন ওসব ভাবার সময় সেই, আমার টেনশন হচ্ছে।"
গাড়ি অনেকটাই এগিয়ে গেছে, পলাশ বলে, " না আমার মনে হচ্ছে আপনাকে বাড়িতে ডেকে আনার জন্য কেউ মিথ্যা ফোন করে নি তো? "
" আহহ.... আপনি বেশী ভাবেন, আমার মায়ের নাম্বার থেকে কে মিথ্যা ফোন করবে? "
পলাশ বুঝতে পারলেও নিষেধ করতে পারছে না, কারণ কলটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে পরে চন্দ্রিমা ওকে দোষারোপ করবে। কিন্তু ওর মন বলছে কিছু একটা গোলমাল নিশ্চই আছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। ও চিন্তিত মুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। শুনশান রাস্তায় প্রায় ঝড়ের বেগে ওরা পৌছে যায় চন্দ্রিমার বাপের বাড়ির কাছে। মেন রাস্তা থেকে একটা ৯০° এঙ্গেলে সরু রাস্তা ঢুকে গেছে। ঠিক সেই রাস্তায় ঢোকার মুখে একটা বাইক এমন ভাবে দাঁড় করানো যে ঢোকা যাবে না। ড্রাইভার বেশ কয়েকবার হর্ন দেয়। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।
পলাশ নেমে আসে। বাইকে হাত দিয়েই বোঝে হ্যান্ডেল লক করা। সরানো যাবে না। ও এদিক ওদিক তাকাতেই দেখে দুজন কনস্টেবল হেঁটে আসছে। হাতে লাঠি। বেশ দশাশই চেহারা দুজনেরই। ওরা কাছে আসতেই পলাশ বলে,
" গাড়িটা আপনাদের স্যার? "
একজন কন্সটেবল গুঠখা চেবাচ্ছিলো। পাশে থুথু ফেলে বলে, " হ্যাঁ... কেনো? আপনি কে? "
" আমরা এই রাস্তায় ঢুকবো, একজনের মা অসুস্থ। উনি বাড়িতে যাবেন। " পলাশ বলে।
কন্সটেবল গাড়ির কাছে এসে ভিতরে উঁকি মারে। চন্দ্রিমা অস্থির ভাবে তাকিয়ে আছে। কনস্টেবল আবার থুতু ফেলে ওকে বলে, " কার মা অসুস্থ? ম্যাডামের নাকি? "
পলাশের রাগ হয় এবার। ও গলা তুলে বলে, " যারই হোক, আপনারা রাস্তার মাঝে এভাবে গাড়ি রাখবেন কেনো? সরান। "
এবার কন্সটেবল ঝট করে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়, চোখে রাগ, " সরাবো না..... কি করবি? "
" দেখুন ভদ্রভাবে গাড়ি সরান, " পলাশ ঠান্ডা মাথায় থেমে থেমে বলে।
" এই, চুপ কর.... অসুস্থ? শালা গাঁড়পাকামো হচ্ছে? বোকাচোদা রাতের বেলায় মাগী নিয়ে ফুর্তি করে ফিরছে আবার চোখ রাঙাচ্ছে? " কনস্টেবল প্রায় তেড়ে আসে ওর দিকে।
আর একজন কন্সটেবল গাড়ির ভিতরে মুখ বাড়িয়ে চন্দ্রিমাকে বলে, " নামুন গাড়ি থেকে..... "
চন্দ্রিমা ভয় পেয়ে গেছে কনস্টেবল দুজনের এই আচরণে, ও গাড়ি থেকে নেমে বলে, " দেখুন, সত্যি আমার মা অসুস্থ। "
দ্বিতীয় কন্সটেবল অশ্লীল ভাবে চন্দ্রিমার বুক থেকে পেট হয়ে জ্জানুসন্ধি পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে ওর স্বল্প দৃশ্যমান ক্লিভেজের দিকেই চোখ রেখে মুখে বাঁকা হাসি এনে বলে, " সাথে এটা কে? বর না নাগর? "
চন্দ্রিমার গা জ্বলে যায়, ও হাতের ব্যাগ মাটিতে ঠাস করে ফেলে বলে, " মাঝরাতে একজন ভদ্র মহিলাকে এভাবে হ্যারাস করছেন? আমি কিন্তু আপনাদের আগেইন্সট এ কমপ্লেন জানাবো।"
কন্সটেবল যেনো খুব মজার কথা শুনেছে এমন ভাবে হেসে বলে, " শালা আজকাল রেন্ডি মাগীরাও সতী গিরি দেখাচ্ছে.... কি দিনকাল এলো রে মাইরী। "
পলাশের আর সহ্য হয় না, ও সোজা এসে কন্সটেবলের গালে সটান এক চড় কষায়। চড় মেরে থমকে যায়। ও যেএভাবে পুলিশের গায়ে হাত দিতে পারে সেটা ও নিজেই জানতো না। কন্সটেবল চড় খেয়ে একেবারে পাথরের মূর্তি হয়ে যায়। এমন কেউ করতে পারে এটা হয়তো ওরও জানা ছিলো না। ঘটনার আকস্মিকতায় ও ভাষাহীন হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর চোখ লাল করে তেড়ে আসে পলাশের দিকে, এমনিতে চেহারায় ও পলাশের থেকে উঁচু লম্বা। পলাশের এক হাত মুচড়ে ধরে ওর পেটে কয়েকটা সজোরে ঘুঁষি মারে। পলাশের মনে হলো ও চোখে অন্ধকার দেখছে, পেটে অসহ্য যন্ত্রনায় ওর মুখ বিকৃত হয়ে ওঠে। ও পেট চেপে সেখানেই বসে পড়ে।
