মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ১৮
ত্রয়োদশ অধ্যায়
সকাল এগারোটা
কলেজের ক্যাফেটেরিয়ার বাইরের করিডোরটা বেশ সরগরম। কালচারাল ফেস্টের প্রস্তুতির জন্য চারদিকে ব্যানার আর পোস্টার পড়েছে।বেশিরভাগ স্টুডেন্ট এসব নিয়ে ব্যস্ত।
করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন। ফার্স্ট ইয়ার, ইংলিশ অনার্স।
দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত পরিবারের মেয়ে চন্দ্রিমা হলো ক্যাম্পাসের অন্যতম চর্চিত মুখ। আদ্যোপান্ত একজন 'পার্টি-গার্ল', জাস্ট কয়েক মাস হলো কলেজে ঢুকেছে, কিন্তু ইতিমধ্যেই তার রূপ আর স্টাইল স্টেটমেন্ট ক্যাম্পাসে আলোচনার বিষয়।
অসম্ভব সুন্দরী, গায়ের রঙ দুধ-আলতা, চোখদুটো টানা টানা আর ফিগারটা জিম-করা পারফেক্ট শেপে রাখা। পরনে একটা স্কিন-টাইট ডেনিম শর্টস, ওপরে সাদা রঙের একটা অফ-শোল্ডার ক্রপ টপ। চোখে প্রাডার সানগ্লাস, ঠোঁটে গ্লসি পিঙ্ক লিপস্টিক আর পায়ে ধবধবে সাদা স্নিকার্স। তাকে দেখতে একদম কোনো গ্ল্যামারাস মডেলের মতো। তার চোখেমুখে সবসময় একটা বিরক্তি ভাব, যেন এই দুনিয়ার সব কিছুই তার স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে নিচে।
উইকেন্ডে ক্লাবিং, এসি রেস্তোরাঁয় হুক্কা আর সিআইডি, স্টারবাকসে দামি কফি ছাড়া চন্দ্রিমার জীবন চলে না। ধুলো, রোদ আর ঘামকে সে যমের মতো ভয় পায়।
"নেহা, তুই পাগল হয়েছিস? আমি ওই ধুলোভর্তি, ঘামে ভেজা মাঠে গিয়ে ফুটবল ম্যাচ দেখব? এউউ! মাই মেকআপ উইল মেল্ট!"
চন্দ্রিমা তার বান্ধবী নেহার হাতটা ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
নেহা নাছোড়বান্দা। "আরে চান্দু, জাস্ট দশটা মিনিট! তুই জানিস মাঠে কে খেলছে! ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্সের ওই অয়ন ছেলেটা, যাকে নিয়ে পুরো আর্টস বিল্ডিং পাগল। তুই ওকে কখনো দেখিসনি। রিয়া বলছিল, ছেলেটা নাকি মাঠে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।"
"আগুন লাগাক আর যাই করুক, আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। এই রোদে আমি ওইসব আনসিভিলাইজড ছেলেদের কাদা মাখা মুখ দেখতে যাব না", চন্দ্রিমা মুখ বাঁকিয়ে বলল।
"প্লিজ চান্দু! আজ চল না! জাস্ট এক ঝলক দেখে আমরা এসির নিচে চলে আসব। প্রমিস!"
নেহা প্রায় জোর করেই চন্দ্রিমাকে রাজি করাল। চন্দ্রিমা চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে, বাধ্য হয়ে বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলা দেখতে যেতে রাজি হল।
দুপুর সাড়ে বারোটা।
অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্সের থার্ড ইয়ারের ক্লাস একদম পিন-ড্রপ সাইলেন্ট। ব্ল্যাকবোর্ডের গায়ে খড়ি ঘষার খসখস শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
বিদিশা বোর্ডে একটা অত্যন্ত জটিল ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশনের শেষ ধাপটা লিখছিলেন। শাড়ির আঁচলটা কোমরে গোঁজা, ডান হাতটা উঁচিয়ে বোর্ডে লেখার সময় তার পিঠের নিখুঁত বাঁকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পুরো ক্লাস মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে, তবে অঙ্কের চেয়ে অঙ্কের শিক্ষিকার দিকেই হয়তো অনেকের মনোযোগ বেশি।
"এই পয়েন্টে এসে ইকুয়েশনটা একটা লুপহোল তৈরি করে। কেউ বলতে পারবে নেক্সট স্টেপটা কী হওয়া উচিত?"
