দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - অধ্যায় ৩৬

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74058-post-6270849.html#pid6270849

🕰️ Posted on July 23, 2026 by ✍️ Orbachin (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 2364 words / 11 min read

Parent
৩৬। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি হোয়াটসঅ্যাপে আনিকার সাথে চ্যাট করছিলাম। আমি: "শুভ সকাল। ঘুম ভাঙল?" আনিকা: "হ্যাঁ, একটু আগে উঠলাম। তুমি অফিসে?" আমি: "জি ম্যাডাম। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে পড়ে আছি। আচ্ছা আনিকা, গতকাল শাহবাগে তুমি একটা কথা বলেছিলে। মনে আছে?" আনিকা: "কোন কথাটা? আমি তো কাল অনেক কথাই বলেছি। রাগের মাথায় কত কিছুই তো বকেছি।" আমি: "তুমি বলেছিলে, বেলাল সাহেব এসব আগে শুরু করেছিলেন। তুমি উনার তুলনায় কমই করেছ। এই কথাটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। কী শুরু করেছিলেন বেলাল সাহেব? উনার দিক থেকে কী এমন হয়েছিল?"   মেসেজটা পাঠানোর পর আমি দেখলাম আনিকা টাইপিং করছেন। তারপর আবার থেমে গেলেন। আবার টাইপিং। প্রায় দুই মিনিট পর উনার মেসেজ এল।   আনিকা: "রাশেদ, আমি তোমাকে সব বলব। কিছুই লুকাব না। কিন্তু, আমাকে একটু সময় দাও। এই মুহূর্তে আমি মেন্টালি খুব ট্রমাটাইজড আর কনফিউজড একটা অবস্থার মধ্যে আছি। একদিকে বেলালের নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা, আরেকদিকে আমার নিজের ভেতরের কিছু জমা কষ্ট। আমি নিজে আগে একটু ধাতস্থ হই। আমার ব্রেনটাকে একটু শান্ত হতে দাও। আমি প্রমিজ করছি, আমি নিজে বসে তোমাকে বেলালের ওই দিকের সব সত্যি কথা খুলে বলব। জাস্ট গিভ মি সাম টাইম।"   আমি মেসেজটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মানুষের জীবনে এমন কিছু অন্ধকার দিক থাকে, যা সহজে কাউকে বলা যায় না। আমি আনিকাকে আর চাপ দিলাম না।   আমি লিখলাম: "ঠিক আছে। টেক ইওর টাইম। আমি ওয়েট করব।   আনিকা একটা হার্ট ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই দিলেন।   বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ করে আমি মিরপুরের মেসে ফিরলাম। মেসে ফিরে আমার মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারছিলাম, ঢাকা শহরের এই বদ্ধ পরিবেশ, এই মেস, আর এই প্রতিদিনের রুটিন আমার স্নায়ুর ওপর একটা মারাত্মক চাপ ফেলছে। গত এক মাসের এই বিশাল মানসিক রোলারকোস্টার, আনিকার সাথে সেই উদ্দাম দিনগুলো, বেলালের নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের থানা— সবকিছু মিলিয়ে আমার ব্রেন এখন ওভারলোডেড হয়ে গেছে।   আমার একটু বিশ্রাম দরকার। একটু শান্তি দরকার। আমার মনে হলো, আমি যদি এখন কয়েকটা দিন নওগাঁয় আমার গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকি, তাহলে হয়তো আমি এই মানসিক অবসাদ থেকে একটু মুক্তি পাব। গ্রামের সেই খোলা বাতাস, মায়ের হাতের রান্না, আর বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়— এগুলো ছাড়া আমাকে এখন আর কেউ শান্ত করতে পারবে না। কিন্তু আমি কি এখন ঢাকা ছেড়ে যেতে পারব? পুলিশের কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না, সেটা জানা দরকার। আমি মোবাইলটা বের করে এসআই তৌহিদের সেই পার্সোনাল নাম্বারে কল দিলাম।   "হ্যালো? তৌহিদ ভাই বলছেন?" "জি বলছি। কে বলছেন?" ওপাশ থেকে উনার ভদ্র গলা ভেসে এল। "ভাই, আমি রাশেদ। ওই যে, ঢাকা পেপারসের সাংবাদিক। গতকাল আপনার সাথে কলাবাগান থানায় কথা হলো।" "হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। বলুন, কী খবর? আনিকা ম্যাডামের ফ্ল্যাটের কিছু কি মনে পড়ল?" "না ভাই, সেরকম কিছু না," আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম। "আসলে ভাই, আমি একটু গ্রামের বাড়িতে যেতে চাচ্ছিলাম। আমার বাবা-মা নওগাঁয় থাকে। গত কয়েকদিনের অফিসের প্রেসার আর এই থানার ঝামেলার কারণে মেন্টালি খুব আপসেট হয়ে আছি। তো ভাবলাম, দুই-চার দিনের জন্য একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসি। আপনাদের পুলিশের দিক থেকে কি কোনো বিধিনিষেধ আছে? মানে, আমি তো ওই জিডির একটা রেফারেন্স..."   এসআই তৌহিদ ওপাশ থেকে হেসে উঠলেন। "আরে না না ভাই! আপনি তো কোনো সাসপেক্ট না বা কোনো অ্যারেস্টেড পার্সন না যে আপনাকে শহর ছাড়তে বারণ করব। আপনি তো জাস্ট একজন উইটনেস বা গেস্ট ছিলেন। আপনার যেখানে খুশি যেতে পারেন। কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। তবে হ্যাঁ, আপনার ফোন নাম্বারটা তো আমাদের কাছে আছেই। যদি কখনো কোনো ইনফরমেশনের জন্য কল দিই, তাহলে একটু রিসিভ করবেন। এইটুকুই।"   আমার বুকের ভেতর থেকে যেন এক মণ ওজনের একটা বোঝা নেমে গেল। "অনেক ধন্যবাদ তৌহিদ ভাই। আমি অবশ্যই ফোন খোলা রাখব।"   ফোন রেখে আমি আমার ল্যাপটপটা ওপেন করলাম। এখন সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে হবে। এহসান ভাইয়ের কাছ থেকে ছুটি আদায় করা। কয়েকদিন আগেই আমি আনিকার সাথে সময় কাটানোর জন্য ৭-৮ দিনের একটা লম্বা ছুটি নিয়েছি। কর্পোরেট অফিসে, বিশেষ করে নিউজ ডেস্কে, এক মাসে দুইবার লম্বা ছুটি চাওয়াটা রীতিমতো একটা ক্যাপিটাল ক্রাইম। এহসান ভাই হয়তো আমার মেইল দেখেই আমাকে চাকরি থেকে টার্মিনেট করার হুমকি দেবেন।   কিন্তু আমার তো উপায় নেই। আমাকে যেতেই হবে। আমি মেইল অপশন ওপেন করে কম্পোজ করতে বসলাম।   আমি জানি, বাঙালি বসদের ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল না করলে ছুটি পাওয়া যায় না। তাই আমি একটা খুব ইমোশনাল, প্রফেশনাল এবং একই সাথে অসহায়ত্বে ভরপুর একটা মেইল ড্রাফট করতে শুরু করলাম।   এহসান ভাই, আমি খুব চরম একটা মানসিক এবং শারীরিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যে কারণে বাধ্য হয়ে আমাকে এই মেইলটা লিখতে হচ্ছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে আমি ব্যক্তিগত জীবনে কিছু অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছি (যেটা আমি আপনাকে মৌখিকভাবে কিছুটা বুঝিয়েছিলাম)। এর পাশাপাশি অফিসের টানা শিফট এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের প্রেসার— সবকিছু মিলিয়ে আমি বর্তমানে সিভিয়ার মেন্টাল ব্রেকডাউন (Severe Mental Breakdown) ফেস করছি। আমার পক্ষে এখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।   আমি জানি, কিছুদিন আগেই আমি আমার পাওনা ছুটি থেকে ৭-৮ দিনের একটা লিভ কাটিয়েছি। একটা নিউজ ডেস্কে কাজ করে, মাসের মধ্যে এভাবে আবারও ছুটি চাওয়াটা চরম অন্যায় এবং অপেশাদারিত্ব। আমি এটা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করছি। কিন্তু ভাই, আমি আক্ষরিক অর্থেই নিরুপায়।   