দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - অধ্যায় ৩৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74058-post-6273017.html#pid6273017

🕰️ Posted on July 26, 2026 by ✍️ Orbachin (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 2046 words / 9 min read

Parent
৩৯। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ঢাকা শহরের এই একটা জায়গায় এলে আমার সবসময় মনে হয়, আমি যেন টাইম মেশিনে চড়ে কয়েক শতাব্দী পেছনের কোনো এক ব্যস্ত, কোলাহলময় এবং ধুলোমাখা বন্দরে এসে উপস্থিত হয়েছি। বাতাসে ডিজেল পোড়া উৎকট গন্ধ, বুড়িগঙ্গার কালো পানির স্যাঁতস্যাঁতে আঁশটে ঘ্রাণ, কুলিদের হাঁকডাক, আর হাজার হাজার মানুষের গাদাগাদি ভিড়। এখানে সবাই দৌড়াচ্ছে, সবারই যেন চরম তাড়া। এই কোলাহলের ভেতরে দাঁড়ালে মানুষের নিজের অস্তিত্বটাকে খুব তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র মনে হয়। আমি ভিড় ঠেলে এমভি সুন্দরবন লঞ্চের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘড়িতে তখন রাত দশটা বাজে। কাউন্টারে বসা লোকটার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পানের পিকে দাঁত লাল হয়ে আছে, আর কপালের ওপর দিয়ে একটা বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। সারাদিন হাজার হাজার মানুষের নানা রকম আবদার শুনতে শুনতে এই লোকগুলোর ইমোশন বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। "ভাই, একটা ডিলাক্স সুইট লাগবে। ভিআইপি কেবিন," আমি গলাটা একটু চড়িয়ে বললাম, যাতে মাইকের আওয়াজ আর কোলাহলের ভেতর দিয়ে আমার কথা উনার কান পর্যন্ত পৌঁছায়। লোকটা এক সেকেন্ডের জন্য আমার দিকে তাকাল। আমার পরনে ক্যাজুয়াল শার্ট আর জিন্স। আমাকে দেখে খুব একটা ভিআইপি মনে হওয়ার কথা না, কিন্তু কাউন্টারের লোকজনের চোখ টাকার গন্ধ ঠিকই চেনে। "কয়জন যাবেন?" লোকটা একটা টিকিট বই টেনে নিয়ে রসহীন গলায় জিজ্ঞেস করল। "আমি আর আমার বড় বোন," আমি খুব স্বাভাবিক, অত্যন্ত নির্লিপ্ত একটা মুখ করে মিথ্যা কথাটা বলে দিলাম। বাংলাদেশে যেকোনো জায়গায় একজন নারী আর একজন পুরুষ একসাথে গেলে, তাদের সম্পর্ক যদি স্বামী-স্ত্রী না হয়, তবে ‘ভাই-বোন’ হলো সবচেয়ে নিরাপদ এবং সর্বজনীন একটা রক্ষাকবচ। লোকটা কলমের মুখ খুলে টিকিটে কিছু একটা লিখতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল। "ভাই-বোন যাইবেন? তাইলে দুইটা সিঙ্গেল বেডের সুইট দিয়া দিই? আমাগো ডিলাক্স টুইন বেডের কেবিন আছে, খুব ভিআইপি। ভাই-বোন আরামে ঘুমাইতে পারবেন," লোকটা খুব হেল্পফুল একটা চেহারা করে প্রস্তাব দিল। আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। টুইন বেড! দুইটা আলাদা বিছানা! আনিকা নাওহারের মতো একজন অপ্সরী নারীকে নিয়ে আমি মাঝনদীতে ভাসব, আর আমরা দুজন দুই বিছানায় ঘুমাব? এর চেয়ে তো আমার ওই মিরপুরের মেসে গিয়ে তুহিনের সাথে ঘুমানো ভালো ছিল! "না ভাই, টুইন বেড লাগবে না," আমি খুব দ্রুত, কিন্তু একটু বেশিই সিরিয়াস গলায় বললাম। "আপনি আমাকে একটা ডাবল বেডের সুইটই দেন। একটাই বিশাল বিছানা থাকবে, এমন কেবিন দেন।" কথাটা শোনার পর কাউন্টারের লোকটার কলম থেমে গেল। সে তার পান-খাওয়া লাল দাঁতগুলো বের করা বন্ধ করে, চোখ জোড়া সরু করে আমার দিকে তাকাল। উনার দৃষ্টিতে এমন একটা অদ্ভুত, সন্দেহজনক এবং ‘সব বুঝি ব্যাটা’ টাইপের একটা লুক ছিল, যা দেখলে যেকোনো সাধারণ মানুষের ঘাম ছুটে যাওয়ার কথা। ভাই-বোন