চন্দ্রিমা রুখে উঠে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তার আগেই আগের কন্সটেবল হাত তুলে ওকে থামায়, " এই শ্যামা, এখানে কি মারামারি করতে এসেছিস? যাহ চুপচাপ দাঁড়া ..... নইলে মেরে গাল লাল করে দেবো.... "তারপর চন্দ্রিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
" আপনার ব্যাগ নিয়ে আসুন... আমি ছেড়ে দিচ্ছি। "
" কেনো? ওর সাথে গাড়ি থাকতে আপনাদের সাথে কেনো যাবে? "পলাশ যন্ত্রনাকাতর মুখ তুলে বলে।
" কারন এই গাড়ি এখন থানায় যাবে, এতো রাতে কি বেআইনি কাজ হচ্ছে তার পরীক্ষা হবে.....সাথে তোরা দুজনও.....আর অনডিউটি পুলিশের গায়ে হাত তোলার আলাদা চার্জ লাগবে। "
তারপর আর এক কস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বলে," শ্যামা... তুই ওনাকে নিয়ে যা, আমি এদের গাড়ি নিয়ে থানায় যাচ্ছি। "
" দাড়ান.... আমরা কোন আইন ভাঙি নি, আর আমাদের গাড়িতে কোন বেআইনি জিনিসও নেই, তাহলে কেনো যাবো থানায়? " পলাশ চিৎকার করে।
প্রথম কন্সটেবল ওদের গাড়িতে একটা চাপড় দিয়ে বলে, " সেটা থানায় গেলেই বুঝতে পারবে.... কথা না বলে চুপচাপ চলো, না হলে ভালো হবে না। "
চন্দ্রিমা ব্যাগ হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ও কিছুই বুঝতে পারছে না। শ্যামা নামক কস্টেবল যেএতোক্ষণ বাজে কথা বলছিলো সে বলে, " আপনি আমার বাইকে আসুন, আমি ছেড়ে দেবো। "
চন্দ্রিমা বলে, " না আমি এই গাড়ির সাথেই থানায় যাবো, আপনারা বিনা দোষে এদের এভাবে থানায় নিতে পারেন না..... আমার মার কিছু হলেও তার দায় আপনাদের। "
চন্দ্রিমা পলাশের কাছে এসে ওর হাত ধরে, " আপনি ঠিক আছেন? "
পলাশের যন্ত্রনা একটু কমেছে, ও ঘাড় নাড়ে, ঠিক আছে।
চন্দ্রিমার হাত ধরে ও উঠে দাঁড়ায়, " দেখুন আমাদের গাড়ি আর আমরা একসাথেই যাবো, কেউ আলাদা যাবে না...... "
কস্টেবল দুজন পরস্পর মুখ চাওয়া চায়ি করে, তারপর বলে, " ঠিক আছে, আপনারা পিছনে বসুন, গাড়ি আমি চালিয়ে নিয়ে যাব।"
পলাশ দেখে এরা কোন প্লান এ আছে। যেকোন ভাবে ওদের কোথাও নিয়ে যাবেই। কেনো সেটা বোঝা যাচ্ছে না। চন্দ্রিমাই কি ওদের উদ্দেশ্য? পলাশ বুঝতে পারছে যে কোন বিপদ আসছে কিন্তু কিভাবে সামলাবে বুঝতে পারছে না। এই রাস্তাটা একেবারেই শুনশান। এতোক্ষনে একটাও গাড়ি আসে নি। আর আসলেও পুলিশ দেখে কেউ গাড়ি দাঁড়াবে না। আশে পাশে দুই একটা বাড়ি থাকলেও সেগুলোতে লোক আছে কিনা সন্দেহ। আর এইসব জায়গার লোক কারো বিপদে বেরোয় না।
হঠাথ একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যায়। ওদের ওঠার আগেই গাড়িটা ওদের পাশে এসে ব্রেক করে। পলাশ দেখে এটাও একটা পুলিশের গাড়ি। গাড়ির থেকে তরুন এক পুলিশ এস আই মুখ বাড়ায়, চন্দ্রিমার দিকে তাকিয়ে বলে, " আরে আপনি? এখানে? স্টেশনে যান নি? "
চন্দ্রিমা থতমত খেয়ে যায়। ঢোক গিলে বলে, " মানে..... "
উনি নেমে আসেন গাড়ি থেকে, " কি ব্যাপার বলুন তো? "
পলাশ এবার বলে, " আসলে ওনার মা এখানে ওনার বাড়িতে আছেন, আমরা যাচ্ছিলাম কিন্তু এরা আমাদের যেতে না দিয়ে থানায় উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। "
পলাশ দেখে কন্সটেবল দুজন একেবারে সুবোধ বালকের মত দাঁড়িয়ে আছে। যেনো কিছুই করে নি এতোক্ষণ।
" দাঁড়ান.....ওনার মা এখানে আছেন মানে? আমি তো ওনাকে ওনার মায়ের কাছেই নামিয়ে দিয়ে আসলাম.... কি তাই তো? " ইন্সপেকটার চন্দ্রিমার দিকে তাকায় বিস্ময়ভরে।
" আসলে স্যার, একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে, আমি পরে আপনাকে সব বুঝিয়ে বলছি...... আপাতত আমাদের ছাড়ুন। "
