মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৬৮
অধ্যায় ২৭
১
২৭শে ডিসেম্বর, সকাল পৌনে সাতটা।
কলেজের স্পোর্টস কমপ্লেক্সের বিশাল কাঁচের জানলা দিয়ে ডিসেম্বরের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের আবছা আলো এসে জিমের ম্যাটে ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরে তাপমাত্রা প্রায় এগারো ডিগ্রি; শীতের সকালে জিম একদম ফাঁকা।
কেবল ওপাশে কোণের দিক থেকে ভারী মেটালিক প্লেট ওঠানামার ধাতব ঠনঠন শব্দ আসছে।কলেজের দু-একজন সিনিয়র অ্যাথলিট স্কোয়াট মারছে।
গা গরম করার জন্য, কয়েকটা ড্রিল সেরে নিয়ে নিজের হুডিটা খুলে পাশের বেঞ্চে রাখল অয়ন। শরীর গরম হয়ে ওঠায় শীতের অনুভূতিটা আর আগের মতো তীব্র লাগছে না।
হুডিটা ছাড়তেই ডার্ক ব্ল্যাক কম্প্রেশন টি-শার্টের নিচে অয়নের পিঠ আর বুকের মাসল লাইনগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। শরীরে কোথাও বাড়তি মেদের কোন চিহ্ন নেই, প্রতিটা পেশি সুস্পষ্ট। ভারী বডিবিল্ডারের মতো নয়, বরং একজন অ্যাথলিটের মতো; ছিপছিপে অথচ মাসক্যুলার।
চওড়া কাঁধ থেকে ভি-শেপে নেমে আসা পিঠের ল্যাটস আর বুক ও পেটের আপার মাসলের ভাঁজগুলো টি-শার্টের টানটান কাপড়ের ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
রুটিন মেনে হাল্কা স্ট্রেচিং শুরু করতেই অয়নের মাথায় কাল রাতে দোজোতে মিঃ প্রধানের সাথে হওয়া কথাগুলো ঘুরপাক খেতে শুরু করল...
[ফ্ল্যাশব্যাক]
দোজোর সেই আবছা আলো-ছায়াময় নিস্তব্ধ পরিবেশ। হলঘরের কাঠের মেঝেতে ম্যাটের উপর বসে মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় অয়নকে বোঝাচ্ছিলেন,
"অয়ন, কালকে মাঠে ফুটবল খেলার সময় টার্নিং নেওয়ার সময় তোমার নিজের বডি ব্যালেন্স কেন আগের চেয়ে স্টেডি মনে হচ্ছিল জানো?
তোমার মস্তিষ্ক আর পেশির যুগলবন্দি ঠিকঠাক কাজ করতে শুরু করেছে। স্পোর্টস সায়েন্সের ভাষায় একে নিউরোমাসকুলার কো-অর্ডিনেশন বলে।
তোমার কোমর আর মেরুদণ্ডের ভারসাম্য একদম ঠিকঠাক থাকায় 'সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি' বা শরীরের ভরকেন্দ্র এক চুলও নড়েনি। এটা এখানে মার্শাল আর্টের সেন্টার্ড স্ট্যান্স আর ব্যাক স্টেপিং প্র্যাকটিসের ফল।
কিন্তু তোমার ফুটওয়ার্ক যতই ভালো হোক না কেন, কমব্যাট সিচুয়েশন আর হাই-ইন্টেনসিটি ফুটবল ম্যাচ শুধু এই দিয়ে জেতা যায় না।
তোমার রিফ্লেক্স তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মন শরীরের মুভমেন্টের সাথে পুরোপুরি এক না হলে যখনই তুমি হাই-স্পিডে ডিরেকশন চেঞ্জ করবে, মন সামান্য হলেও এক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে পড়বে।
এই অল্প কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানটাই কিন্তু একজন সাধারণ প্লেয়ার আর একজন এলিট অ্যাথলিটের মধ্যে তফাৎ গড়ে দেয়।"
মিস্টার প্রধান অল্প একটু থেমে অয়নের দিকে তাকালেন। তার চোখে গভীর অভিজ্ঞতার ছাপ।
"শরীরের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মনকে স্থির করা প্রয়োজন। কাল ড্রিল শুরুর আগে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসকে পায়ের তলদেশ পর্যন্ত অনুভব করার চেষ্টা করবে। ফোকাসটা পেশিতে নয়, তোমার কোর আর গ্রাউন্ডের সংযোগস্থলে রাখবে
