আলোকিত শহরের অন্ধকারে - অধ্যায় ১৮
পর্ব-১৭
ঘুম থেকে জেগে এতোটাই মাথা গুলিয়েছিলো পলাশের যে নিজের পোষাকের দিকে একেবারেই খেয়াল করে নি ও। খেয়াল হলো বাথরুমে গিয়ে পোষাক ছাড়ার সময়। ওর জামা প্যান্ট, এমনকি জাঙ্গিয়াও নেই.... পরিবর্তে একটা সাদা পাজামা আর হালকা নীল কলারলেস টি শার্ট পরা। তার মানে কেউ ওর পোষাক খুলে এগুলো পরিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ লজ্জা লাগলো পলাশের। কে ওর পোষাক খুললো? চন্দ্রিমা? নাকি সুমেধা?
যেই হোক, একটা মেয়ে নিজের হাতে ওকে নগ্ন করেছে। এটা অত্যন্ত লজ্জার.....
যাই হোক এখন আর লজ্জা পেয়ে লাভ নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। পলাশ ফ্রেশ হয়ে আবার পোষাক পরে বাইরে আসে।
বাইরে বেরিয়ে দেখে চন্দ্রিমা কফি বানাচ্ছে আর সুমেধা একটা চেয়ারে পা তুলে অপর চেয়ারে বসে আছে। হাতের আঙুলে সিগারেট ধরা। পলাশের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সুমেধাই কি ওকে রাতে পোষাক পাল্টিয়েছে? পলাশের ওর দিকে তাকাতেই সংকোচ হয়। ও একটু পাশের দিকে এসে বসে।
সুমেধা বলে, " এই যে মি. হিরো.... এবার ঝেড়ে কাশুন তো দেখি..... মানে এখানে এসে ঘুরঘুর কেন করছিলেন? "
পলাশ চন্দ্রিমার দিকে তাকায়। ওর চোখেও একই প্রশ্ন। শুধু নীরবে। চন্দ্রিমা একটা প্লেট এ টোষ্ট আর ওমলেট দিয়ে বলে, " এখানে বসুন..... খেতে খেতেই সব বলুন। "
পলাশ কিভাবে বলবে? বলতে গেলেই তো ধরা পড়ে যাবে যে ও আগে থেকেই সুমিত্রাকে চেনে আর ওর সাথে পলাশের পরিচয় আছে। ও টোষ্টের টুকরো ভেঙে একটু একটু মুখে পুরে ভেবে চলে, এদিকে ওরা দুজনেই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। পলাশের ঘাম হচ্ছে। এবার আবার সুমেধার কাছে ধরা না পড়ে যায়। কি যে জ্বালায় পড়লো ও।
" একি? আপনি তো বোবা হয়ে গেলেন? কিছু বলুন..... আমরাও শুনি? " সুমেধা বলে ওঠে।
পলাশ দেখে, আবার আর নিস্তার নেই। কিছু তো বলতেই হবে। ও প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে, " আসলে..... আসলে.... আমি নিজের মত একটা খোঁজ করার চেষ্টা করি...লোকাল ছেলেকে দিয়ে, আর তাতেই জানতে পারি যে ওরা চন্দ্রিমাকে ধরার চেষ্টা করছে... আর ওরা যা ইচ্ছা করতে পারে ওর সাথে.... ওরা বলতে বিভাস লোকটা... ওনার এই শহরেই থাকাটা ঠিক না একেবারেই। "
পলাশ একবারও ওদের দিকে তাকায় না। পাছে ধরা পড়ে যায়।
" তাই? তা আপনার লোকাল সোর্স কে? যে এতো খবর এনে দিলো? নামটা জানান..... আমি অনেক কিছু জানতে চাই। "সুমেধা চোখ সরু করে বলে।
পলাশ না তাকিয়েই বলে, " আমার শর্ত ছিলো ওকে পুলিশের ঝামেলায় জড়াবো না.... তাই ওর নাম ঠিকানা বলতে পারবো না। "
সুমেধা উঠে আসে ওর কাছে, ওর সামনে মুখ নিয়ে ব্ললে, "আচ্ছা আমি ওকে কোন জেরা করবো না..... শুধু নামটা বলুন, এমন উপকারী ছেলের নামটা জানা দরকার। "
পলাশ আমতা আমতা করে, চন্দ্রিমা হাঁ করে শুনিছে। ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না। পলাশ ওর জন্য এতোটা ভাবে দেখে ভালোও লাগছে। ও এবার বলে, " থাক না সুমেধা দি..... ও চাইছে না যখন থাক না। "
সুমেধা হাত তুলে ওকে থামতে ইশারা করে, " বলুন... নামটা কি? "
" বিকাশ " আন্দাজে একটা নাম বলে দেয়।
" বাড়ি কোথায়? !