আমার এখন কয়েকটা দিনের জন্য আমার পরিবারের কাছে, আমার গ্রামের বাড়ি নওগাঁয় যাওয়াটা খুব জরুরি। আমি জানি, বাবা-মায়ের কাছে গেলে, একটু মানসিক শান্তি পেলে আমি হয়তো আবার আমার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারব। আমি যদি এই মুহূর্তে এই ব্রেকটা না নিই, তাহলে হয়তো আমি ডিপ্রেশনে চলে যাব, যা আমার কাজের ওপর আরও বেশি খারাপ প্রভাব ফেলবে।   আমাকে আগামী এক সপ্তাহের জন্য (আগামীকাল থেকে) ছুটি মঞ্জুর করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। যেহেতু আমার ক্যাজুয়াল লিভ হয়তো শেষ, তাই এইচআর ডিপার্টমেন্ট যদি মনে করে, তবে এই ছুটির দিনগুলোর জন্য আমার বেতন থেকে 'লিভ উইদাউট পে' (LWP) হিসেবে টাকা কেটে নিতে পারে। আমি তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি করব না। আমার কাছে এখন টাকার চেয়ে আমার মানসিক সুস্থতাটা বেশি প্রয়োজন।   আমি আশা করি, আমার এই মানবিক এবং অসহায় পরিস্থিতিটা আপনারা একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমাকে এই ছুটিটুকু দিয়ে আমার জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেবেন।   সিন্-সিয়ার্লি, রাশেদ আহমদ (সাব-এডিটর)   আমি মেইলটা একবার রিডিং পড়লাম।  চালাকি করে এইচআর এবং এডিটরকে সিসি (CC) করে দিয়েছি, যাতে এহসান ভাই একা আমাকে আটকে না রাখতে পারেন। এইচআর দেখবে যে একটা ছেলে বিনা বেতনে (LWP) ছুটি নিতে চাচ্ছে তার মানসিক অবস্থার কারণে, তারা নিশ্চয়ই সেটা আটকাতে যাবে না। আমি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে 'Send' বাটনে ক্লিক করলাম। মেইলটা চলে গেল। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিলাম। ঘরের লাইটটা নিভিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।   বাইরে মিরপুরের রাস্তায় তখন রাতের কোলাহল কমতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। আমার মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই চিন্তা— আগামী কয়েকটা দিন আমি আমার মায়ের হাতের রান্না খাব, বাবার সাথে চা খাব, আর আনিকা নাওহারের এই পুরো আখ্যানটা থেকে নিজেকে একটু ডিটক্স করব। আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম। আমার জীবনটা এখন একটা ট্রানজিট পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অজানা সব বিস্ময় আর আতঙ্ক। মানুষ যখন কোনো চরম মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যায়, তখন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে তার শেকড়। ঢাকা শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গল, কারওয়ান বাজারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস, কিংবা ধানমন্ডির ষোলো তলা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট— এসব কিছুই তখন আর শান্তি দিতে পারে না। তখন মনে পড়ে মায়ের হাতের গন্ধ, বাবার চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, আর গ্রামের বাড়ির উঠোনের ধুলোমাখা বাতাসের কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমি বাড়ি যাব। আমার মস্তিষ্ক এখন একটা হ্যাং হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের মতো আচরণ করছে। একে রিস্টার্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিছানায় বসেই আমি আনিকার সেই 'ঘোস্ট' নাম্বারে ডায়াল করলাম।  "হ্যালো," ওপাশ থেকে আনিকার ঘুম-জড়ানো, রেশমি গলা ভেসে এল। "শুভ সকাল। আমি তোমাকে ঘুম থেকে তুলে দিলাম নাকি?" আমি নরম গলায় বললাম। "না, জেগেই ছিলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিং দেখছিলাম। বলো, কী খবর তোমার?" "খবর খুব একটা ভালো না আনিকা। আমি কয়েকদিনের জন্য ঢাকা ছাড়ছি। ১০-১৫ দিনের জন্য আমি নওগাঁ যাচ্ছি, আমার গ্রামের বাড়িতে।" কথাটা শোনার পর ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। আমি বুঝতে পারছিলাম আনিকা কথাটা হজম করার চেষ্টা করছেন। "হঠাৎ গ্রামের বাড়ি?" আনিকার গলায় এবার একটা স্পষ্ট বিস্ময় আর চাপা অভিমান। "আমাকে কিছু না বলেই এমন একটা ডিসিশন নিয়ে নিলে?" "আমার আর কোনো উপায় ছিল না আনিকা," আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম। "গত এক মাসের এই মানসিক রোলারকোস্টার, তোমার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা, আমার ভেতরের এই অপরাধবোধ আর আতঙ্ক— সবকিছু মিলিয়ে আমার মেন্টাল ব্রেকডাউন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি যদি এখন কয়েকটা দিন ঢাকা থেকে দূরে, আমার বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে একটু শান্তিতে না থাকি, আমি হয়তো সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাব। আমার এই যান্ত্রিক শহরটাকে এখন একটা দমবন্ধ করা গ্যাস চেম্বার বলে মনে হচ্ছে।" আনিকা আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনলেন। কোনো বাধা দিলেন না। কিছুক্ষণ পর উনার গলা থেকে একটা গভীর, উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। "যাও," আনিকা খুব শান্ত, মায়াবী গলায় বললেন। "কবে যাচ্ছ?" "আজ রাতেই। বাসের টিকিট কাটব একটু পরে।" "রাশেদ..." আনিকা হঠাৎ গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন। উনার কণ্ঠে এখন একটা অদ্ভুত, শিশুলভ হাহাকার। "তোমার সাথে যদি আমি যেতে পারতাম! যদি সবকিছু ফেলে তোমার হাত ধরে ওই গ্রামে চলে যেতে পারতাম, হয়তো আমি একটু শান্তি পেতাম। এই আইটি ফার্ম, এই বিশাল ফ্ল্যাট, পুলিশের জেরা, এই নোংরা সমাজ— সবকিছু থেকে পালিয়ে ওই সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতাম। একটা মাটির ঘরে থাকতাম, তুমি বাজার থেকে চাল-ডাল নিয়ে আসতে, আমি হয়তো চুলার ধোঁয়ায় চোখ লাল করে তোমার জন্য রাঁধতাম... খুব সহজ, সাধারণ একটা জীবন! কিছুক্ষণের জন্য হলেও হয়তো একটা স্বর্গীয় সুখ হতো।" আমি আনিকার কথাগুলো শুনছিলাম আর মনে মনে হাসছিলাম। উচ্চবিত্ত, বিলাসী নারীদের এই এক অদ্ভুত রোমান্টিসিজম! তারা এসি রুমে, শ্যানেল পারফিউম মেখে, কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে মাটির ঘর আর চুলার ধোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। তারা জানে না, চুলার ধোঁয়ায় চোখ লাল হওয়াটা কোনো রোমান্স নয়, ওটা একটা চরম শ্বাসকষ্টকর দারিদ্র্য। গ্রামে এক রাত কারেন্ট না থাকলে, আর মশার কামড় খেলে তাদের এই 'সবুজ আর সহজ জীবনের' রোমান্স জানালা দিয়ে পালাবে। কিন্তু এসব রূঢ় বাস্তবতা বলে আমি উনার ফ্যান্টাসিটা নষ্ট করলাম না। "কী আর করার আনিকা," আমি