কন্সটেবল দুজন যেনো ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না, এভাবে দাঁড়িয়েছিলো। উনি ওদের দিকে তাকিয়ে বলেন, " কি ব্যাপার বলো তো? এরা কি করেছে? "
গুঠখাখোর কন্সটেবল আমতা আমতা করে বলে, " আসলে স্যার আমাদের কাছে নির্দেশ আছে এদের থানায় নিয়ে যাওয়ার। "
" কে বলেছে? "
" দত্ত স্যার... "
" এ এস আই..... সুদীপ দত্ত? কেনো? "
" জানি না স্যার। "
চন্দ্রিমা অবাক হয় যায়, " একী... আপনারা এতোক্ষণ তো একথা বলেন নি? শুধু শুধু অসভ্যতামী করে যাচ্ছেন.....উদ্দেশ্য কি আপনাদের? "
অফিসার ইশারায় চন্দ্রিমাকে থামতে বলে, তারপর নিজের ফোন বের করে একটা ফোন করেন, ওপাশে সম্ভবত এস আই দত্ত, উনি বলেন, " হ্যাঁ দত্তবাবু আপনি এক ভদ্রমহিলাকে তুলে আনতে দুজনকে পাঠিয়েছেন? "
ওপাশ থেকে কি বলছে বোঝা যাচ্ছে না। অফিসার কিছু হ্যাঁ হুঁ করে তারপর বলে, " আচ্ছা আপনি ম্যানেজ করে নিন..... আমাকে জানাবেন। "তারপর কন্সটেবল দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে,
" আচ্ছা তোমরা যাও, আমি দেখে নিচ্ছি.... "
" কিন্তু স্যার, না নিয়ে গেলে দত্ত স্যার রাগারাগি করবে। "
" আহহ..... বললাম তো যাও, কিছু বললে আমার কথা বলে দেবে... যাও। " ইনস্পেকটার ধমক দেয় ওদের। দুই কন্সটেবল সুরসুর করে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায়।
" আচ্ছা আপনারা গাড়িতে উঠুন..... আমি আপনাদের পিছনে আসছি। " ইন্সপেকটার নিজেও গাড়িতে উঠে বসেন।
পলাশ ড্রাইভার ছেলেটাকে ইশারা করলে ও গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চন্দ্রিমার বাপের বাড়ি পৌছে যায় ওরা। চন্দ্রিমা বেল বাজাতেই ওর মা এসে দরজা খুলে দেন। শীর্ণকায় বয়িষ্ক মহিলা। দেখেই বোঝা যায় অসুখে ভুগছেন। এক সাথে এতো লোক দেখে অবাক হন। তারপর নিজের মেয়েকে দেখে বলেন,
" কি ব্যাপার রে রিমা? একটু আগে দুটো পুলিশের লোক এসে আমার ফোন নিয়ে গেলো..... বললো মাসিমা আপনার ফোনটা একটু দেন আমরা একটা ফোন করেই দিয়ে যাচ্ছি, আমি তো দিচ্ছিলাম না..... কিন্তু পুলিশের লোক দেখে শেষে দিয়ে দিলাম.... তা ওরা সেই যে গেলো আর পাত্তা নেই, চোর মনে হয়। "
মা সুস্থ আছে দেখে চন্দ্রিমা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তার মানে ফোনটা পুরোটাই নাটক। কে করছে? ওর শাশুড়ি আর মেসো শ্বশুর? ওরা ওকে ধরতে চায়? আটকাতে চায়? যাতে ওদের কেচ্ছা বাইরে না যায়?
" তোর সাথে এতো লোক কেনো রে? আবার পুলিশও আছে? " ওর মা ভয় পেয়েছেন বোঝাই যাচ্ছে। চন্দ্রিমা ওদের দাঁড়াতে বলে মাকে নিয়ে ঘরে ঢোকে, পলাশ আর ইন্সপেকটার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে চন্দ্রিমা আর আওর মায়ের কি কথাবার্তা হচ্ছে বোঝার উপায় নেই। ইন্সপেকটার পলাশকে কি সন্দেহের চোখে দেখছেন? উনি গাড়িতে হেলান দিয়ে সিগারেট টানতে টানতে পলাশের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
পলাশের চরম অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে ও চোর বা ডাকাত। তার উপরে ওর সামনে কেউ সিগারেট টানলে ওরও নেশা চাগার দিয়ে ওঠে। কিন্তু এখন সিগারেট ধরাতেও সাহস হছে না। ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে।
চন্দ্রিমাদের বাড়িটা খুবই ছিমছাম। একতলা বাড়ি। অনেক পুরানো বোঝাই যাচ্ছে। গায়ের হলুদ রঙ চটে গেছে। রাতের আলোতে আরো মলিন লাগছে। চন্দ্রিমা একবারেই ছা পোষা ঘরের মেয়ে, অথচ ওর শ্বশুর বাড়ি বিশাল বড়লোক।
প্রায় মিনিট দশেক পর চন্দ্রিমা বেরিয়ে আসে। ওর মুখে সামান্য স্বস্তির চিহ্ন। পলাশ উৎসুক মুখে তাকালেও ও এগিয়ে যায় ইন্সপেকটারের দিকে....