আর হ্যাঁ, জিমে গিয়ে ভারী ওজন তুলে শুধু মাসল বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। তোমার দরকার ফাংশনাল স্ট্রেন্থ আর এক্সপ্লোসিভ পাওয়ার।
কাইনেটিক চেইন বজায় রাখতে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ইনটেনসিটি ফাংশনাল ট্রেনিং কর আর উইং চুং স্ট্যান্স প্র্যাকটিস কর।
দেখবে, তোমার স্ট্যামিনা আর পাওয়ার ট্রান্সফার ক্যাপাসিটি ডাবল হয়ে যাবে।"
মিঃ প্রধানের কথা মাথায় রেখেই অয়ন ব্যায়াম শুরু করল।
দেখতে দেখতেই কুড়িটা মিনিট কেটে গেল, একের পর এক ড্রিল করতে করতে ওর শ্বাসের গতি দ্রুত হল, ঘামে ভিজে কালো টি-শার্টটা ওর গায়ে লেপ্টে গেল, টি-শার্টের ওপর দিয়ে বুকের চওড়া ছাতি আর পেটের টোনড পেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। ওর পাঁজরে আর ব্যথা নেই, নয়তো বিপত্তি হতে পারত।
নিজের শেষ সেটটা ফিনিশ করে অয়ন তোয়ালে দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে যাবে, ঠিক এমন সময় পেছনের দিক থেকে পর পর কতকগুলো ভারী, মেটালিক ইমপ্যাক্টের শব্দ ভেসে এল!
ঠাস! ঠাস! থাব!
ঘাড়ের তোয়ালেটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘুরে দাঁড়াল অয়ন।
শব্দগুলো জিমের একদম শেষপ্রান্ত থেকে আসছে।
ইমপ্যাক্টের তীব্রতা এত বেশি যে প্রতিটা আঘাতের সাথে সাথে ভারী পাঞ্চিং ব্যাগটা রিংয়ের সাথে বাঁধা লোহার চেন সমেত সশব্দে কেঁপে উঠছে!
এটা কোন অ্যামেচারের কাজ নয়।
অয়ন হাতের তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে ভ্রূ কুঁচকে লোহার চেনের খড়খড় শব্দটা লক্ষ্য করে এগোলো।
জিমের পেছনের অংশটা আলাদা করে তৈরি করা। এখানে মেঝেতে প্রফেশনাল ব্ল্যাক অ্যান্ড রেড কিকবক্সিং ম্যাট পাতা আর উপর থেকে ঝুলছে ভারী তিনখানা সিন্থেটিক লেদার ব্যাগ।
'কিকবক্সিং জোন।'
সেখানে পৌঁছে অয়ন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সুরঙ্গনা ব্যানার্জী !
তার পরনে হলুদ রঙের স্পোর্টস ব্রা আর ধূসর রঙের জিম টাইটস।
ঘামে ভেজা আঁটসাঁট স্পোর্টস ব্রার মধ্য থেকে ওনার সুডৌল স্তন আর নির্মেদ উন্মুক্ত পেট স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। টানটান সুদৃঢ় জিম টাইটসের টানে ওনার নিতম্ব আর সুগঠিত উরুর একদম অনাবৃত দেখাচ্ছে।
সুরঙ্গনার চুল চাবুকের মতো শক্ত করে মাথার ওপর হাই-পনিটেল করা। ঘামে ভেজা কয়েকটা অবাধ্য চুলের গোছা ওনার কপালে আর গালের পাশে সেঁটে আছে। পেশাদার কিকবক্সারদের মতোই ওনার দু-হাতে নিখুঁত পেশাদার কায়দায় বাঁধা লাল রঙের 'রিং-সাইড হ্যান্ড-র্যাপস'।
ফিজিক্স ক্লাসের গ্ল্যামারাস শাড়ি, ম্যাচিং স্লিভলেস ব্লাউজ আর হাই হিল পড়া প্রফেসরের আড়ালে যে এমন এক মারাত্মক অ্যাথলেটিক ফিগার লুকিয়ে আছে তা অয়ন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি!
দেখতে দেখতেই সুরঙ্গনার ডান পা-টা চাবুকের মতো শূন্যে ঘুরে গিয়ে পাঞ্চিং ব্যাগের ঠিক মাঝখানে আছড়ে পড়ল।
ইমপ্যাক্টের সাথে সাথে ব্যাগটা প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে পেছনের দিকে হেলে গেল। পরমুহূর্তেই একটুও না পিছিয়ে নিখুঁত লেফট-হুক আর ফায়ার্স রাইট-স্ট্রেট পাঞ্চ!