বিদিশা চকটা নামিয়ে রেখে ক্লাসের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল চোখদুটো ক্লাসের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর ওপর দিয়ে একবার ঘুরে গেল।
বেশিরভাগ স্টুডেন্টই মাথা নিচু করে নিল। বিদিশার ক্লাসে ফাঁকি দেওয়ার কোনো জায়গা নেই।
বিদিশা একটু হতাশ হয়েই হয়তো উত্তরের আশা ছেড়ে দিয়ে আবার বোর্ডের দিকে ঘুরতে যাবেন, এমন সময় পেছন থেকে একটা শান্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং অত্যন্ত মার্জিত গলা ভেসে এল।
হঠাৎ একদম পেছনের বেঞ্চ থেকে একটা শান্ত, অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং ভরাট গলা ভেসে এল।
"ম্যাম, আমরা যদি এক্সপোনেনশিয়াল ফাংশনটাকে রিভার্স করে দিই, তাহলে ওই লুপহোলটা একটা ক্লিয়ার কনস্ট্যান্ট ভ্যালু দেবে। আর ইকুয়েশনটা ব্যালেন্স হয়ে যাবে।"
বিদিশা চমকে উঠলেন। তিনি যে উত্তরটা খুঁজছিলেন, এটা ঠিক সেটাই, বরং তার চেয়েও একটু বেশি স্মার্ট একটা অ্যাপ্রোচ।
বিদিশা একটু অবাক হয়ে পেছনের বেঞ্চের দিকে তাকালেন। যে ছেলেটি উত্তর দিয়েছে, তাকে তিনি আগে এই ক্লাসে সেভাবে লক্ষ্য করেননি। সে এই ক্লাসের রেগুলার মুখ নয়।
ছেলেটির পরনে একটা অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু নিখুঁত ফিটিংয়ের সাদা শার্ট। চোখে একটা সরু ফ্রেমের চশমা, মুখাবয়বে একটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার ছাপ। তার বসার ভঙ্গির মধ্যে একটা অদ্ভুত, স্থির আত্মবিশ্বাস আছে যা অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে।
"অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট," বিদিশার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
"তোমার নাম?"
"সাহিল। সাহিল খান, ম্যাম, সেকেন্ড ইয়ার, ম্যাথ অনার্স" ছেলেটি বসা অবস্থাতেই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উত্তর দিল।
পাশের একটা ছেলে ফিসফিস করে বলল, "ম্যাম, ও আমাদের স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট।"
বিদিশা একটু ভ্রু কোঁচকালেন, তারপর হাসলেন।
"ইমপ্রেসিভ, সাহিল। পলিটিক্স আর ম্যাথমেটিক্স, দুটো নৌকোই তুমি বেশ ভালো ব্যালেন্স করে চলছ দেখছি।"
সাহিল সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে বলল।