ইন্সপেকটার ফোন ঘাঁটছিলেন সিগারেট শেষ করে। সেটা পকেটে ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান,
"বলুন ম্যাডাম, সমস্যা মিটলো? " ওর মুখে মৃদু হাসি।
চন্দ্রিমা হাসির কারণ না বুঝে বলে, " মাকে বোকা বানিয়ে ওরা ফোন নিয়ে আমাকে কল করেছিলো, আমি মাকে আপাতত বুঝিয়ে এলাম। "
ইন্সপেকটার হাসি বজায় রেখেই বলেন, " কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর এখনো পাই নি... "
" মানে? " চন্দ্রিমা হচকিয়ে যায়।
" মানে আপনার মাকে নিয়ে হায়দ্রাবাদ যাওয়ার কথা.... অথচ আপনার মা এখানে, এর উত্তর.... "
চন্দ্রিমা মাথা নীচু করে অপরাধীর গলায় বলে, " আসলে তখন আমি মিথ্যা বলেছিলাম, আমি একটা বিপদে পড়েই বাড়ি ছাড়ি....... বলতে পারেন.... "
" আচ্ছা আপনার কথা আমি শুনছি, তার আগে বলুন তো দেবী সুধাময়ী কলেজের ২০১৬ র ব্যাচ তো আপনি? "
চন্দ্রিমা অবাক হয়ে তাকায়, " আপনি কিভাবে জানলেন? "
ইন্সপেকটার হা হা করে হাসেন, " আসলে আগেই আমার সন্দেহ হয়েছিলো, এখন ফেসবুকে ঘেঁটে শিওর হলাম... "
" মানে আমাদের আগে দেখা হয়েছে? "চন্দ্রিমা অবাক হয়।
ইন্সপেকটার কাঁধ নাচান, " হ্যাঁ অনেকবার..... আপনার হয়তো মনেও নেই কিন্তু আমার মনে আছে। "
" আপনি কি ২০১৬ র ব্যাচ ছিলেন? " চন্দ্রিমার দুই চোখে কৌতুহল।
" না না..... আমার সেবার ফাইনাল ইয়ার, নবীন বরনে স্টেজে উঠতে গিয়ে পা হড়কে পড়ে গিয়ে থুতনি কেটে ফেলেন আপনি..... ছাত্র সংসদের থেকে একজন আপনাকে নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে.... কি মনে পড়ছে? " ইন্সপেকটারের চোখে কৌতুক।
" আরে..... হ্যাঁ হ্যাঁ.... থার্ড ইয়ারের কেউ ছিলো, নামটা...... মনে পড়ছে না..... " চন্দ্রিমা এতো সব বিপদ ভুলে পুরানো স্মৃতি নিয়ে মেতে উঠেছে।
" স্বপ্নীল ঘোষ..... সেই ছাত্র আমিই ছিলাম। "
চন্দ্রিমা হাসে, " এ মা..... আমি একেবারে ভুলে গেছি আপনার মুখ, এবার মনে পড়ছে। "
" আমি কিন্তু তখনি এক বারে চিনে গেছিলাম..... শুধু মেলানোটা বাকি ছিলো। দশ বছর তো কম না.... "
পলাশ দূরে দাঁড়িয়ে ওদের কথপকথন শুনছিলো। ওর মনে হলো স্বপ্নীল চন্দ্রিমার প্রেমে পড়েছিলো। কিন্তু কোনদিন বলতে পারে নি। না হলে এমনি এমনি এতো দিন কেউ কাউকে মনে রাখে না। স্বপ্নিলের চেহারা বেশ ভালো। লম্বা ফর্সা হ্যান্ডসাম চেহারা। প্রপোস করলে হয়তো চন্দ্রিমা না করতো না। তাহলে আজ দুজন স্বামী স্ত্রী হতো.......।
স্বপ্নীল হাসে , " আচ্ছা.... চন্দ্রিমা তোমার সব কথা শুনব, তার আগে কোথাও গিয়ে বসা যাক..... কেমন? "
চন্দ্রিমা মাথা নেড়ে সাঁয় দেয়। স্বপ্নীল পলাশের দিকে তাকিয়ে বলে, " দাদা আপনি ওই গাড়িতে আসুন আর চন্দ্রিমা আপনি আমার সাথে আমার গাড়িতে আসুন। "
পলাশের গা জ্বলে যায়। এতোক্ষণ ওই একমাত্র শুভাকাঙ্খি ছিলো চন্দ্রিমার.... এবার উদয় হলো এক হ্যান্ডসাম পুলিশ অফিসারের। এসেই পুরানো বান্ধবীকে কাছে টানার চেষ্টা। বাধ্য হয়ে পলাশ ওর গাড়িতে বসে। সামনে স্বপ্নীল আর চন্দ্রিমার গাড়ি আর পিছনে পলাশ ওর গাড়িতে। গাড়ি ধীর গতিতে এদিক ওদিক ঘুরে আধঘন্টা পর হাইরোডের ধারে একটা ধাবায় দাঁড়ায়।
গাড়ি থেকে নেমে স্বপ্নীল ওকে ইশারা করে বেরিয়ে আসতে। চন্দ্রিমা কিছু বলে না। বাইরে একটা রাউন্ড টেবিলের চারিদিকে চারটে চেয়ার পাতা। ওরা সেখানেই বসে। পলাশের মনে হয়, চন্দ্রিমা ওর বিপদে উপযুক্ত সাহায্যকারী পেয়ে গেছে, এখন আর পলাশের থাকার দরকার নেই। ও গাড়ি থেকে নেমে দরজা বন্ধ করে বলে, " চন্দ্রিমা আপনি এখন তো নিরাপদ..... তাহলে আমি কি চলে যাব? "
চন্দ্রিমা স্বপ্নীলের দিকে একবার তাকিয়ে কিছু বলতে গেলে স্বপ্নীল বলে ওঠে, " আরে যাবেন যাবেন.... আসুন আগে এখানে, এক কাপ চা খেয়ে যান, রাতের ক্লান্তিটা একটু কাটিবে। "
চন্দ্রিমা কিছু বলে না। পলাশের মনে হয় ওকে আর দরকার নেই চন্দ্রিমার। শুধু শুধু কি পেটে ঘুঁষি খেলো? ধাবার ছেলেটা এসে তিনটে কাপে গরম চা দিয়ে যায়। হঠাৎ করে পলাশের মনে হচ্ছে এখানে ও অযাচিত। চন্দ্রিমার বিপদে কোন সাহায্য করার ক্ষমতা ওর নেই, সেখানে স্বপ্নীলের সাহায্য অনেক বেশী দরকার। চন্দ্রিমা যেনো এখন স্বপ্নীলের প্রতি অনেক বেশী নির্ভরশীল। পলাশের অস্তিত্ব যে আছে ওর পাশে সেটা কি ভুলে গেলো নাকি?