" জানি না..... আমার সাথে এমনি পরিচয়, চেম্বারে এসেছিলো। " পলাশ ঘেমে উঠেছে। বুকে হাতুড়ি পিটছে।
এবার হা হা করে হেসে ওঠে সুমেধা। চন্দ্রিমা আর পলাশ থ হয়ে থাকিয়ে থাকে। হাসি থামিয়ে বলে, " চন্দ্রিমা.... তোমার এই পলাশ বাবু মিথ্যাটাও গুছিয়ে বলতে পারে না..... দেখো ঘেমে নেয়ে একাকার। "
" আহা উনি খামোকা মিথ্যা কেনো বলবেন? আর উনি না থাকলে কাল রাতে আমার কি হতো জানি না..... না সুমেধা দি, তুমি ভুল করছো। " চন্দ্রিমা বিরক্ত হয়।
সুমেধা চন্দ্রিমার কথা পাত্তা দেয় না। ও টেবিলে ঝুঁকে পড়ে বলে, " কি পলাশ বাবু? আমি ভুল বলছি? দশ বছর পুলিশে সার্ভিস হয়ে গেলো..... "
পলাশ ভেঙে পড়ে। আর যাই হোক পুলিশের সামনে মিথ্যাকে সত্য বলে চালানোর জন্য যে সাহস আর ধূর্ত হতে হয় তার ধারে কাছেও নেই পলাশ। ও চন্দ্রিমার দিকে তাকিয়ে বলে, " সরি চন্দ্রিমা.....আমি পুরো ব্যাপারটা চেপে গেছি আপনার কাছে, আপনি আমাকে খারাপ ভাববেন তাই..... কিন্তু আর পারছি না.... "
" কি চেপে গেছেন? খারাপই বা ভাববো কেন? " চন্দ্রিমা অবাক। কিছুই ওর মাথায় আসছে না।
সুমেধা শুধু মিটি মিটি হাসছে, "নিন....পুরোটা ঝেড়ে কাশুন.... "
পলাশের সামনে আর কোন রাস্তা নেই। ও সেই প্রথম ফিজিওথেরাপির দিন থেকে কাল রাত অবধি সব কিছু একে একে বলে..... সুমিত্রার সাথে শারিরীক সম্পর্ক, বীরেনের ওদের ভিডিও করা.....কিছুই বাদ দেয় না। "
সবটা শেষ করে ও থামে। ঘরে পিন পরা নিস্তব্ধতা।চন্দ্রিমা হতবাক। পলাশ এতো কান্ড ঘটিয়েছে? আর ও পাশে থেকেও কিছু জানে নি? রাগের থেকেও বেশী পলাশের উপরে ওর অভিমান হয়। কি ভেনেছিলো পলাশকে আর কি করলো ও? এতো খারাপ কাজ করতে পারলো? ওর শাশুড়ির সাথে শারিরীক সম্পর্ক? ভাবতেই চন্দ্রিমার গা গুলিয়ে ওঠে...... এই লোক আর ওর শাশুড়ির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ওর৷ তাকাতেই ইচ্ছা করছে না পলাশের দিকে..... কাল রাতে অবচেতনে পলাশকে নিয়ে অনেক ভাবে, ভালো বাসতে শুরু করেছিলো লোকটাকে.... এখন তাকালেও ঘেন্না করছে।
সুমেধা মৌনতা ভাঙে, " চন্দ্রিমা, তোমার কাছে বীরেনের মোবাইল আছে? "
চন্দ্রিমার মনে পড়ে, বীরেনের মোবাইল ও তুলে ছিল, কিন্ত কোথায় রেখেছে? ও দৌড়ে যায় পাশের ঘরে,, সারা ব্যাগ খুঁজে পাশের ছোট পকেটে পায় মোবাইল, সুইচ অফ হয়ে আছে। সেটা এনে সুমেধার হাতে দেয়। সুমেধা মোবাইলটা চার্জে দিয়ে সুইচ অন করে।
গ্যালারী খুলতেই প্রথমেই চন্দ্রিমার বেশ কয়েকটা উলঙ্গ ছবি। তারপর কয়েকটা ফালতু ছবির পরেই ৩০ সেকেন্ডের সেই ভিডিও। গাড়ির কাঁচের আড়াল থেকে তোলা। পলাশ আর সুমিত্রার সঙ্গম দৃশ্য। সুমেধা বার দুয়েক ভিডিওটা দেখে চন্দ্রিমার হাতে ফোনটা দেয়... " একটা ব্যাপার চন্দ্রিমা..... এই বয়সেও তোমার শাশুড়ি যা হট, তাতে পলাশের হড়কে যাওয়াটা অস্বাভাবিক না.... হা হা হা। "
চন্দ্রিমা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে ভিডিওটা দেখে আর পলাশের দিকে তাকায়। ওর দুই চোখ বিস্ফারিত হয়ে আছে। পলাশের আর হারানোর কিছু নেই। চন্দ্রিমাকেও যে হারিয়ে ফেলেছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবুও ও উঠে আসে চন্দ্রিমার পাশে, " প্লীজ চন্দ্রিমা আমাকে ভুল বুঝবেন না.....মানুষ মাত্রই... "
"আমার বাড়ি হলে আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতাম.... আমার থেকে দূরে থাকুন। " চন্দ্রিমা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে।
ওর দুই চোখ লাল। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে। সুমেধা পলাশকে বলে আপনি পাশের ঘরে যান। ও একটু স্বাভাবিক হোক আগে।
"না সুমেধা দি..... উনি এখানে থাকলে আমি থাকবো না, আমি চলে যাচ্ছি। " চন্দ্রিমা নিজের ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয়।
পলাশ বলে ওঠে, " না আপনার বাইরে বিপদ, আমি যাচ্ছি......আপনি থাকুন। "
সুমেধা পড়েছে বিপদে, কাকে সামলাবে বুঝতে পারছে না। পলাশ বেডরুমে এসে নিজের প্যান্ট পরে দেখে শার্ট পুরো ছেঁড়া। আপাতত সেটা পাল্টাতে পারছে না।
ও সুমেধাকে বলে, " সরি ম্যাডাম, এই টি শার্ট টা এখন দিতে পারছি না.... পরে অবশ্যই দিয়ে যাব। "
সুমেধা ঘাড় নাড়ে। ওর নিজের পলাশের প্রতি তেমন রাগ হচ্ছে না। পলাশ যে একজন পরস্থিতির শিকার হওয়া যুবক সেটা ও বুঝতে পারছে। সুমিত্রার মত বড়লোক মহিলা তার উপর সুন্দরী..... ব্যাক্তিগত জীবনে চরম ভাবে অশান্তিতে ভোগা পলাশের সামনে উনি যদি ঝাঁপি খুলে বসেন, তাহলে ওর পা পিছলানোটা স্বাভাবিক। আর যাই হোক পলাশ মহাপুরুষ না.... এক স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু চন্দ্রিমার এতো রাগের কারণ কি? ও কি অজান্তে পলাশকে ভালো বেসে ফেলেছিলো? নাকি শাশুড়ির সাথে সম্পর্কটা সহ্য হচ্ছে না?