একসাথে যাবে, অথচ ডাবল বেডের একটা বিছানাতেই থাকবে— এই লজিকটা পৃথিবীর কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হজম করবে না, আর সদরঘাটের কাউন্টারের পাকা লোক তো নয়ই! আমি বুঝতে পারলাম, আমি একটা লজিক্যাল গর্তে পা দিয়ে ফেলেছি। এটাকে এখনই সামাল দিতে হবে। "আরে ভাই, সমস্যা তো বিছানা নিয়ে না!" আমি আমার অনুবাদক মস্তিষ্কের সমস্ত ক্রিয়েটিভিটি কাজে লাগিয়ে খুব ক্যাজুয়াল একটা হাসি দিয়ে বললাম। "আমার বড় বোন একটু অসুস্থ, সে সুইটের ওই ডাবল বেডে আরাম করে সারা রাত ঘুমাবে। আমি তো আর কেবিনের ভেতর থাকব না! আমি সারা রাত লঞ্চের ডেকে ঘুরে বেড়াব। নদীর বাতাস খাব, আকাশের তারা দেখব। আমার তো আর বিছানা লাগবে না। আপনি ডাবল বেডের সুইটটাই দেন, যাতে আমার বোনের ঘুমাতে কোনো কষ্ট না হয়।" আমার এই অকাট্য, আত্মত্যাগী এবং চরম কাব্যিক যুক্তি শুনে কাউন্টারের লোকটার চোখের সেই অদ্ভুত দৃষ্টিটা গেল না। সে হয়তো মনে মনে ভাবল, ‘শালা, ঢাকা শহরের মানুষগুলোর ভেতরে ভেতরে এত ফিকির! নদীর বাতাস খাবে না ছাই খাবে, সেটা তো কেবিনের দরজা বন্ধ হলেই বোঝা যাবে।’ কিন্তু লঞ্চের কাউন্টারের লোকজনের একটা ভালো গুণ হলো, তারা টাকার বিনিময়ে টিকিট বেচে, নীতিবাক্য বেচে না। আপনি আপনার বোনের সাথে ডাবল বেডে ঘুমান নাকি নদীর বাতাস খান, তাতে তাদের কোম্পানির কোনো লোকসান নেই। "আইচ্ছা ভাই, যা ভালো বোঝেন। এই নেন, তিন তলার ডাবল বেডের ভিআইপি সুইট," লোকটা টিকিটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি টাকা মিটিয়ে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক, প্রথম ধাপ পার হওয়া গেল। লঞ্চ ছাড়বে রাত বারোটায়। এখন বাজে ঠিক দশটা। আরও পাক্কা দুই ঘণ্টার অপেক্ষা। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে আনিকার সেই বেনামি নাম্বারে ডায়াল করলাম। "হ্যালো, আনিকা? আমি কিন্তু লঞ্চের টিকিট কেটে ফেলেছি। তুমি কোথায়?" "এই তো রাশেদ, আমি বের হয়ে গেছি। উবারে উঠেছি জাস্ট। রাস্তা তো অনেকটা ফাঁকা এখন। আমি আধা ঘণ্টার মধ্যেই সদরঘাট পৌঁছে যাব," আনিকা খুব শান্ত গলায় বললেন। "ঠিক আছে, তুমি সাবধানে এসো। আমি মেইন টার্মিনালের গেটের কাছেই আছি।" ফোন রেখে আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেটটা বের করলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে টার্মিনালের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আধা ঘণ্টা! নারীদের ডিকশনারিতে 'আধা ঘণ্টা' শব্দটার কোনো নির্দিষ্ট আভিধানিক অর্থ নেই। এটা একটা আপেক্ষিক সময়। এই আধা ঘণ্টা মানে চল্লিশ মিনিট হতে পারে, এক ঘণ্টাও হতে পারে। আনিকার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আমি টার্মিনালে দাঁড়িয়ে একটা, দুটো, তিনটে করে সিগারেট শেষ করলাম। চারপাশের কোলাহল দেখছি। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি, কুলিদের মাথায় বিশাল বিশাল মালের বস্তা। লঞ্চের সাইরেনের শব্দে মাঝেমধ্যেই কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ঠিক এগারোটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে আমার ফোন বেজে উঠল। "রাশেদ, আমি টার্মিনালের মেইন গেটের একটু আগে জ্যামে আটকে আছি। তুমি একটু এদিকে এগিয়ে আসবে?" আমি ভিড় ঠেলে দ্রুত গেটের দিকে এগোলাম। গেটের বাইরে উবারের একটা সাদা গাড়ি থেকে আনিকা নাওহার নামলেন। উনাকে রিসিভ করতে গিয়ে আমি আক্ষরিক অর্থেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য