"আপনার ক্লাসের রেপুটেশন এত শুনেছি যে আজ আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না, পারমিশন ছাড়াই ঢুকে পড়েছি। আশা করি আপনি কিছু মনে করেননি।"
"নট অ্যাট অল, সাহিল। অ্যাকাডেমিক কিউরিওসিটিকে আমি সবসময় ওয়েলকাম করি," বিদিশা সত্যিই ইমপ্রেসড হলেন। স্টুডেন্ট পলিটিক্সের মাথা হয়েও একটা ছেলের অঙ্কের প্রতি এত গভীর জ্ঞান যে সে উঁচু ক্লাসে এসে অঙ্কের শিখছে এবং তার উপর এমন সম্মানজনক আচরণ, দুটোই তাকে মুগ্ধ করল। এই কলেজের নতুন প্রজন্মকে তিনি ধীরে ধীরে চিনতে শুরু করেছেন।
কলেজ ফুটবল গ্রাউন্ড, বিকেল চারটে
মেইন বিল্ডিংয়ের জাঁকজমক থেকে বেশ কিছুটা দূরে, কলেজের ধুলোমাখা ফুটবল মাঠে আজ ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার-ফাইনাল ম্যাচ। ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট বনাম থার্ড ইয়ার কমার্স।
কলেজের পেছনের ফুটবল মাঠটা আজ বেশ ফাঁকা। সেভাবে কোনো ভিড় নেই।
বেশিরভাগ স্টুডেন্ট কালচারাল ফেস্টের প্রস্তুতি, আড্ডা আর রিহার্সাল নিয়ে ব্যস্ত। যারা মাঠে আছে, তারা নিতান্তই ফুটবলের অন্ধ ভক্ত।
মাঠে ম্যাচ চলছে, মাঠের একপাশে রনি আর কবীর দাঁড়িয়ে গলা ফাটাচ্ছে, "পাস! পাস দে অয়ন! জোনে ঢোক!"
মাঠের রোদ একটু পড়তির দিকে হলেও, ভ্যাপসা গরমটা এখনো কমেনি। মাঠের ধুলো উড়ে একটা ঝাপসা পরিবেশ তৈরি করেছে।
চন্দ্রিমা তার বন্ধুদের সাথে সাইডলাইনে এসে দাঁড়াল। এই ধুলোয় ভর্তি, ঘামে গন্ধ হওয়া মাঠে সে নিজের ইচ্ছায় আসেনি। তার দুই বন্ধু, নেহা আর রিয়া, আক্ষরিক অর্থেই তাকে জোর করে টেনে এনেছে।
"উফফ! তোদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এই রোদ্দুরের মধ্যে, এই ধুলোর সাগরে আমাকে কেন টেনে আনলি?" চন্দ্রিমা বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে নিজের সানগ্লাসটা ঠিক করতে করতে বলল।
"আমার সাদা স্নিকার্সটার কী হাল হচ্ছে দেখতে পাচ্ছিস? ফুটবল খেলাটা ইডিয়ট আর ঘামে ভেজা বাঁদরদের জন্য। আমি এখানে এক মিনিটও থাকব না!"
"আরে চান্দু, জাস্ট দশটা মিনিট প্লিজ!" নেহা প্রায় হাত জোড় করার উপক্রম করল।
"তুই শুধু ছেলেটাকে একবার দেখ! ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের। ছেলেটা মাঠে যা খেলছে না... আর দেখতে জাস্ট উফফ!"