চায়ে চুমুক দিয়ে চন্দ্রিমা বলে, " তাহলে বলো, এমন শ্বশুর বাড়ির হাতে পড়লে আমাকে কি করবে ওরা? "
স্বপ্নীল ঠোঁট চেপে একটু ভাবে, তারপর বলে, " দেখো.... পুলিশের বড়োকর্তাদের আমি চিনি, এরা পারে না হেনো কাজ নেই....তবে সবাই তো খারাপ না, এই মূহুর্তে আমি ডি এস পি ধর এর এগেইন্সট এ কিছু করতে পারবো না.... তবে প্রমান যোগাড় করলে কাজ হবে, এমনিতেই ওর বিরুদ্ধে অনেক এলিগেশন আছে..... "
চন্দ্রিমা কাপটা ঠক করে নামিয়ে এক হাতের দুই আঙুলে নিজের কপাল টিপে ধরে বলে, " কিন্তু এখন আমি কোথায় যাবো স্বপ্নীলদা? পলাশ বাবু ভালো লোক বলে এক রাত আশ্রয় দিয়েছিলেন, রোজ তো আর দেবেন না..... মায়ের কাছেও থাকার উপায় নেই... "
পলাশ অবাক হয়ে তাকায়। চন্দ্রিমা একবার ওর কাছে আশ্রয় চাইতো, সারা বছরও আশ্রয় দিতে পারে ও..... নিজেই ঠিক করে নিলো যে পলাশ ওকে আর আশ্রয় দেবে না? একটা তীব্র অভিমান পলাশের গলার কাছে দানা বেঁধে ওঠে। একটু আগেও চন্দ্রিমার একমাত্র অবলম্বন ছিলো ও.... মাত্র একটা পরিচিত লোক পেয়ে ও ভুলে গেলো? আসলে ওই হয়তো সামান্য একটু আশ্রয় দিয়ে নিজেকে অনেক বেশী পরোপকারী ভাবতে শুরু করেছিলো। পলাশ যেটা করেছে, কোন দরদী অপরিচিত লোক হলেও করতো। ব্যাপারটা চন্দ্রিমার কাছে নিশ্চয় সেভাবে প্রভাব ফেলে নি।
পকেট থেকে সিগারেট বের করে পলাশ তাতে আগুন দেয়। সামনে বসা স্বপ্নীলকে অফার করার প্রয়োজন বোধ করে না.....
" দেখো, আমি এখানে একা থাকি, তোমাকে সেখানে রাখা যাবে না..... তবে আমি ব্যাবস্থা করে দেবো, চিন্তা করো না.... লেক গার্ডেন্স এ আমার এক বান্ধবী থাকে, ওর কাছে তুমি কদিন থাকতে পারো। " স্বপ্নীল বলে।
চন্দ্রিমা কিছু একটা ভাবছিলো। ও বলে " আচ্ছা আমি যদি ওদের বিরুদ্ধে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেস করি? "
স্বপ্নীল ঠোঁট ওল্টায়, " লাভ নেই.... প্রমান ছাড়া কেস দাঁড়াবে না.... তার থেকে আমাকে ভাবতে সময় দাও, ধর স্যারকে না চমকালে হবে না..... বুঝলে? ও পাকা মাথার লোক, ওসব কেস ফুৎকারে উড়য়ে দেবে। "
পলাশের আর বসে থাকতে ইচ্ছা করছে না। ও যেনো কোন তৃতীয় পক্ষ। ওর মতামত কেউ চাইছে না। ও উঠে দাঁড়ায়, " আচ্ছা আমি আসি তাহলে। "
চন্দ্রিমা মুখ তোলে, " অনেক অনেক ধন্যবাদ পলাশ দা..... বিপদে অনেক সাহায্য করেছেন, কোনদিন সময় হলে দেখা করবো আপনার সাথে। " পলাশের খারাপ লাগে, চন্দ্রিমা ওকে একটু ভরসা করতে পারতো। এমন ভাবে বললো যেনো পলাশের আর কিছু করার নেই। ও শুধু মুখে সামান্য হাসি আনে।
