অনুসূয়ার নতুন জীবন - অধ্যায় ৪
(অনুসূয়াকে এখন থেকে এই গল্পে অনু বলে ডাকা হবে)
এখন থেকে এক বছর আগে অনুর পোস্টিং হয় এই গ্রামের গ্রামীণ ব্যাংকের ব্রাঞ্চে। অনু কলকাতার মেয়ে, ওর জন্ম, বড়ো হওয়া সব কলকাতাতে। ছোট থেকেই ও খুব এমবিটিয়াস ছিল, তাই গ্রাডুয়েশন এর পরে MBA করে। ফিনান্স এর উপর MBA করাই ও চাকরি পাই এই গ্রামীণ ব্যাংকে। প্রথমে ব্যাংক বলেছিলো কলকাতাতেই পোস্টিং থাকবে কিন্তু জয়েন করার পর বলে ওর পোস্টিং হবে এই গ্রামের ব্যাংকের ব্রাঞ্চে। অনু এই নিয়ে অব্জেকশন জানালেও কোনো কাজ হয় না হয় ওকে ওখানেই যেতে হবে না হলে কোম্পানি বলে চাকরি ছেড়ে দিতে। ওর বাবা-মা এর কোনোদিন ওর বাইরে যাওয়া নিয়ে আপত্তি ছিল না তাই বাড়ি দিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি, আর অনুর কোনো রিলেশনশিপ ও ছিল না তাই সেই দিক দিয়েও কোনো সমস্যা হয়নি, তাই ও যেতে রাজি হয়ে যাই এই ভেবে প্রথম চাকরি ছেড়ে দিলে ক্যারিয়ারএ বাজে প্রভাব পড়বে। কিন্তু সে কি আর জানতো হয়তো তার এই যাওয়ার ডিসিশনের জন্যই তার ক্যারিয়ারটা হয়তো থাকবে না।
অনু যখন ওখানে পৌঁছায় ওর সাথে ওর বাবা যায় সব কিছু শুরুতে গুছিয়ে দিয়ে আসার জন্য। আলামপুর গ্রামএ যাওয়ার জন্য ট্রেন থেকে নাবতে হয় কিষাণগঞ্জ স্টেশনে, স্টেশন থেকে গ্রামএ যেতে হয় বাসে করে না হলে অটো করে। চল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা স্টেশন থেকে, অটো বা বাস যায় হোক কম করে ২-২.৩০ ঘন্টা লাগে যেতে। স্টেশন নেবে অনু এবং ওর বাবা হোটেলে যায় যেটা কোম্পানি আগে দিয়ে বুক করে রেখেছিলো। হোটেল কিছুদিনের জন্য পাবে ততদিনের মধ্যে ওকে আলামপুরএ একটা জায়গা খুঁজে নিতে হবে থাকার জন্য। পৌঁছানোর পরের দিন ওর সমস্ত জয়েনিং ফর্মালিটিস কিষাণগঞ্জ এর ব্যাংক এর ব্রাঞ্চেটাতেই হয়। তারপর দুদিন ওর ট্রেনিং হয় কিষাণগঞ্জ এর ব্রাঞ্চে। চতুর্থ দিনে ওকে যেতে হয় আলামপুর ব্রাঞ্চে নিজের দায়িত্ব বুজে নেওয়ার জন্য। চতুর্থ দিনে সকালে গ্রামে পৌঁছায় অনু। বাস থেকে থেকে নামে বাজারের সামনে, নেমে দেখে নরমাল গ্রামের বাজার, দোকানপাট, বাজারের মধ্যেই ব্যাংকের ব্রাঞ্চে। ব্রাঞ্চে গিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর ব্রাঞ্চের ম্যানেজার বোঝে যার জয়েন করার কথা ছিল সেটা অনু। ওকে ওর সব কাজ বুজিয়ে দেয়, ওর কাজ ছিল ব্রাঞ্চে যারা একাউন্ট ওপেন করার জন্য আসে সেই সব কাস্টমার দের হ্যান্ডেল করা, তার সাথে আরো কিছু ব্যাংকের সার্ভিস সেল করা, দরকার পড়লে গ্রামে কারোর বাড়িতে যাওয়া যে একাউন্ট খুলতে চাই, লোন নিতে চাই ইত্যাদি, গিয়ে সব ফর্মালিটিস করে আসা, ব্যাংকের কাছে যেই লিডস গুলো থাকে কাস্টমারদের সেই সব বাড়িতে নিজে গিয়ে ভিসিট করা, কারণ গ্রামটা ছোট খুব বেশি বাড়ি নেই তাই ফিল্ড ভিসিট সমস্যা হবে না। সব দায়িত্ব বুজে নেওয়ার পর প্রথম দিন বেশি কাজ না থাকায় ম্যানেজারকে বলে ও বেরিয়ে যায় থাকার জায়গা খোঁজার জন্য, কারণ যত তাড়াতাড়ি থাকার জায়গা পাবে এখানে শিফট হতে পারবে নাহলে প্রতিদিন যাওয়া আসা, কাজ করা সম্ভব না। কিষাণগঞ্জ শেষ ফেরার বাস বিকেল চারটে তখনতো কাজও শেষ হবে না। বাজারে