রাস্তার মাঝখানে পাথরের মতো জমে গেলাম। আমি উনাকে বলেছিলাম, একদম সাধারণ, ক্যাজুয়াল একটা বাঙালি পোশাক পরে আসতে। কোনো মেকআপ বা ভারী গয়না ছাড়া। উনি আমার কথা রেখেছেন। কিন্তু এই 'সাধারণ' পোশাকের ভেতরেও যে একজন নারী এতটা ভয়ংকর, এতটা লাস্যময়ী এবং এতটা ঐশ্বরিক রূপ ধারণ করতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আনিকার পরনে আজ একটা কুচকুচে কালো রঙের সুতির কামিজ। কামিজটা খুব একটা লম্বা নয়, ঠিক হাঁটু অব্দি এসে শেষ হয়েছে। আর তার নিচে একটা ধবধবে সাদা রঙের পালাজ্জো বা সালোয়ার। কামিজের হাতা থ্রি-কোয়ার্টার। উনার ফর্সা, মসৃণ গলার ওপর দিয়ে একটা সাদা রঙের সুতির ওড়না খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে মাথার ওপর দিয়ে পেঁচানো। চোখের ওপর একটা কালো ফ্রেমের চশমা, যেটা উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত, বুদ্ধিবৃত্তিক অথচ চরম দুষ্টু একটা লুক এনে দিয়েছে। মাথায় ওড়না থাকা সত্ত্বেও উনার সেই ঘন, কালো, অবাধ্য চুলগুলোকে আটকে রাখা যায়নি। চুলগুলো ওড়নার ফাঁক দিয়ে পাহাড়ের চূড়ার মতো উঁকি দিচ্ছে, আর কিছু চুল ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনের দিকে লুটিয়ে পড়েছে। আমি মুগ্ধ, তৃষ্ণার্ত এবং বন্য এক দৃষ্টি নিয়ে উনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করতে লাগলাম। এই সাধারণ কালো কামিজটা উনার শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির কোনো কিছুই আর গোপন নেই। উনার ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল কালো কাপড়ের বাঁধন ছিঁড়ে যেন বিদ্রোহ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওড়নাটা উনার বুকের ওপর দিয়ে গেলেও, সেই স্ফীতিকে লুকানোর ক্ষমতা ওই পাতলা কাপড়ের ছিল না। উনার মুখটা আজ একদম ফ্রেশ। কোনো মেকআপ নেই। কিন্তু ওই মেকআপহীন ফর্সা ত্বক, চশমার কাঁচের পেছন থেকে উঁকি দেওয়া ওই মায়াবী বাদামি চোখ, আর ন্যাচারাল লালচে ঠোঁট দুটো আমাকে যেন চুম্বকের মতো টানছিল। উনার সরু কোমর থেকে শুরু করে নিতম্বের সেই অবিশ্বাস্য ঢালটা কালো কামিজের নিচে একটা নিখুঁত ঢেউয়ের মতো নেমে গেছে। আর সাদা রঙের সালোয়ারটা উনার ভরাট, সুডৌল উরু এবং পা গুলোকে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত উনার প্রতিটি মুভমেন্ট আমার বুকের ভেতর একটা করে হাতুড়ির বাড়ি মারছিল। সদরঘাটের এই ধুলোমাখা, ঘামে ভেজা, বিশৃঙ্খল পরিবেশের মাঝখানে আনিকা নাওহারকে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক ভিনগ্রহের অপ্সরী ভুল করে এই মর্ত্যে নেমে এসেছে। "কী দেখছ অমন করে?" আনিকা আমার কাছে এসে উনার সেই ঘাতক হাসিটা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন। আমি একটা বড়সড় ঢোঁক গিলে বললাম, "দেখছি, সাধারণ পোশাকে একটা মানুষ কতটা অসাধারণ হতে পারে। তোমাকে তো এখন আর লন্ডন প্রবাসী সিইও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ঢাকা ভার্সিটির কোনো এক মিষ্টি, দুষ্টু ছাত্রী।" আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "তাই নাকি? চলো, তোমার ওই মিষ্টি ছাত্রীকে নিয়ে এখন লঞ্চে চলো।" রাত এগারোটা বেজে গেছে। এই সময়টা লঞ্চগুলোতে যাত্রী ওঠার সবচেয়ে পিক আওয়ার। চারদিকে প্রচণ্ড ভিড়। মানুষজন তাদের মালপত্র, বাক্স-পেটরা নিয়ে ঠেলাঠেলি করে লঞ্চে উঠছে। আমি আনিকার একটা হাত শক্ত করে ধরে ভিড় ঠেলে এমভি সুন্দরবন-এর দিকে এগোতে লাগলাম। এত