" তাহলে আসি ম্যাডাম, প্লীজ আপনি ওর খেয়াল রাখবেন..... আমি আরসে সুযোগ পাবো না। " পলাশ বলে সুমেধাকে।
সুমেধা স্মিত হাসে, "আপনার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাবেন.... দরকার হলে.... "
পলাশ নিজের নাম্বার টা বলে সুমেধার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
পলাশ বেরিয়ে যেতেই সুমেধা চন্দ্রিমার কাছে আসে। ও এখনো মুখ গোমড়া করে বসে আছে। সুমেধা বলে, " আরে উনি তো চলে গেছেন.... এবার তো স্বাভাবিক হও... নাকি? "
চন্দ্রিমা কোন কথা বলে না।
ঠিক তখনই সুমধার ফোনে কল আসে, ও ফোন রিসিভ করে বলে, " বল.... "
ওপাশে স্বপ্নীলের গলা, " চন্দ্রিমাকে দে একটু।"
সুমেধা ফোনটা চন্দ্রিমার হাতে ধরিয়ে দেয়, স্বনীলের ফোন দেখে চন্দ্রিমা একটু খুশী হয়। ও ফোন ধরে বলে, " বলো স্বপ্নীল৷ দা... "
" কোন অসুবিধা হয় নি তো? " স্বপ্নীল জানতে চায়। সুমেধা ঈশারায় পলাশের কথা জানাতে বারণ করে।
চন্দ্রিমা হেসে বলে, " না না..... দিদি খুব ভালো, কোন অসুবিধা হয় নি। "
" বাহ দারুন " এবার স্বপ্নীল গলা নামায়, " শোন, একটা কথা...... তোমার জন্য একটা জায়গা দেখেছি, আজ বিকালেই সেখানে নিয়ে রেখে আসবো তোমাকে.... আর বাকিটা কিভাবে সামলানো যায় আমি দেখছি...তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।"
চন্দ্রিমার মুখে স্বস্তির চিহ্ন দেখা যায়। ও বলে, " থ্যাঙ্ক ইউ স্বপ্নীল দা...... তুমি পাশে না থাকলে আমি কি যে বিপদে পড়তাম."
স্বপ্নীল হাসে, " আরে ছাড়ো.... এইটুকু করতে পারবো না তোমার জন্য? আফটার অল আমরা একই কলেজের ছাত্র। "
চন্দ্রিমা স্বস্তির হাসি হাসে। স্বপ্নীল আবার বলে, " তাহলে রেডি থেকো, আমি ঠিক পাঁচটায় যাবো। "
চন্দ্রিমার এতো খুশী দেখে সুমেধা ভ্রু কোঁচকায়। চন্দ্রিমা ফোন রাখতেই ও বলে, " আচ্ছা চন্দ্রিমা..... স্বপ্নীলকে তুমি কতদিন চেন? "
হঠাথ এই প্রশ্নে চন্দ্রিমা অবাক হয়, " না মানে আমাদের কলেজে সিনিয়ার ছিলো, তখন সেভাবে পরিচয় হয় নি.... পরশু রাতে অনেকদিন পর দেখা হয়, অনেক হেল্প করে ও। "
সুমেধা একটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে তার পাশে বসে। কয়েকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, " এতো তাড়াতাড়ি ওকে এতো বিশ্বাস করছো কিভাবে? "
চন্দ্রিমা হতবাক, " এসব কি বলছো? সেই রাতে উনি না থাকলে আমার কি হতো ভেবে গা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে.... তোমার কাছে আমার থাকার ব্যাবস্থাও ওই করে দেয় সেটা তো জানো। "
সুমেধা মুচকি হাসে, " বলির পাঠা দেখেছো? ..... তাকে হড়িকাঠে তোলার আগে স্নান করিয়ে খাইয়ে পূজা করা হয়..... এটা জানো? "
চন্দ্রিমা একটু মনক্ষুণ্ণ হয়, " আমাকে বলির পাঠা বলছো? স্বপ্নীল দা কিন্তু তেমন মানুষ না। "
সুমেধা ওর কথার উত্তর না দিয়ে কাউকে একটা ফোন করে। ওপাশে কে ধরে বোঝা যায় না। সুমেধা বলে, " শর্মাজী..... আজ কাল রাত কো সাব কে পাস কোই আয়া থা ক্যায়া? হামারে ডিপার্টমেন্ট কা "
ওপাশে শর্মা বলে, " ক্যায়া হুয়া সুমেধা? কুছ গড়বড়? "
সুমেধা হাসে, " নেহী... আপ বাতাইয়ে না... "
ইন্সপেকটার শর্মা বলে, হা কাল তো সাব সাম কো ইধার আয়ে থে..... উসকে বাদ এসিপি সুদীপ দত্তা আয়ে থে... আউর... "
"অউর কোই? " সুমেধা কৌতুহলী হয়।
" হাঁ রাত ন বাজে ও স্বপ্নীল আয়ে থে... " শর্মা বলে।
সুমেধার মুখ হাসি খেলে যায়, " আচ্ছা, স্বপ্নীল কে সাথ বাত ক্যা হুয়া কুছ পাতা হ্যায়? মতলব ক্যা করনে আয়ে থে ও? "