"মাই ফুট!" চন্দ্রিমা মুখ বাঁকাল। "তোদের ওই ঘামে ভেজা, কাদা মাখা হিরোদের আমার জানা আছে। চল এখান থেকে।"
"ওই দ্যাখ! ওই তো নাম্বার টেন! অয়ন চ্যাটার্জী!" রিয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
চন্দ্রিমা একটা বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাঠের দিকে তাকাল। সে বিরক্তি নিয়ে নিজের সানগ্লাসটা চোখে দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে মাঠের মাঝখান থেকে একটা দৃশ্য তার চোখদুটোকে চুম্বকের মতো আটকে দিল। আর তাকানোর পরমুহূর্তেই তার বিরক্তি, তার অহংকার, তার সমস্ত অভিযোগ যেন এক জাদুমন্ত্রে উবে গেল।
বলটা পেয়ে রাইট উইং ধরে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে আসছে একটা ছেলে।
ফুটবলার বলতে অনেকের মনে যে টিপিক্যাল উস্কোখুস্কো রুক্ষ 'রাফ অ্যান্ড টাফ' লুক ভেসে ওঠে, অয়নকে ঠিক সেরকম দেখতে নয়। ওর চেহারায় একটা অত্যন্ত শার্প হ্যান্ডসাম চার্ম আছে।
ওর সৌন্দর্যটা একটু অন্যরকম - একদম নিখুঁত, ক্লাসিক। উচ্চতা প্রায় ছ'ফুট, স্লিম কিন্তু অসম্ভব অ্যাথলেটিক ফিগার। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। মুখাবয়বে একটা অদ্ভুত মার্জিত, কবিদের মতো স্নিগ্ধতা আছে - খাড়া নাক, ক্লিন-শেভেন তীক্ষ্ণ জ-লাইন আর গভীর, মায়াবী দুটো চোখ।
অয়নের সাদা জার্সিটা এখন কাদা আর সবুজ ঘাসের দাগে মাখামাখি। ঘামে ভিজে জার্সিটা তার বুকের সাথে সেঁটে আছে। হাফপ্যান্টের নিচে তার টানটান, পাথরের মতো শক্ত উরুর পেশিগুলো বল নিয়ে দৌড়ানোর সময় প্রতিটি পদক্ষেপে ফুলে ফুলে উঠছে।
ঘামে ভেজা রেশমি চুলগুলো দৌড়ানোর ছন্দে কপালের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে। এই অবস্থাতেও ওর চেহারার যে একটা অদ্ভুত আভিজাত্য আছে সেটা ক্ষুণ্ণ হয়নি। কিন্তু, ওর ওই নিষ্পাপ, অভিজাত মুখশ্রীর সাথে মাঠের আচরণের কোনো মিল নেই। সেখানে ও একজন আগ্রাসী খেলোয়াড়।
চন্দ্রিমা তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর চোখদুটো ওই ছেলেটার ওপর আটকে গেছে, চাইলেও ও সরাতে পারছে না। এমন অভিজ্ঞতা ওর জীবনে প্রথম।
এমন সময়, বিপক্ষের একজন খেলোয়াড় অয়নকে ট্যাকল করতে এগিয়ে এল। অয়ন বলটাকে পায়ের জাদুতে একটা ছোট্ট ফ্লিক করে, অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় শরীরের মোচড়ে তাকে বিট করে বেরিয়ে গেল। ওর মুভমেন্টে কোনো আড়ষ্টতা নেই, বরং এক সাবলীল ছন্দ আছে যেটা এই বয়সে বিরল।
ততক্ষণে থার্ড ইয়ারের দুজন ডিফেন্ডার ওকে সামলাতে বক্সের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অয়ন এক মুহূর্তের জন্য বলটা হোল্ড করল। ওর চোখদুটো শিকারি বাজপাখির মতো স্থির। সে একটা ফেক বডি মুভমেন্ট দিয়ে প্রথম জনকে ছিটকে দিল, তারপর দ্বিতীয় জনের দুপায়ের মাঝখান দিয়ে বলটা গলিয়ে দিয়ে, চরম স্পিডে বক্সের কাছাকাছি এসে ডান পায়ে একটা জোরালো, বুলেটের মতো শট নিল।
বুম!
একটা বাঁ-পায়ের পাওয়ারফুল শট। বলটা নেটের ওপরের কোণায় গিয়ে আছড়ে পড়ল। বিপক্ষের গোলকিপার ডাইভ দিয়েও বলের নাগাল পেল না।
"গোওওওল!" মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা রনি আর কবীর পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।
"গুরুউউউউ! তুই আগুন মাইরি! আগুন!"