মানুষের ভিড়ে কেউ আলাদা করে আমাদের দিকে খেয়াল করছে না। সবারই নিজের মালপত্র আর কেবিন খোঁজার তাড়া। কিন্তু যদি কেউ এক মুহূর্তের জন্য থেমে আমাদের দিকে তাকাত, তাহলে সে হয়তো অবাক বিস্ময়ে দেখত যে, এই নোংরা কোলাহলের ভেতর দিয়ে কী অপূর্ব এক নারী তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমরা লঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে সোজা তিন তলায় উঠে গেলাম। তিন তলায় মূলত ভিআইপি এবং ডিলাক্স সুইটগুলো অবস্থিত। আমাদের সুইটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা প্রশান্তির হাওয়া আমাদের গায়ে এসে লাগল। সুইটটা বেশ বড়। মাঝখানে একটা বিশাল ডাবল বেড, সাদা ধবধবে চাদর বিছানো। একপাশে একটা সোফা, একটা ছোট কফি টেবিল। অ্যাটাচড বাথরুম, আর একটা বিশাল কাঁচের জানালা, যেখান থেকে বাইরের নদী আর আকাশ দেখা যায়। এসি আগে থেকেই চলছিল, তাই ভেতরের পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা আর আরামদায়ক। আনিকা ভেতরে ঢুকেই একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার মাথার ওড়নাটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেললেন। উনার চুলগুলো মুক্ত হয়ে উনার পিঠের ওপর আছড়ে পড়ল। আমি দরজার লকটা ভেতর থেকে আটকে দিলাম। "তুমি বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নাও আনিকা," আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম। "আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। পুরো লঞ্চের সিচুয়েশনটা একটু দেখে আসি। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসব।" আনিকা উনার চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন, "ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু। আমাকে বেশিক্ষণ একা ফেলে রেখো না।" উনার কথার ভেতরে সেই চেনা, আদিম ইঙ্গিতটা খুব স্পষ্ট। আমি মুচকি হেসে সুইট থেকে বেরিয়ে এলাম। লঞ্চের ভেতরে ঘোরাঘুরি করাটা আমার একটা পুরোনো শখ। আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের সাব-এডিটর হলেও, দেশি খবরগুলো আমার চোখের সামনে দিয়েই যায়। বিশেষ করে এই এমভি সুন্দরবন-১৬ লঞ্চটা নিয়ে গত কয়েকদিন পত্রপত্রিকায় বেশ আলোচনা হচ্ছিল। আমি তিন তলার ডেক থেকে নিচে তাকালাম। লঞ্চের ভেতরে এক অদ্ভুত জৌলুস আর আভিজাত্য। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রী সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। বাসেই এখন খুব সহজে মানুষ বরিশাল চলে যায়। লঞ্চের ব্যবসায় চরম মন্দা যাচ্ছিল। এর ওপর দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পুরো নৌ-ব্যবসা একটা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। বড় বড় লঞ্চ মালিকরা তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, লঞ্চের যুগ হয়তো শেষ। কিন্তু এত ঝুঁকি, এত অনিশ্চয়তা আর হতাশার মধ্যেও বরিশাল-ঢাকা নৌপথে যুক্ত হয়েছে এই বিশাল দানব— সুন্দরবন-১৬। সাংবাদিক হিসেবে আমি খবর রাখি। গত বুধবার বিকেলেই এই লঞ্চটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ নিজে এই লঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। লঞ্চটির মালিকপক্ষ সেদিন বুক ফুলিয়ে দাবি করেছিল, এই লঞ্চে আধুনিক সাজসজ্জা, নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এমন সব ব্যবহার হয়েছে, যা এর আগে বাংলাদেশের কোনো লঞ্চে দেখা যায়নি। আমি তিন তলার