শর্মা একটু ভেবে বলে , " নেহী... ও তো মালুম নেহী, মাগর লগভগ আধা ঘন্টা বাত কিয়া দোনো নে.... উসকে বাদ স্বপ্নীল চলা গয়া.... সাহাব ভি। "
" জানে কে সময় স্বপ্নীল কা চেহেরা ক্যায়সা থা? মতলব খুশ থা? ইয়া রুঠা হুয়া? "
" হাঁ....বো তো বহত খুশ থা.... মুঝে চায়ে পুছা... মাগর ম্যায় মনা কর দিয়া, মুঝে ঘর নিকালনা থা। "
" ওকে.... থ্যাঙ্ক ইউ শর্মা জী... আপ য়ে বাত কিসিকো মত বাতাইয়ে.... ম্যায়নে আপকো পুছা। "
ফোন রেখে সুমেধা চন্দ্রিমার সামনে বসে। চন্দ্রিমার সব কিছু ধোঁয়াশা লাগছে। কিছুই বুঝতে পারছে না। সুমেধা দি কি স্বপ্নীল কে সন্দেহ করছে? কিন্তু ও তো কোন কারন দেখছে না। স্বপ্নীল এই পর্যন্ত ওর উপকারই করেছে। ওর চোখে জিজ্ঞাসা।
" চন্দ্রিমা, তুমি এখান থেকে পালাও। " সুমেধা বলে ওর দিকে তাকিয়ে।
" মানে? কেনো? " চন্দ্রিমা হাঁ হয়ে যায়।
" না হলে কালই তুমি বিভাসের খপ্পড়ে পড়ে যাবে, আর বিভাস এই সুযোগ ছাড়বে না.... তোমাকে নিংড়ে খাবে। "
" কি... কিন্তু স্বপ্নীল দা যে বলল.... "
" স্বপ্নীল কে আমার থেকে ভালো কেউ চেনে না, এমনিতে কোন খারাপ দোষ নেই, কিন্তু নিজের স্বার্থ আসলে ও আর কিছু ভাবে না সেটা আমি জানি।..... ও তোমাকে বিভাসের হাতে তুলে দেবে। "
" কিন্তু কেনো? " চন্দ্রিমার বিশ্বাস হয় না।
" কারণ ওর এক কোটির ফ্লাট......নিউটাউনে স্বপ্নীল একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে এক বছর হলো, একটা ভালো ডিল করেই পেয়েছে সেটা, কিন্তু ব্যাগড়া দেয় ধর..... স্বপ্নীলকে ব্যাকমেল করে যে ফ্ল্যাটের দামের ২৫% নগদে না দিলে ও স্বপ্নীলের উপর ইনকোয়ারী বসাবে। এতো টাকা দেওয়া স্বপ্নীলের পক্ষে সম্ভব ছিলো না.... এর মধ্যেই তুমি এসে ওর কাজটা সহজ করে দিলে, স্বপ্নীল যতদূর সম্ভব বিভাসের সাথে ডিল ফাইনাল করে ফেলেছে। তোমার বিনিময়ে..... আমার ধারণা সেই ডিল করতেই ও কাল যায় বিভাসের কাছে। "
" কিন্তু আপনার ধারণা তো মিথ্যাও হতে পারে? "চন্দ্রিমা ভ্রু কুঁচকে বলে।
সুমেধা কাঁধ নাচায়, " না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী, তবে হলে তোমার কোন ক্ষতি নেই, কিন্তু আমার ধারণা সত্যি হলে তোমার কি হবে সেটা ভেবে দেখেছো? "
চন্দ্রিমা পড়ে অথৈ জলে। সুমেধার সাথে ওর কোন শত্রুতা নেই, তাই শুধু শুধু সুমেধা ওকে ভুল বোঝাবে না..... এক যদি না সুমেধা স্বপ্নীল কে ভালোবাসে, যদি ও এটা ভাবে যে স্বপ্নীল চন্দ্রিমার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে তাহলে সম্ভব...... কিন্তু ওর আচরণে সেটার কোন প্রকাশ নেই..... তাহলে কি সুমেধাই ঠিক? চন্দ্রিমার মনে হচ্ছে ও যেনো চোরাবাললিতে ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ..... এখন ওর সামনে দুটোই পথ খোলা, এক, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে আত্মসমর্পণ করা আর দুই, সব না মেটা পর্যন্ত পালিয়ে থাকা।
ও কিছু না বলে অসহায়ের মত সুমেধার দিকে তাকায়। সুমেধা ওর অবস্থা বুঝে কাঁধে হাত রাখে, " বেশী ভেবো না..... আমার সাধ্যমত আমি চেষ্টা করবো... "
" কিন্তু আমি কোথায় যাব? কোথাও তো জায়গা নেই। " চুন্দ্রিমা বলে।
সুমেধা একটু ভাবে। তারপর বলে, " বাঁচার পথ একটাই..... তুমি আউট অফ বেঙ্গল চলে যাও। "
" মাথা খারাপ! কিছুই চিনি না আমি.... বাইরে একা একা কিভাবে যাবো? " চন্দ্রিমা আর্তনাদ করে ওঠে।
" আহা, একা যাবে কেনো.... আর একজন যাবে তোমার সাথে..... "
" কে? "চন্দ্রিমা অবাক হয়। এমন কে আছে?