স্বপ্নীল হাত বাড়ায়, " মেনি মেনি থ্যাঙ্কস পলাশ বাবু..... আপনার নম্বরটা দিয়ে যান, দরকার হলে... "
পলাশ বিরস মুখে নাম্বারটা বলে গাড়িতে উঠে বসে। একবার ফিরে তাকায় চন্দ্রিমার দিকে। ও এখন স্বপ্নীলের সাথেই আলোচনায় মগ্ন। এদিকে ওর কোন নজর নেই। পলাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গাড়ি ওর বাড়ির দিকে রওনা দেয়। আজই ওই বাড়ি ছাড়ার কথা ওর। গিয়ে সব গুছিয়ে বেরোতে হবে। জানালা দিয়ে মুখ বের করে সকালের ঘুম ভাঙা শহরের ব্যাস্ততা দেখে ও। প্রতিটা দিন এখানে নতুন, আগের দিনের সব পেছনে ফেলে নতুন ভাবে এগিয়ে যাওয়ার দিকে ধাবিত সবাই।
পাড়ার মোড়ে এসে গাড়ি ছেড়ে দেয় ও। মুকুন্দের দোকান সবে খুলছে। ওকে দেখে মুকুন্দ অবাক হয়, " একি দাদা এতো সকাল সকাল কোথায় গেছিলে? কিছু হয়েছে নাকি? "
পলাশ মাথা নাড়ে, " না রে..... একটা সিগারেট দে তো। "
মুকুন্দ সিগারেট বের কর দেয়। পলাশ সেটা ধরিয়ে বলে, " আজই এখান থেকে চলে যাচ্ছি.... তোরা ভালো থাকিস। "
মুকুন্দর মুখ বিষন্ন হয়ে যায়, " চলে যাবে? এসো মাঝে মাঝে এদিকে আসলে।....... আর কি বলবো। "
পলাশ ওর কাঁধে চাপড় মেরে হাঁটতে হাঁটতে আসে ফ্লাটের কাছে। লিফট থেকে ফ্লোরে নামতেই সামনা সামনি দেখা শিউলির সাথে।
ওকে দেখেই শিউলি ঝঁপিয়ে পড়ে, " একি পলাশ, এতো সকাল সকাল কোথা থেকে আসছো তুমি? বাইরে গেছিলে নাকি চা টা খেতে? "
একে সব জানানোর প্রয়োজন নেই। পলাশ মুখে হাসি এনে ঘাড় নাড়ে।
" ইশ.... এতো খারাপ কেনো তুমি? একাবার আমার ওখানে যেতে পারতে..... কাল রাতে ডাকলাম তাও গেলে না। "
পলাশ হাসে, " না চা খাওয়াও হলো আবার সকাল সকাল বাইরেটা ঘুরেও এলাম। "
শিউলি একটা সাদা হ্যান্ডলুম শাড়ি পড়েছে। সাদার মধ্যে পিঙ্ক কালারের ডিজাইন। এই সকালেই স্নান করে পুজো সেরে ফেলেছে। কপালে চন্দনের ফোঁটা। একেবারে খারাপ দেখতে না শিউলি। চন্দ্রিমা বা সুমিত্রার মত না হলেও আলগা লাবণ্য আছে। মুখ দেখে বয়স বোঝা যায় না। অনেকটা কম মনে হয়। পলাশ একনজরে ওকে মেপে নেয়।
" কোথাও যাবেন আপনি? "
" না গো..... এই স্নেহার কাছে এসেছিলাম, একটু দরকারে। "
স্নেহা মানে পলাশের ফ্লোরে অপর ফ্লাটে থাকা স্নেহা শ্রীবাস্তব। অবাঙালি। পলাশদের সাথে বেশী পরিচয় নেই, ওই আসা যাওয়ার পথে একটু হাসি ছাড়া। মাত্র দেড় মাস হলো এখানে এসেছেন। পলাশ ফ্লাটে যেতে চায়, তাই বলে,
" তাহলে আসি আমি? পরে কথা হবে। "
" এমা যাবে মানে? ফ্রেশ হয়ে আমার ঘরে এসো... সকালের খাবার খেয়ে যাবে। " শিউলি চোখ পাকিয়ে বলে।
পলাশের একটুও ইচ্ছা নেই। কিন্তু রাতে একবার নিষেধ করেছে, এখন আবার....