খুব দরদ দিয়ে বললাম। "এই অবস্থায় তো তোমার যাওয়া সম্ভব না। পুলিশ তোমাকে ঢাকা ছাড়তে দেবে না। তুমি এখানেই থাকো। আমি দশ-পনেরো দিন একটু ঘুরে, মাথাটা ঠান্ডা করে আসি। তারপর তো আবার এই ঢাকাতেই ফিরতে হবে।" "হুম। সাবধানে থেকো। আর আমার সাথে যোগাযোগ রেখো কিন্তু। আমাকে ভুলে যেও না," আনিকার গলায় একটা নির্ভরতার সুর। "ভুলব না। রাখছি এখন। অফিসে যেতে হবে।" ফোন রেখে আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম।   সকাল সাড়ে দশটায় আমি কারওয়ান বাজারের অফিসে ঢুকলাম। আমার বুকের ভেতর একটু ধুকপুকানি। গত রাতে এহসান ভাই, এইচআর আর এডিটরকে সিসি করে যে ইমোশনাল মেইলটা দিয়েছিলাম, তার ফল কী হবে সেটা জানার অপেক্ষায় আছি। ডেস্কে বসে ল্যাপটপটা সবে অন করেছি, এমন সময় আমাদের অফিসের পিয়ন মোতালেব এসে আমার সামনে দাঁড়াল। "রাশেদ ভাই, আপনেরে এডিটর স্যার উনার রুমে ডাকতাছে।" এডিটর স্যারের রুম! সাংবাদিকতার লাইনে এডিটর বা সম্পাদকের রুমে ডাক পড়া মানেই হলো দুটো জিনিস— হয় আপনার প্রমোশন হচ্ছে, নয়তো আপনার চাকরি যাচ্ছে। আমার বর্তমান যে অবস্থা, তাতে প্রমোশনের সম্ভাবনা শূন্যের নিচে। আমি ঢোঁক গিলে এডিটর স্যারের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম, এডিটর স্যার উনার বিশাল চামড়ার রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। উনার ঠিক সামনের একটা চেয়ারে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বসে আছেন এহসান ভাই। ঘরের তাপমাত্রা সম্ভবত আঠারো ডিগ্রিতে নামানো, কনকনে ঠান্ডা। "আসসালামু আলাইকুম স্যার। আসতে পারি?" আমি খুব বিনীত গলায় বললাম। "এসো রাশেদ, বোসো," এডিটর স্যার উনার চশমাটা একটু ঠিক করে বললেন। উনার সামনে আমার সেই মেইলের একটা প্রিন্টআউট রাখা। আমি এহসান ভাইয়ের পাশের খালি চেয়ারটায় আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। "রাশেদ," এডিটর স্যার খুব শান্ত, ভারিক্কি গলায় শুরু করলেন, "আমরা তোমার মেইলটা পড়লাম। তুমি লিখেছ তুমি সিভিয়ার মেন্টাল ব্রেকডাউনের মধ্যে আছো। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি আছে। আচ্ছা, তুমি কি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছ? যদি ফ্র্যাঙ্কলি বলো, তাহলে আমরা সেই অনুযায়ী পেপারওয়ার্ক রেডি করি।" আমি রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। চাকরি ছেড়ে দেওয়া! আমি তো জাস্ট কয়েকটা দিনের ছুটি চেয়েছি! "না না স্যার!" আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে বললাম। "আমি চাকরি ছাড়তে যাব কেন? এই ঢাকা পেপারস তো আমার পরিবারের মতো। আমি জাস্ট দশ-পনেরো দিনের একটা ব্রেক চাচ্ছিলাম। আমার মানসিক অবস্থাটা আসলেই খুব খারাপ স্যার। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাতে পারছি না। একটু গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের সাথে থাকলে আমি আবার পুরো এনার্জি নিয়ে ফিরে আসতে পারব।" এহসান ভাই এবার মুখ খুললেন। "কিন্তু রাশেদ, তুমি তো কয়েকদিন আগেই আট দিনের একটা লিভ কাটালে। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে এখন কাজের যা প্রেসার, তুমি এভাবে হুটহাট দশ-পনেরো দিনের জন্য উধাও হয়ে গেলে আমরা ডেস্ক চালাব কীভাবে? এটা তো কোনো প্রফেশনালিজম হতে পারে না।" "আমি জানি এহসান ভাই। আমার এটা চাওয়াটা একদমই অন্যায় হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তো কখনো কখনো পরিস্থিতির কাছে নিরুপায় হয়ে যায়। আপনারা চাইলে আমার এই ছুটির দিনগুলোর বেতন কেটে নিতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই," আমি আমার সবচেয়ে করুণ চেহারাটা সামনে আনলাম। এডিটর স্যার কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কর্পোরেট বসরা মানুষের সাইকোলজি খুব ভালো বোঝেন। উনি হয়তো বুঝতে পারলেন যে, এই ছেলেকে জোর করে ডেস্কে বসিয়ে রাখলে সে নিউজ করার চেয়ে নিউজে ভুল করবে বেশি। "শোনো রাশেদ," এডিটর স্যার উনার হাত দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করে বললেন, "আমরা আমাদের কর্মীদের মেন্টাল হেলথকে ভ্যালু দিই। তুমি যখন বলছ তুমি কাজ করার মতো অবস্থায় নেই, তখন আমরা তোমাকে জোর করব না। কিন্তু দশ-পনেরো দিন বলে কোনো রুলস নেই। তুমি যেহেতু লিভ উইদাউট পে (LWP) নিতে রাজি আছো, আমি তোমাকে পুরো এক মাসের আনপেইড লিভ গ্রান্ট করছি।" "এক মাস!" আমি এবং এহসান ভাই দুজনেই একসাথে চমকে উঠলাম। "হ্যাঁ, এক মাস," এডিটর স্যার এহসান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এহসান, তুমি এই এক মাসের জন্য অন্য ডেস্ক থেকে একজন সাব-এডিটরকে টেম্পোরারি তোমার ডেস্কে নিয়ে নাও। আর রাশেদ, তুমি এক মাস পুরোপুরি অফিশিয়াল কাজ থেকে দূরে থাকো। গ্রামে যাও, রেস্ট নাও, মাথা ঠান্ডা করো। ঠিক এক মাস পর তুমি আবার তোমার ডেস্কে জয়েন করবে। আর যদি এক মাসের মধ্যে তুমি না ফেরো, তবে আমরা ধরে নেব তুমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছ। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?" আমার মনের ভেতর একই সাথে একটা আনন্দ আর বিষাদের সুর বাজল। এক মাসের ছুটি! এক মাস আমাকে কিম জং উন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ দেখতে হবে না! কিন্তু এক মাসের বেতন কাটা যাবে, মানে পঁচিশ হাজার টাকার একটা বিশাল ধাক্কা। তবে আমার সেভিংসের টাকায় আপাতত চলে যাবে। আমার এখন টাকার চেয়ে মানসিক মুক্তিটা বেশি প্রয়োজন। "জি স্যার। আমি এক মাস পর অবশ্যই জয়েন করব। অনেক ধন্যবাদ স্যার," আমি মাথা নিচু করে সম্মতি দিলাম। অফিস থেকে বেরিয়ে আমি পান্থপথে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে গেলাম। রাত সাড়ে দশটার নওগাঁর একটা এসি বাসের টিকিট কাটলাম। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে।  আমি মেসে ফিরে আমার একটা ছোট ট্রাভেল ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আর দরকারি জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম, এমন সময় আনিকার ফোন এল। "রাশেদ, তোমার বাস কয়টায়?" "রাত সাড়ে দশটায়। পান্থপথ থেকে।" "এখন তো মাত্র ছ'টা বাজে। তুমি যাওয়ার আগে আমার সাথে একটু দেখা করে যাবে না?" আনিকার গলায় একটা মিষ্টি, আকুল আবেদন। আমিও চাচ্ছিলাম উনাকে একবার দেখে যেতে। আগামী এক মাস তো উনার এই শরীর, এই সুবাস থেকে আমাকে দূরে থাকতে হবে।  "অবশ্যই দেখা করব। কিন্তু কোথায়? আমি তো পান্থপথের দিকে আসব, তুমি ধানমন্ডিতে আছো। মাঝামাঝি কোথাও বসা যায়?" "রবীন্দ্র সরোবরে চলে এসো," আনিকা বললেন। "আমি ওখানে থাকব। ওখান থেকে তুমি ইজিলি পান্থপথে চলে যেতে পারবে।"
Parent