সুমেধা হাসে, " পলাশ বাবু....এই মূহুর্তে ওনার থেকে বিশ্বাসী আর কেউ নেই। "
" অসম্ভব...." চন্দ্রিমা উঠ দাঁড়ায় " আমি এখানেই থেকে ধরা দেবো তাও ওর সাথে যাবো না। "
" আহা.... আগেই এতো উত্তেজিত হয়ো না, বসো। " সুমেধা ওকে বসায় ধরে। চন্দ্রিমা রাগে কাঁপছে। সুমেধা ওর হাত ধরে বলে, " আমার কথা ভালো করে বোঝো, পলাশ খারাপ কাজ করেছে এটা সত্যি, কিন্তু সেটা নিতান্তই ঝোঁকের বশে, কিন্তু তোমার প্রতি ও কোন খারাপ ব্যাবহার এখনো করে নি, উলটে তোমাকে হেল্প করেছে, তোমার জন্য মার খেয়েছে.... মানে তোমার প্রতি ওর কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই এটা একেবারে সত্যি। "
" কিন্তু ও যে আমার শাশুড়ির সাথে মিলে নেই সেটা কিভাবে শিওর হচ্ছো? "
" না নেই..... এটা আমি জানি, ও নিজেও চাইছে এর থেকে বেরোতে.... " সুমেধা বলে।
" এই সবই তোমার ধারণা, সেটা সত্যি না হলে.... আমি ফাঁসব।"
" চিন্তা নেই..... তোমাকে এমন জায়গায় পাঠাবো সেখানে কারো ক্ষমতা হবে না তোমাকে ছোঁয়ার। "
" কোথায় দিদি? " চন্দ্রিমা বলে।
" রাঁচী..... ঝাড়খণ্ড। " সুমেধা চোখ সরু করে।
আবার বলে, " শোন.... রাঁচীর কাছেই আমার এক বন্ধুর রিসর্ট আছে। এখন সেখানে তেমন কোন টুরিষ্ট নেই, তোমরা দুজনে খুব ভালো ভাবে সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারবে। কারো বাবার সাধ্যি নেই খুঁজে পায়।
" প্লীজ না সুমেধাদি..... আমি ওইসব অচেনা জায়গায় যাবো না.... " চন্দ্রিমা কেঁদে ফেলে।
সুমেধা ওর মুখ তুলে ধরে দুই হাতে, " শোন.... তোর দায়িত্ব আমার উপর.... আমাকে বিশ্বাস কর, বিভাসের খোরাক হয়ে যাবি এখানে থাকলে। "
" তাই বলে ওই জঘন্য লোকটার সাথে? "
" আরে বাবা তুই কি ওকে বিয়ে করছিস? না ওর সাথে রোমান্স করছিস? জাস্ট সাথে থাকবি..... " একটু থেমে মুচকি হেসে বলে, " আমার কিন্তু খারাপ লাগে না ওকে, একটু বোকাসকা যদিও তবুও বেশ ড্যাসিং ভাব আছে.... কাল তো ওকে দেখেই আমি...... "সুমেধা হেসে ফেলে।
চন্দ্রিমা জানে রাতের কাহিনী। কাল সুমেধার মায়াটারবেশনের কারণ কি পলাশ? ও নিজেও লজ্জায় লাল হয়.... কাল রাতের কথা ওর মনে পড়ে যায়। কিভাবে যে হঠাৎ ওর এমন হলো। পলাশ যদি জেগে যেতো তাহলে আর মুখ দেখাতে পারতো না।
হাওড়া রাঁচী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে দুপুরে ছাড়ে। বলতে গেলে বিনা প্রস্তুতিতেই পলাশ স্টেশনে আসে। সম্বল একটা পিঠ ব্যাগে কিছু জামাকাপড়, আর টুকিটাকী জিনিস । সুমেধার ফোন পেয়ে ও অবাক হয়ে যায়, আরো অবাক হয় একথা শুনে যে চন্দ্রিমাকে নিয়ে এখান থেকে দূরে যেতে হবে কয়েকদিনের জন্য। ওর কোন অসুবিধা নেই। কয়েক দিনের জন্য কাটিয়ে আসতেই পারে। কাউকে জবাব দেওয়ারও কোন ব্যাপার নেই। কিন্তু চন্দ্রিমা কিভাবে রিয়াক্ট করবে কে জানে?