ঠাস! ঠাস!
সুরঙ্গনার এক্সপ্লোসিভ পাওয়ার, রোটেশন, ফুটওয়ার্ক, টাইমিং আর স্পিড কোন প্রফেশনাল কিকবক্সারের চেয়ে এক চুলও কম নয়।
মারের ধরণটাই বলে দিচ্ছে, দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিসের ফল। তার প্রতিটা মুভমেন্ট মিঃ প্রধানের বলা 'কাইনেটিক চেইন'-এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ, পায়ের পাতা থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়ে কোমর ঘুরে সরাসরি ছিটকে হাতের মুঠো দিয়ে বের হচ্ছে।
আঘাত থামাতেই জিমের সেই অংশে আবার আগের নিস্তব্ধতা ফিরে এল, শুধু সুরঙ্গনার শ্বাসের শব্দ ছাড়া।
নিজের হাই-কিক কম্বিনেশন শেষ করে সুরঙ্গনা পাঞ্চিং ব্যাগটাকে একহাতে ধরে স্থির করলেন।
তারপর, কপাল থেকে ঘেমে যাওয়া ভেজা চুলগুলো আলতো করে পেছনে সরালেন।
সুরঙ্গনা বুক ভরে ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছিলেন।
টাইট ভেস্টের নিচে ওনার ভারী বুকের ওঠানামা, গোটা শরীরে জমে থাকা পুঁতির মতো স্বচ্ছ ঘামের বিন্দু আর গালের হালকা রক্তিম আভার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অয়নের মনে হল এই রুমের তাপমাত্রা আগের চেয়ে হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে গেছে।
"কি ব্যাপার মিঃ চ্যাটার্জী ?
একমাস ধরে ক্লাসে বাঙ্ক মেরে, এখন জিমেও প্রফেসরকে আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হচ্ছে ? এটাকে আমি ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের মধ্যে ফেলতে পারি।"
তার গলায় সেই আবেদনময়ী হাস্কি কন্ঠস্বর। কথাটা যে তিনি সিরিয়াস টোনে বলেননি সেটা তার ঠোঁটে চেনা, ফ্লার্টি হাসিটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অয়ন খেয়ালই করেনি, কখন সুরঙ্গনার নজর ওর ওপর এসে পড়েছে।
নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে দ্রুত জবাব দিল,
"না ম্যাম। আপনার কিকিং ফোর্সের ইমপ্যাক্ট সাউন্ড শুনে এদিকে তাকাতে বাধ্য হলাম। ইউ হ্যাভ আ ভেরি স্ট্রং অ্যান্ড পারফেক্ট ফুটওয়ার্ক।"
সুরঙ্গনার ডান দিকের সরু ভুরুটা সামান্য ওপরের দিকে উঠে গেল। সাথে সাথেই তার মুখে একটা মিটমিটে হাসি ফুটে উঠল।
"তাই নাকি ?"
সুরঙ্গনা আরেক পা এগিয়ে এলেন।
এক সেকেন্ডের জন্য সুরঙ্গনার উন্মুক্ত পেটের দিকে চোখটা আটকে যেতেই অয়ন দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। ওনার শরীর থেকে একটা উগ্র, অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।
গন্ধটা অয়নের নাকের ভেতর দিয়ে সোজা মস্তিষ্কে গিয়ে ধাক্কা মারল। কেমন যেন একটা মাতাল করা অনুভূতি।
"সো দ্য ব্যাড বয় অফ ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট ইজ অলসো আ স্পোর্টস ক্রিটিক? বাহ্!"