থাকার জায়গা খুঁজলেও পেলোনা। এখানে সেই ভাবে কেউ থাকে না, ব্রাঞ্চে যারা কাজ করে প্রথমত খুব বেশি লোক নেই এই ছোট ব্রাঞ্চে ১৫-২০ জন লোক, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগএর বাড়ি আশেপাশের গ্রামেই, ব্রাঞ্চে যারা পিওন আর সুইপার আছে তারা ৩-৪ এই গ্রামেই বাড়ি, ম্যানেজারের বাড়ি কিষাণগঞ্জ সে নিজের বাইকেই প্রতিদিন যাওয়া আসা করে। সেই দিন ও খুঁজেও কিছু পেলো না, লেট্ হতে থাকায় ব্রাঞ্চে ফিরে গিয়ে বেরিয়ে গেল বাস এর জন্য কিষাণগঞ্জ ফিরতে হবে। পরের দিন গিয়ে সকালে কিছু কাজ করে অনু বেড়ালো কিছু জনের বাড়ি ভিসিটের জন্য ব্যাংকের লিডস অনুযায়ী। কাজ করতে করতে থাকার জায়গার খোঁজও করতে লাগলো। এই ভাবে গ্রামের কিছুটা ভেতরের দিকে যাওয়ার পর একটা বাড়িতে যায় কাজের জন্য। সেই বাড়িতে থাকে হাসব্যান্ড ওয়াইফ বয়স ৫০ এর উপর তাঁদের ছোট ছেলে কলেজে পরে বড়ো ছেলে কাজের জন্য বাইরে থাকে। হাসব্যান্ড ওয়াইফ একটা লোনের ইনকোয়ারি করেছিল ব্যাংকে কিছুদিন আগে কিন্তু তারপর আর কিছু হয়নি, তাই সেই নিয়েই অনু তাঁদের সাথে কথা বলছিলো লোন নেবে কিনা সেইসব নিয়ে। কথা বলতে বলতে অনু তাঁদের জিগ্যেস করে এখানে কোনো থাকার জায়গা আছে কিনা। তখন তারা বলে এই গ্রামে তো ওই ভাবে কেউ থাকে না তাই ঐরম জায়গা নেই, কিন্তু ও যদি চাই ওদের বাড়ির তিনতলায় ঘর খালি আছে থাকতে পারে, অনুর মনে আসা তৈরী হলেও ও একটু কিন্তু কিন্তু করে কারণ বাড়িতে একটা ছেলেও থাকে আর এক ছেলে মাসে দুবার করে বাড়ি আসে, তার সাথে কিরম সুযোগ সুবিধা আছে বাড়িতে সেটাও জানা নেই। অনুর কিন্তু ভাব দেখে ওরা বলে তুমি চিন্তা করো না কোনো সমস্যা হবে না আমরা তো একাই থাকি ছোট ছেলেটা সারাদিন বাইরেই ঘুরে বেড়াই, বড়ো টা তো মাঝে মাঝে আসে আর ঘরে ইলেকট্রিক লাইন করা আছে শুধু তোমাকে ফ্যান ও লাইট কিনতে হবে, জলের জন্য বাড়িতে কুয়ো আছে, খাওয়ার জল বাইরে টিউবয়েল দিয়ে আনতে হয়, বাথরুম বাড়ির পিছন দিকে আছে, টাকাপয়সা ঐরম দিতে হবে না শুধু ওই ঘরের ইলেকট্রিক বিল দিলেই হবে। অনু ভাবলো খারাপ না গ্রামে এর দিয়ে আর কি ভালো পাবে, তার সাথে সেফটি নিয়েও খুব সমস্যা হবে না ফামিলি থাকে, ভাড়া বেশি না তাও শুধু ইলেকট্রিক বিল দেবো তার সাথে আরো কিছু দেওয়া উচিত। তাই অনু ওদের বললো সব ঠিকাছে কিন্তু ইলেকট্রিক বিলের সাথে আরো কিছু ভাড়া নিতে হবে, ওরা প্রথমে না না করলেও অনুর জোরাজুরিতে শেষে ইলেকট্রিক বিলের সাথে আরো ১৫০০ টাকা করে দেবে ভাড়া হিসাবে। অনু তাও একদম ফাইনাল করলো না ভাবলো হোটেলে গিয়ে বাবার সাথে কথা বলে ফাইনাল করবে পারলে কালকেই হোটেল ছেড়ে বাবাকে নিয়ে এখানে চলে আসবে তাহলে সবকিছু বাবা কালকেই কিনে ঘুছিয়ে দিতে পারবে ও নিজেও এখানে সেটল হয়ে যেতে পারবে, বাবাও ফিরে যেতে পারবে কারণ বাবার ও কাজ আছে। এই ভেবে সেই দিনের মতো কাজ শেষ করে ও ফিরে গেল কিষাণগঞ্জ। বাবার সাথে সবকিছু আলোচনা করলো দিয়ে ঠিক হলো কালকেই গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে সেটল হয়ে যাবে ওখানে। কিন্তু কে জানে অনুর ওখানে ওই বাড়িতেই কাজের জন্য সেটল হওয়াটা হয়তো ওকে সারাজীবনএর জন্য ওখানে ওকে সেটল করে দিতে পারে।