বিশাল হাওড়া স্টেশনে প্রায় ফাঁকা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আচগে ট্রেনটা। সুমেধা আর চন্দ্রিমা তখনো এসে পৌছায় নি। পলাশ জানে না কোন কামরায় যাবে। ও এদিক ওদিক তাকায়।
ট্রেন ছাড়ার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে সুমেধা পৌছায় চন্দ্রিমাকে নিয়ে। টিকিট সুমেধাই কেটে দিয়েছিলো। সাধারণ কামরার টিকিট। ওকে দেখেই চন্দ্রিমা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সুমেধারও চোখ এড়ায় না সেটা। ও পলাশের দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে। কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে বলে, " সাবধানে..... ক্ষেপে আছে কিন্ত.... "
পলাশ জোর করে একটু হাসে। সুমেধা আবার বলে, " শোন ওখানে আমার মামাতো দাদা থানার আই সি..... নাম প্রকাশ সিংহ... ওকে সব জানানো আছে, আমি কন্টাক নাম্বার পাঠিয়ে দেব, তুমি যোগাযোগ করে নেবে। "
" আপনি আসবেন না? "
সুমেধা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে, " আমি ঠিক খোঁজ খবর নেবো..... শোন, বিভাসের উদ্দেশ্য খারাপ, ও সুযোগ পেলে চন্দ্রিমাকে বিছানায় ফেলবে.... তাই ওকে সাবধানে থাকতে হবে, এদিকটা আমি সামলে তারপর জানাবো...... "
পলাশ বলে, " সত্যি ম্যাডাম.... আপনি একটা অজানা মেয়ের জন্য এতোটা করছেন এটা সত্যি..... আর কেউ হলে.... "
সুমেধা বিষণ্ণ হাসে, " আসলে ওকে আমার মত শিকার হতে দিতে চাই না। "
পলাশের হাতে একটা চাপ দেয় সুমেধা, " নিজেরও খেয়াল রেখো...... একটু বুদ্ধি করে কাজ করবে, এতো বোকামী ভালো না। "
ট্রেন ছেড়ে দেয়, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পলাশ দেখে সুমেধা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শেষের কথাটা পলাশের জন্য..... সুমেধা কি কিছু ইঙ্গিত করলো? পলাশ আবার তাকায়, অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। সুমেধা ঘুরে হেঁটে যাচ্চে। সুমেধার হাঁটার স্টাইলে কোথাও মেয়েলি ভাব নেই। একেবারে দৃপ্ত পায়ে শরীর টান করে হাঁটে। মেয়েটার পার্সোনালিটিটাই আলাদা। একটা শ্রদ্ধা জেগে ওঠে। সুমেধা দূরে ভীড়ে মিলিয়ে যায়। পলাশ ট্রেনের ভিতরে আসে।
ওই ট্রেনটা প্রায় ফাঁকাই থাকে। ওরা সেকেন্ড ক্লাস এ জার্নি করছে। পাশাপাশি তিনটে সিটের দুটো ওদের। চন্দ্রিমা আগে ভাগেই জানালার ধারে বসে গেছে। ওর দিকে তাকাচ্ছেও না। পলাশ চন্দ্রিমার পাশের সিটে বসে। ট্রেন ছুটে চলেছে। ও একটা কালো শাড়ি পরে আছে। পিছনে ক্লিপ করা চুল, সামনের চুল হাওয়ায় উড়ছে। মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে।
" খাবেন কিছু? " পলাশ কথা বলতে যায়।
ও না তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে বলে, " না " আবার বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভ্রু টা সোজা কিছুতেই হচ্ছে না।
পলাশ সীটে হেলান দিয়ে চোখ বোজে। চন্দ্রিমার কোন সাড়া শব্দ নেই। মাঝে মাঝে পাশ দিয়ে হকাররা বেরিয়ে যাচ্ছে.... হাঁকতে হাঁকিতে।
" চা খাবেন? " পলাশ আবার বলে।
" না..... আর বারবার এসব জিজ্ঞাসা করবেন না, আপনার যা ইচ্ছা করুন,। " চন্দ্রিমা মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে।
পলাশ চুপ করে যায়। তারপর স্বগতক্তির মত বলে, " আসলে এতো ঝামেলায় ছিলাম যে খাওয়াটাও হয় নি.... কি খাবো? ট্রেন তো সেই রাতে পৌছাবে। "
চন্দ্রিমা শুনেও মুখ ঘোরায় না। চোখ বুজে জানালায় মাথা এলিয়ে দেয়। পলাশ এক কাপ লেবু চা কিনে খায়।
একা একা চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে বোর হয়ে ওঠে। পাশে চন্দ্রিমা এদিকে একবার তাকাচ্ছেও না। কি সাংঘাতিক রাগ ওর। কিন্তু পলাশ উসকুস করেই যাচ্ছে কথা বলার জন্য। শেষে আবার বলে.....