সুরঙ্গনার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখাটা আরও একটু স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তিনি হাতের লাল হ্যান্ড-র্যাপসের বাঁধনটা ধীরে ধীরে আলগা করতে করতে অয়নের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। ওনার শরীর থেকে নির্গত হওয়া সেই সুবাস আর তীব্র উত্তাপ দুটোই অয়ন এখন খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারছে।
সুরঙ্গনার দৃষ্টি এবার অয়নের টানটান টি-শার্টের ওপর দিয়ে নেমে এসে ওর চওড়া কাঁধ, ছাতি আর টানটান ভি-শেপ ল্যাটসের ওপর গিয়ে থামল।
"নট ব্যাড, নট ব্যাড অ্যাট অল।"
হালকা গলায় বললেন সুরঙ্গনা।
"ক্লাসে চুপচাপ থাকা ছেলেটার শার্টের নিচে যে এতটা ডেডিকেশন লুকিয়ে আছে, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, মিঃ চ্যাটার্জী।"
অয়ন নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। সুরঙ্গনার খোলামেলা প্রশংসা আর তার শরীরি উপস্থিতির ফলে ওর মনের ভেতরে তৈরি হওয়া অস্থিরতাটুকু সে বাইরে বিন্দুমাত্র ফুটে বেরোতে দিল না।
"থ্যাঙ্কস ,ম্যাম। ফুটবলের জন্য ফিটনেস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম, প্র্যাকটিস না রাখলে শরীর বসে যায়।"
অয়ন সহজ গলায় বলল।
একহাতে আলতো করে নিজের চুলের হাই-পনিটেলটা ছুঁয়ে আবার বাঁধনটা শক্ত করে নিয়ে একটু হেসে সুরঙ্গনা অয়নের চোখের দিকে সোজা তাকালেন।
"তাই... শুধুই কি দূর থেকে অন্যের টেকনিক স্ক্যান করা অভ্যাস, নাকি কোন বাস্তব ব্যবহার আছে?
সত্যি করে বলো তো, তুমি কী কোন কমব্যাট স্পোর্টস প্র্যাকটিস কর ?"
অয়ন এক মুহূর্ত ইতস্তত করল।
নিজের ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা সবটা খুলে বলা অনাবশ্যক।
সে সামান্য মাথা নেড়ে কায়দা করে বলল,
"আর্ট অফ কমব্যাটের একটা বইয়ে পড়েছিলাম ম্যাম আর ক্লাসে ফিজিক্সের ফোর্সের ভেক্টর ভেলোসিটি তো আপনিই পড়ান। সেটাই মনে মনে মেলাচ্ছিলাম।"
সুরঙ্গনার ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও প্রসারিত হলো। তিনি হাতের হ্যান্ড-র্যাপস দুটো একটা কাঠের বেঞ্চের ওপর ছুঁড়ে ফেলে জিমের কোণে রাখা মেটাল র্যাকের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে এক জোড়া প্রফেশনাল, থিক লেদার গ্রিপের ফোকাস মিট আর থাই-প্যাড তুলে নিলেন।
"ফিজিক্সকে প্র্যাকটিক্যাল কমব্যাটে মেলানো? বেশ তো!"
সুরঙ্গনা হঠাতই ঘুরে অয়নের দিকে মিটজোড়া দুটো ছুঁড়ে দিলেন।
অয়ন কুইক রিফ্লেক্সে ডানহাত বাড়িয়ে শূন্যেই ওদুটো অনায়াসে ক্যাচ ধরল।
"প্যাড দুটো হাতে গলে সোজা হয়ে দাঁড়াও তো চ্যাটার্জী। আমাকে পনেরো মিনিট ওয়ান-টু কম্বিনেশন আর হাই-মিডল কিক স্পারিংয়ের জন্য কুশন দাও। দেখি তোমার ফিজিক্সের লজিক কতটা গ্রাউন্ডে কাজ করে! ক্যান ইউ হ্যান্ডেল দ্যাট? নাকি পিছু হটবে?"
সুরঙ্গনা হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, একজন ফার্স্ট ইয়ারের সাধারণ ছাত্র হয়তো পিছু হটবে।
কিন্তু অয়ন বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না।
সে হাতের ফোকাস মিট দুটো নিখুঁত কায়দায় দুই কবজিতে গলিয়ে নিল। শক্ত করে স্ট্র্যাপগুলো টেনে বেঁধে নিয়ে, সে নিজের পা দুটো সামান্য চওড়া করে, হাঁটু আলতো বাঁকিয়ে, সোজা স্পাইন ধরে একটা নিখুঁত, 'কিকবক্সিং বেস' তৈরি করে দাঁড়াল। ওর সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এক ধাক্কায় নিচে নেমে মাটির সাথে সেঁটে গেল।
"আই অ্যাম রেডি, ম্যাম।" অয়নের গলা নিচু, কিন্তু ধাতব পাতের মতো ভারী ও স্থির।
অয়নের এতটা কনফিডেন্স দেখে মনে মনে সুরঙ্গনা বেশ কিছুটা অবাকই হলেন।
"স্মার্ট অ্যাস!"
সুরঙ্গনা আলতো করে একটা শীতল হাসি উপহার দিয়ে আচমকা কোনো ওয়ার্নিং ছাড়াই সোজা অয়নের মুখের সামনে থাকা মিট লক্ষ্য করে এক মারাত্মক 'লেফট-জ্যাব' মারলেন!