" বৌদি..... পরে একসময়... "
শিউলি হাঁ হাঁ করে ওঠে, " আর পরে..... এরপর তো এখান থেকে চলেই যাবে..... আর কি আসবে? "
পলাশের বিরক্ত লাগছিলো। তবু সেটা লুকিয়ে ও ঠোঁটের কোণায় সামান্য হাসি এনে বলে, " অবশ্যই আসব.....এই ফ্লাট ছেড়ে যাচ্ছি... দেশ ছেড়ে তো আর না। "
শিউলি বিরস মুখে বলে, "যাও.... আর কি বলবো? ভাবলাম তোমার সাথে আড্ডা দিতে দিতে সকালটা কাটাবো..... কপালটা খারাপ। "
শিউলি সিঁড়ির দিকে হাঁটা দেয়। ও বেরিয়ে যাওয়াতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পলাশ। সোজা ঘরে ঢোকে এসে। রাতের জামাকাপড় ছেড়ে একটা তোয়ালে কোমরে জড়িয়ে সোফায় ফেলে নিজের শরীর।
বাড়ি থেকে তেমন কিছুই নিয়ে বেরোয় না পলাশ। নিজের দরকারী কাগজপত্র আর দুই একটা টুকিটাকী জিনিস, তা ছাড়া ওই বিলাশবহূল ফ্লাটে ওর নিজের বলতে আর কিছুই নেই। কোন মায়াও নেই ওর এই বিশাল ফ্লাটের প্রতি। বরং এই ফ্লাট যেনো হাঁ করা দানবের মত এতো বছর ওকে গিলে খেয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে কোথাও একটা স্বস্তি বোধ হচ্ছে ওর। এখন প্রথম কাজ বিদিশার সাথে দেখা করে ওর ফ্লাটের চাবি দিয়ে দেওয়া আর ডিভোর্স পেপারে সই করে মুক্ত হওয়া।
বিদিশাকে না জানিয়েই ও চলে আসে ওর বুটিকে। গড়িয়ার কাছে একটা মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং এর গ্রাউন্ড ফ্লোর পুরোটাই বিদিশার বাবার। সেখানেই ওর বুটিক। যদিও এর আগে মাত্র এক বারই এসেছে। আর আসার দরকার পরে নি। বিদিশাও কোনদিন ওকে ডাকেনি এখানে।
কাঁচের ভারী দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই ঠান্ডা হাওয়ায় ঝাপ্টা লাগে। বেশ ভালোই বড়ো। দুইজন সেলস গার্ল আছে। যার মধ্যে একজনকে পলাশ চেনে। সুপর্ণা। এর আগে মাঝে সাজে ওদের ফ্লাটে এসেছে কাজে। রোগা পাতলা শ্যামলা বর্ণের মেয়েটার কথা বার্তা বেশ ভালো। সুপর্ণা এক কাস্টমারকে ড্রেস দেখাচ্ছিলো, হঠাৎ পলাশ সেখানে ঢুকতেই ও একটু অবাক হয়ে যায়। আসলে পলাশ তো এভাবে কোনদিন আসে না। ও অপর মেয়েটার কাছে কাস্টমারকে ছেড়ে এগিয়ে আসে।
" আরে স্যার আপনি? " হাসিমুখে বলে।
পলাশ স্মিত হেসে বলে, " এই এলাম.... তোমাদের ম্যাডাম আছে তো ভিতরে? "
হঠাৎ সুপর্ণার মুখ কালো হয়ে যায়। ও পিছনে তাকিয়ে আমতা আমতা করে, " হ্যাঁ.... মানে না.... মানে ম্যাডাম ব্যাস্ত... "
পলাশ এগিয়ে যায় ভিতরের দিকে, " ঠিক আছে তুমি কাজ করো..... আমি দেখা করে নিচ্ছি। "
সুপর্ণা দৌড়ে আসে ওর পাশে, " আপনি এখানে বসুন না স্যার.... আমি ম্যাডামকে ডেকে দিচ্ছি। "
পলাশা পাত্তা দেয় না," আরে থাক.... আমি নিজেই যাই, তুমি কাজ করো। "
সুপর্ণাকে পাশ কাটিয়ে বুটিকের পিছন দিকে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে। এদিকে পুরো এলাহী ব্যাবস্থা। দুটো বড়ো বড়ো রুম আছে। দুটোই দরজা বন্ধ। পলাশ একটা রুমের দরজা ঠেলে..... এখনো বিদিশা আইনত ওর বৌ, তাই নক করার প্রয়োজন বোধ করে না। কাজের ফাঁকে বিদিশা সারাদিন এখানেই থাকে। এটা আগেই জানা ছিলো।
কিন্তু দরজা খুলতেই ওর চোখে ধাঁধা লেগে যায়। তীব্র কটূ ধোঁয়া আর মদের উগ্র গন্ধ। ধোঁয়া আর হালকা নীল আলোর সংমিশ্রনে এক অন্য জগত তৈরী হয়েছে। ঘরের মধ্যে সাউন্ড সিস্টেম চলছে, সাউন্ডপ্রুফ ঘর থেকে বাইরে কোন শব্দ পায় নি, দরজা খুলতেই জোরালো সাউন্ড কানে বাড়ি খায়। দুইপাশে লম্বা সোফা সেট, মাঝে একটা কাঁচের টেবিলে ছড়িয়ে আছে মদের বোতল এশ ট্রে আর খাবারের প্লেট...... সব থেকে বড়ো কথা ওই ঘরে পাঁচ জন নারী পুরুষ। দুজন পুরুষ আর তিনজন মেয়ে।পুরুষ দুজনকে পলাশ এর আগেই দেখেছে বিদিশার বাপের বাড়ির পার্টিতে। বিদিশা ওদের সাথে কথা বলছিলো
পলাশ হতবাক হয়ে যায় ওদের অবস্থা দেখে। ছেলেদুটোর খালি গা আর বক্সার পরা..... তিনটে মেয়ের একজন অবশ্যই বিদিশা.... একটা বীয়ারের বোতল নিয়ে একটা ছেলের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। ওর উর্ধাঙ্গে একটা সরু অন্তর্বাস ..... নীচে একটা সাদা স্কার্ট পরা । ছেলেটা এক হাতে সিগারেট টানছে আর এক হাত বিদিশার স্তনে.... ওর ব্রা এর উপর দিয়ে স্তনে হাত বোলাচ্ছে । বিদিশা সুস্থ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
আর দুটো মেয়ের একজন অর্ধ উলঙ্গ হয়ে অপর ছেলেটার গায়ে হামলে পড়েছে। ছেলেটার ঠোঁট কামড়ে ধরে ওর বক্সারে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে..... মেয়েটাকে আগে কোথাও দেখেছে কিনা মনে করতে পারলো না পলাশ.....