ব্যালকনি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের বিশালত্বটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম। কী নেই এখানে! পুরো লঞ্চটা সম্পূর্ণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লঞ্চে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য রীতিমতো একটা করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) স্থাপন করা হয়েছে! ভাবা যায়? মাঝনদীতে ভাসমান একটা লঞ্চে সিসিইউ! আমি মনে মনে হাসলাম। আমার যদি আজ রাতে আনিকার ওই রূপ আর আদরের চোটে হার্ট অ্যাটাক হয়েও যায়, তাহলেও চিন্তার কিছু নেই। এই লঞ্চেই আমার চিকিৎসা হয়ে যাবে! ওঠানামার জন্য লঞ্চের ভেতরে সিঁড়ির পাশাপাশি ক্যাপসুল লিফটের ব্যবস্থা আছে। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটা ফ্লোরে, প্রতিটা কর্নারে বসানো আছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা। আছে শিশুদের জন্য বিনোদনের একটা বড় জোন বা প্লে-গ্রাউন্ড, বিশাল একটা ফুডকোর্ট যেখান থেকে কাবাব আর বিরিয়ানির গন্ধ ভেসে আসছে, একটা ফার্মেসি, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, এবং যাত্রীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের সুবিধা। সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক আবুল কালাম সাহেবের একটা ইন্টারভিউ আমি পড়েছিলাম। তিনি গর্ব করে বলেছিলেন,  তাঁর এই বাহন ৩৬০ ফুট লম্বা একটা ভাসমান শহর! লঞ্চটিতে লোয়ার ডেক আর আপার ডেকের বিশাল জায়গা তো আছেই, তার পাশাপাশি আড়াই শতাধিক প্রথম শ্রেণির কক্ষ (কেবিন), ৬টি অত্যন্ত বিলাসবহুল ভিআইপি সুইট এবং ১০টি সেমি-ভিআইপি কক্ষ আছে। এর মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৩৫০ জন। ১৩৫০ জন মানুষ নিয়ে এই বিশাল দানবটা বুড়িগঙ্গার কালো পানি চিরে কীর্তনখোলার দিকে ছুটে যাবে। আর এই ১৩৫০ জন মানুষের ভিড়ে, ৩ তলার ওই ভিআইপি সুইটটার ভেতরে আমরা দুজন মানুষ রচনা করব আমাদের নিজস্ব একটা স্বর্গ। লঞ্চের ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, নিচে কুলিরা এখনো মালপত্র তুলছে। লঞ্চের বিশাল সাইরেনটা বেজে উঠল। তার মানে রাত বারোটা বাজতে চলল। লঞ্চ ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে লঞ্চের নিওন আলোগুলো প্রতিফলিত হয়ে একটা অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য তৈরি করেছে। নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস আমার মুখে এসে লাগছে। আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। আমার বুকের ভেতরকার সেই অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা আবার নতুন করে ক্ষরিত হতে শুরু করেছে। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই ছবি ভাসছে— কালো কামিজ আর সাদা সালোয়ার পরা আনিকা নাওহার। ওই বন্ধ দরজার ওপাশে উনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। লঞ্চের ডেক থেকে ঘুরে আমি দ্রুত পায়ে তিন তলার ভিআইপি সুইটের দিকে ফিরে চললাম। লঞ্চের বিশাল ইঞ্জিনটা একটা গম্ভীর 'ভুমমমম...' শব্দ করে স্টার্ট নিয়েছে। পুরো লঞ্চটায় একটা হালকা, রোমাঞ্চকর কম্পন তৈরি হলো। আমার শরীরের ভেতরেও ঠিক একই রকম একটা কম্পন, একটা আদিম ইঞ্জিন স্টার্ট নিয়ে ফেলেছে। আমি সুইটের দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। দরজা খুললেই শুরু হবে এই ভাসমান শহরের বুকে আমার জীবনের সবচেয়ে বন্য, সবচেয়ে স্মরণীয় এবং সবচেয়ে দীর্ঘ একটা রাত।
Parent