" এই যে শুনুন.... আমি খারাপ মানলাম, কিন্তু আপনার তো কোন ক্ষতি করি নি.... আর মানুষ মাত্রই ভুল করে, তাই বলে এভাবে ব্যাবিহার করবেন? এরপর এমন করলে তখন বলবেন..... এখন তো ভুলে যান। "
" আপনি কে? আপনার যা ইচ্ছা করবেন.... আমি তো চাইও নি আপনি সাথে আসুন। " চন্দ্রিমা আবার মুখ ঝামটা দেয়।
তার মানে যতদিন থাকবেন এভাবেই? কথা বার্তা ছাড়া? "
চন্দ্রিমা ঘাড় নাড়ে " হ্যাঁ..... আপনার ভালো না লাগলে সামনে স্টেশনে নেমে চলে যান। "
পলাশ আর ঘাঁটায় না। চুপচাপ এদিক ওদিক দেখতে দেখতে সময় কাটায়। ট্রেন এ প্রায় অর্ধেক সীট খালি। ইচ্ছা করলে ও সীট ছেড়ে অন্য জায়গায় বসতে পারে। কিন্তু ও যায় না।
কাউকে কিছু না জানিয়েই ও চলে এসেছে। অবশ্য জানানোর মত কেউ নেই। চেম্বারের ছেলেটাকে শুধু বলেছে এক সপ্তাহ ও থাকবে না..... বিদিশাকে জানানোর কোন প্রশ্নই নেই। শুধু মন কেমন করছে মেয়েটার জন্য। ওকে একটু দেখে আসা হলো না।
আড়াইটা নাগাদ ট্রেন খড়্গপুর পৌছায়। পলাশ নিজের ব্যাগটা নিয়ে সিট থেকে উঠে দাঁড়ায়, দরজার দিকে এগোতেই চন্দ্রিমার আতঙ্কিত গলা, " কোথায় যাচ্ছেন? "
পলাশের হাসি পেয়ে যায়। ও হাসি চেপে বলে," কেন বলুন তো? আপনিই তো আপনাকে ডিস্টার্ব করতে না করলেন? "
চন্দ্রিমা ঢোক গিলে বলে, " তাই বলে যদি নেমে যান তাহলে তো জানিয়ে যাবেন..... পরে কিছু হলে আমি কি বলবো লোককে? "
" আমার কিছু হলে কেউ আপনাকে ধরবে না, আপনার কিছু হলে সুমেধা ম্যাডাম আমাকে ধরবে। " ট্রেন দাঁড়াতেই পলাশ নেমে আসে। একটা দোকান থেকে কিছু কেক, পাউরুটি আর বিস্কুট কেনে। দোকানে বেশ ভীড় ছিলো।
ও ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দেখে চন্দ্রিমা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। পলাশ বেশ উপভোগ করছে চন্দ্রিমার এই রাগ অভিমান। অনেকক্ষণ সিগারেট খায় নি ও। ট্রেন কিছুক্ষন দাঁড়াবে, স্টেশনে তো খাওয়া যাবে না পলাশ আড়াল খোঁজে। শেষে অনেকটা দূরে একটা বন্ধ দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায় অনেক ভয়ে ভয়ে। ধরা পড়লেই ফাইন।
আয়েশ করে সিগারেট শেষ করার আগেই ট্রেন ছেড়ে দেয়। পলাশ সিগারেট ফেলে দৌড়াতে থাকে। ট্রেন গতি নিয়ে নিয়েছে। পলাশের পিঠে ব্যাগ। ও দেখে জানালা দিয়ে চন্দ্রিমা উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে।
পলাশ দরজার হ্যান্ডেল ধরে উঠতে গিয়েই বাধে বিপ্পত্তি। পা দানিতে পা হড়কে যায়। ভাগ্যক্রমে ট্রেন আর প্লাটফর্মের মাঝে না পড়ে ও ট্রেনের ভিতরেই পড়ে। দরজার কাছে দাঁড়ান কয়েকজন হৈ হৈ করে ওঠে। ওর হাত ধরে ওকে টেনে নেয় ভিতরে।
" কি দাদা.... এভাবে কেউ ওঠে? অন্য দরজায় উঠতে পারতেন? "
পলাশের হাঁটুতে জোর লেগেছে। কপালেও। এমনি কাল মার খাওয়া দূর্বল শরীর। ও ওদের হাত ধরে দাঁড়িয়ে দেখে সামনে চন্দ্রিমা। ওর দুই চোখে উৎকন্ঠা।
" লেগেছে? " চন্দ্রিমা প্রশ্ন করে।
পলাশ হাসে, " না.... আপনাকে খুশী করতে পারলাম না.... "
"ছ্যাবলামি ছেড়ে সিটে আসুন। " চন্দ্রিমা ওর হাত ধরে। দুজনে সিটে এসে বসে। চন্দ্রিমা বলে, " কোথায় লেগেছে দেখি। "
" দেখে লাভ কি? সামান্য ই লেগেছে। "
চন্দ্রিমা ব্যাগ থেকে একটা মলম বের করে বলে, " এটা লাগিয়ে নিন... "
পলাশ বার বার নিষেধ করলেও ও জোর করে মলম লাগিয়ে দেয়।
পলাশ হাসে, " আপনি অদ্ভুত, একটু আগেই আমার মুখ দেখতে চাইছিলেন না। "
চন্দ্রিমা গম্ভীর হয়ে যায়, " জানেন পলাশ বাবু..... কিছু কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হওয়ার পর তার সম্পর্কে একটা ছবি তৈরী হয়...... কিন্তু সেই ছবিতে যখন চীড় ধরে খারাপ লাগে বৈকি। "