তৃতীয় মেয়েটা ঢুলু ঢুলু চোখে বসে গ্লাসে মদ ঢালছে... ওরও শুধু মাত্র একটা হট প্যান্ট ছাড়া শরীরে আর কিছু নেই। এই মেয়েটা বেশ রোগা। স্তন গুলো বেশ ছোট। খালি গায়ে দুটো ক্যাম্বিস বলের আকারের স্তন।
ওর আগে পলাশ এমন গ্রুপ সেক্স এর পর্ন দেখেছে বা লোকের মুখে শুনেছে কিন্তু নিজের চোখে দেখে নি। ঘটনার আকস্মিকতায় পলাশ কিছুক্ষণ বাক্যহারা হয়ে যায়। বিদিশার সাথে ওর সম্পর্ক ভালো না, ওর চোখে বিদিশা দেমাকী বড়লোকের স্বৈরাচারী মেয়ে, কিন্তু ও যে এতোটা নীচে নেমে গেছে সেটা পলাশ স্বপ্নেও ভাবে নি। ও শুধু ভাবছে কিভাবে ওর সাথে বিদিশার মত মেয়ের বিয়ে হলো.....
পলাশ ঘুরে বেরোতে যাবে এমন সময় বিদিশা ঘুরে তাকায় ওর দিকে। ধোঁয়ার মধ্যে আর নেশার ঘোরে প্রথমে ওকে চিনতে পারে না। ভ্রু কুঁচকে তাকায়। যেনো চিনতে চেষ্টা করে....... চিনতে পেরেই ওর মুখের ভাব পালটিয়ে যায়। নেশার মধ্যেও ছেলেটার কোল থেকে উঠে বসে..... এদিক ওদিক দেখে নিজের ব্রা টে টেনে নিয়ে বুক ঠিক করে।
" এ এ কী তুমি এখানে? " প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে বিদিশা। গলা জড়ানো.....
ওর গলার আওয়াযে বাকিরাও থেমে যায়। কিছুক্ষণের জন্য সব কটা চোখ পলাশের দিকে.... পলাশ এতোটাই বিব্রত হয়ে পড়ে যে কি বলিবে সেটাও ভুলে যায়... ও চুপ ক্ক্রে দাঁড়িয়ে থাকে। বিদিশার সাথে সম্পর্ক একেবারেই শূন্যের খাতায়। তাই এখানে খারাপ লাগা বা কষ্টের কিছুই নেই, আছে শুধু একটা অবাক বিস্ময়...
বিদিশা ওই ভাবেই টলমলো পা নিয়ে এগিয়ে আসে, ওর চোখ লাল, চোখের ভাবে কোথাও রাগ নেই তবে একটা কৌতুক মেশানো আছে.....
বিদিশা যার কোলে শুয়েছিলো সেই ছেলেটা এবার জোরে বলে ওঠে, " হেই.... পিউ, ইস দিস ইওর ব্লাডি ইডিয়ট হাজবেন্ড? "
বিদিশা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে, বীয়ারের বোতল টা নিজের দুই স্তনের মাঝে রেখে বলে, "ইয়েস.... ডিয়ার..... "
ছেলেটা যেনো চিড়িয়াখানার কোন আজব জন্তুকে দেখেছে, এমন ভাবে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, " তোমার ওই বুঢঢা বাপ আজব চিজ জোগাড় করেছে তোমার জন্য..... "
বিদিশাও হেসে ওঠে, " ওফ..... শান্তনু, স্টপ ইট, বাবার দোষ নেই, আমিও ভেবেছিলাম এই চীজটাকে বিয়ে করে স্বাধীন ভাবে কাটানো যাবে...... আর একে বাবার এসিস্ট্যান্ট বানিয়ে কাজে লাগিয়ে দেবো। "
যে মেয়েটা এতোক্ষণ মদ ঢালিছিলো সে পেগ বানিয়ে এক চুমুকে সেটা শেষ করে বলে, " চুপ করো তুম সব.... ইতনা ভি বুরা নেহি, ফিগার তো আচ্ছা হ্যায়.... "
পলাশ অবাক হলো যে এদের কেউ ওর সামনে একটুও লজ্জা বোধ করছে না। কেউ নিজেকে ঢাকার প্রয়োজন টুকুও দেঝাচ্ছে না.....
শান্তনু জ্বলন্ত সিগারেট এশ ট্রে তে চেপে নিভিয়ে বলে, " হাঁ.... তো বোল উসে তুঝে জয়েন করে.... এয়সে ভি তেরা পার্টনার তো আয়া নেহি অভিতক..... "
মেয়েটা হেসে ওঠে, " নট ব্যাড আইডিয়া ইয়ার.... এইসে, রোহন কা লৌণ্ড ভি পুরানা হো গয়া.... হা হা হা..."
বিদিশা হঠাৎ বিয়ারের বোতলটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে। কাঁচের বোতল ভাঙার আওয়াজে চারদিক কেঁপে ওঠে। বিদিশা দাঁতে দাঁত চেপে বলে, " কি হলো..... এখানে কেনো এসেছো? "
পলাশ এতোক্ষণ একটাও কথা বলে নি, এবার পকেট থেকে চাবি বের করে বিদিশার হাতে ধরিয়ে দেয়, " তোমার চাবি.... আমি ফ্লাট ছেড়ে দিয়েছি। "
বিদিশা চাবিটা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে বলে, " নাউ, গেট আউট..... আরনা বলে কোনদিন আমার এখানে আসবে না....... যাও। "
পলাশকে এক ধাক্কায় দরজার বাইরে বের করে দিয়ে ও সজোরে দরজা বন্ধ করে দেয়। পলাশ অবাক হয়ে কিছুখন বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে..।