রনি আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
কিন্তু, অয়ন কোনো সেলিব্রেশন করল না। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত পড়ছে, ঘামের ফোঁটা চিবুক বেয়ে ঘাড়ের কাছে নেমে আসছে। চোখের দৃষ্টিটা বরফের মতো কুল। অয়নের চারপাশের পৃথিবীটা যেন তার কাছে অস্তিত্বহীন। ওর ফোকাস শুধু ফুটবলে। সে শুধু একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে জগিং করতে করতে নিজের হাফে ফিরে আসতে লাগল।
আসার পথে সে নিজের কাদা-মাখা জার্সির নিচটা টেনে মুখের ঘাম মুছল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার নির্মেদ, সিক্স-প্যাক অ্যাবস এবং ঘামে ভেজা পেটের পেশিগুলো উন্মুক্ত হয়ে গেল।
মাঠের বাইরে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে চন্দ্রিমার হৃদস্পন্দন তখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ও টের পাচ্ছে যে ওর গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
হাত থেকে সানগ্লাসটা কখন যে নিচে ঘাসের ওপর পড়ে গেছে, সেটা ও খেয়ালই করেনি। এক মিনিট আগে ঘাম আর কাদা যার কাছে জঘন্য মনে হচ্ছিল, এখন সেই কাদামাখা, ঘামে ভেজা অয়নের শরীরটা দেখে তার পেটের ভেতর একটা অদ্ভুত, শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে। চন্দ্রিমা কলেজে, কলেজ ক্যাম্পাসে, নিজের পার্টি-লাইফে অনেক হ্যান্ডসাম ছেলে দেখেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই ধুলোয় মাখা মাঠে, অয়নের ওই পুরুষালি, আগ্রাসী অথচ শান্ত, নিখুঁত সুন্দর রূপটার সামনে তাদের সবাইকে এখন জাস্ট বাচ্চা ছেলে বলে মনে হচ্ছে।
অয়নের ওই মার্জিত, হ্যান্ডসাম মুখের সাথে মাঠের এই ঘাম, কাদা আর 'র' এনার্জির যে মারাত্মক মিশেল, সেটা চন্দ্রিমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে দিল। চন্দ্রিমা এর আগে অনেক হ্যান্ডসাম ছেলে দেখেছে, কিন্তু এমন 'র'-প্যাশন, এমন বন্য পুরুষালি এনার্জি সে জীবনে কখনো দেখেনি।
তার চোখদুটো অয়নের ওই ঘামে ভেজা চওড়া কাঁধ আর তীক্ষ্ণ চোয়ালের ওপর আটকে রইল।
চন্দ্রিমা প্রথম দেখাতেই ছেলেটার প্রতি এক তীব্র শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করল। তার ইচ্ছে করছিল ওই ঘামে ভেজা জার্সিটার ওপর হাত রাখতে, ওর ওই তীক্ষ্ণ চোয়ালে হাত ছোঁয়াতে।
"কীরে চান্দু? কী বলেছিলি ? বাঁদর ?" নেহা কনুই দিয়ে চন্দ্রিমার পেটে একটা হালকা গুঁতো মেরে হাসল।
চন্দ্রিমা চোখ না সরিয়েই একটা শুকনো ঢোঁক গিলল। তার গলার স্বরটা একটু যেন কেঁপে গেল।
"ছেলেটার...নাম কী বললি তোরা?"
"অয়ন। অয়ন চ্যাটার্জী।"
চন্দ্রিমার ঠোঁটের কোণে একটা অন্যরকম, পজেসিভ হাসি ফুটে উঠল।
"নট ব্যাড। একচুয়ালি... ভেরি গুড।"
কিন্তু অয়ন? মাঠের ভেতর নিজের জোনে থাকা অয়ন এসবের কিছুই লক্ষ্য করল না। তার চোখ শুধু ফুটবলের দিকে। সে একবারের জন্যও সাইডলাইনের দিকে ফিরে তাকাল না।
এত সুন্দরী একটা মেয়ে, যাকে দেখার জন্য পুরো কলেজের ছেলেরা মুখিয়ে থাকে, সেই চন্দ্রিমা সেন যে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, সেদিকে অয়নের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আসলে, এসব তার ভাবনার জগতেই নেই।