পলাশ কিছু বলতে পারে না। অপরাধীর মত মুখ নীচু করে। চন্দ্রিমা আবার বলে, " ছাড়ুন, সুমেধা দি সত্যি বলেছে....... আপনাকেই বা পুরো দোষ দেবো কেনো? আপনিও তো জীবনে কম কষ্ট পান নি..... পা পিছলাতেই পারে... "
পলাশ চন্দ্রিমার হাতের উপরে হাত রাখে, " আমি যা করেছি ভুলে যান..... আজ থেকে আমার নতুন জীবন শুরু হলো, এবার কোন ভুল করলে বলবেন। "
চন্দ্রিমা বিষণ্ণ হাসে, " না না, সেটা কেনো? আপনার জীবনে কি করবেন সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার.... নিজের এতো ঝামেলার মধ্যেও যে আমার জন্য এইসব করছেন সেটাই বা কম কিসের? আমরা তো আর কোন রিলেশনে যাচ্ছি না? "
পলাশ খুব ধীরে বলে, " কেন....যদি যেতে চাই? "
চন্দ্রিমা ঝট করে ওর দিকে ঘোরে, " না পলাশদা.... এসব স্বপ্নেও ভাববেন না.....এইসবের পর আপনাকে আমি বন্ধু বলে মানলেও আর কিছু ভাবতে পারবো না..... প্লীজ। "
পলাশের মনে হলো বুকের কোথাও একটা চিনচিনে কষ্ট হচ্ছে। অথচ জীবনে এতোদিন কোন মেয়ের জন্য এমন কষ্ট হয় নি।
ঘটশিলা ঢোকার আগে দুইদিকের ছবি পালটে যায়। দুপাশে ছোট পাহাড়ের সারি, আর কাশ ফুলে সাদা হয়ে আছে মাঠকে মাঠ। বিকালের ম্লান আলোয় ধুসর পাহাড়ের সারি... সেই দেখে চন্দ্রিমা বাচ্চাদের মত লাফিয়ে ওঠে এই অবস্থাতেও।
" দেখুন..... কি দারুণ!!! "
পলাশ হাসে, "আপনার থেকে সুন্দর না। "
চন্দ্রিমা চোখ পাকায়, " কোন লাভ নেই ফ্লার্ট করে.... "
" আচ্ছা আপনি এর আগে রাজ্যের বাইরে যান নি... না? "
চন্দ্রিমা ঘাড় নাড়ে, " না.... আমার বাবার সামর্থ্য ওই দীঘা পর্যন্তই ছিলো। বিয়ের পর শোভনকে বলেছিলাম সিমলা যাবো হানিমুনে...... সে আর হয় নি কোনদিন। "
চন্দ্রিমা জানালায় মুখ রেখে দুপাশে পাহাড়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পলাশ তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কি অপূর্ব সুন্দর চন্দ্রিমা.... যেনো একেবারে ছাঁচে বানানো.... একবার কাছে পেলে এর থেকে দূরে যাওয়া কঠিন কাজ।
পলাশের খুব ইচ্ছা করে ওর দুটো পাতলা সিক্ত অধরে ঠোঁট ডুবিয়ে দীর্ঘ চুম্মবনে ভরিয়ে তোলে..... ওর পায়রার মত নরম স্তন হাতের তালুতে রেখে তার কম্পন অনুভব করে.... চন্দ্রিমার শরীর প্রায় সেঁটে আছে ওর সাথে... আপাত ভাবে কোন দূরত্ব নেই, কিন্তু যে দূরত্ব আছে সেটা মিটতে কত সময় লাগবে জানা নেই। নাও মিটতে পারে।
রাত দশটার একটু আগে ট্রেনটা রাঁচী গিয়ে পৌছায়। পলাশ ভেবেছিলো এতোরাতে হয়তো চারিদিক ফাঁকা থাকবে। কিন্তু স্টেশনের আশেপাশে বেশ ভীড়। ওরা বেরনোর সাথে সাথেই কয়েকজন ছেলে ওদের ছেঁকে ধরে হোটেল লাগবে নাকি? পলাশ অনেক কষ্টে ওদের পিছু ছাড়ে। ট্রেনে লং টাইম সিগারেট না খেয়ে ওর মাথা ধরে গেছে। ও আগে একটা সিগারেট ধরায়।
চন্দ্রিমা ওর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায়, " একদিন না খেলে কি হয়? "
পলাশ হাসে, " আপনিও ট্রাই করতে পারেন। "
" আপ লোগ কলকাত্তা সে আয়ে হ্যায়? " একটা চল্লিশ বছরের লোক ওদের দিকে এগিয়ে আসে। পরনে হাফ হাতা শার্ট আর প্যান্ট। পায়ে চপ্পল।
পলাশ ঘাড় নাড়ে। চন্দ্রিমা সভয়ে লোকটার দিকে তাকায়। কাউকে ওর বিশ্বাস হয় না। এ লোক কিভাবে জানলো যে ওরা কলকাতা থেকে আসছে?
" আপ পলাশ জী হ্যায়? "
পলাশ আবার ঘাড় নাড়ে৷ লোকটা এবার হাসে, " আইয়ে..... ও প্রকাশ সার ভেজা হামকো..... আপ লোগো কা হোটেল থোড়া দূর হ্যায় না.... ইতনি রাত আগার কার বুক করকে যাওগে তো বহত রূপিয়া লে লেগা... "
পলাশ নিশ্চিন্ত হয়। ঠিক তখনি সুমেধার ফোন আসে, " পৌছেছেন? "
" হ্যাঁ"
" শুনুন, স্টেশনে লোক আসবে আপনাদের নিতে, ওর সাথে চলে যান কোন ভয় নেই.... ওর নাম মনোহর নায়েক। "