ঠাস!
সুরঙ্গনা আশা করেছিলেন, কোনো প্রস্তুতি ছাড়া হুট করে আসা এই দ্রুত গতির জ্যাবের ইমপ্যাক্টে অয়ন অন্তত এক পা পিছিয়ে যাবে। কিন্তু অয়ন এক ইঞ্চিও নড়ল না!
সুরঙ্গনার মুখের সেই চেনা হাসির রেখাটা একদম অদৃশ্য হয়ে গেল। ওনার চোখ জোড়া সরু হয়ে এল।
তার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা একজন ফাইটারের জেদ হঠাৎ করে জেগে উঠল। তিনি এবার নিজের গতি আর শক্তি দুটোই এক ধাক্কায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলেন!
লেফট-জ্যাব! রাইট-স্ট্রেট! রাইট-হুক! অ্যান্ড আ ফায়ার্স লেফট মিডল-কিক!
ঠাস! ঠাস! থাব! ঠাস!
সুরঙ্গনার প্রতিটি কিক চাবুকের মতো সপাটে আছড়ে পড়ল। কিকবক্সিং ম্যাটের ওপর ওনার দ্রুত নড়াচড়ার শব্দে চারপাশের পুরো বাতাস যেন গরম হয়ে উঠল।
কিন্তু, ওনাকে অবাক করে দিয়ে অয়ন অটল রইল।
সে মিস্টার প্রধানের নির্দেশ -'ফোকাসটা পেশিতে নয়, তোমার কোর আর গ্রাউন্ডের সংযোগস্থলে রাখবে'; সম্পূর্ণভাবে মেনে চলছে।
অয়ন সুরঙ্গনার প্রতিটি কিক সঠিক অ্যাঙ্গেল ফলো করে নিজের ফোকাস আর টাইমিং অ্যাডজাস্ট করছে আর পাশাপাশি মিটের পজিশন ঠিক করে নিচ্ছে।
সুরঙ্গনা এবার সম্পূর্ণ ব্যাক-রোটেশন ব্যবহার করে একটি ঘূর্ণায়মান 'রাউন্ডহাউস কিক' মারলেন অয়নের বামদিকের থাই-প্যাড লক্ষ্য করে!
বোম!
এবার ইমপ্যাক্টের ধাক্কায় অয়নের বাম পা-টা সামান্য পেছনে পিছলে গেলেও সে পড়ে গেল না। চটজলদি নিজের কোর মাসল টাইট করে আবার নিজের স্ট্যান্স সামলে নিল সে।
এভাবে দশ মিনিট চলল। সুরঙ্গনা পনের মিনিট বললেও এর মধ্যেই ওনার স্পোর্টস ব্রা ঘামে ভিজে উঠেছে, কপাল আর বুক বেয়ে গলগল করে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।
এমন সময় হঠাৎ করেই সুরঙ্গনা একটি কিক মারার ভান করে অয়নের ডিফেন্সে ফাঁক তৈরি করলেন।
অয়ন ভেবেছিল কিক আসবে, তাই সে প্যাডটা সামান্য নিচে নামিয়েছিল, কিন্তু সুরঙ্গনা তা না করে এক ঝটকায় অয়নের অনতিদূরে একদম মুখোমুখি এসে থমকে দাঁড়ালেন!
দুজনের ব্যবধান শূন্যে নেমে এল।
সুরঙ্গনার ঘামে ভেজা অনাবৃত পেট অয়নের ছাতির খুব কাছে। সে তার তীব্র স্পন্দন অনুভব করতে পারছে।
সুরঙ্গনার হাই-পনিটেল থেকে ছিটকে আসা কয়েকটা ভেজা চুলের গোছা অয়নের খালি ঘাড় আর টি-শার্টের কলারের ওপর আছড়ে পড়ল।
সুরঙ্গনার শরীর থেকে ভেসে আসা সেই মিষ্টি গন্ধ অয়নের রন্ধ্র দিয়ে সোজা মস্তিষ্কে গিয়ে একটা মাতাল করা বিদ্যুৎ তরঙ্গ ছুঁড়ে দিল।
তার শরীরের রগগুলো মুহূর্তের মধ্যে টানটান হয়ে উঠল।
সুরঙ্গনা ঘন শ্বাস নিতে নিতে নিজের মাথাটা সামান্য তুললেন। ওনার ভেজা গাল আর লালচে ঠোঁট দুটো অয়নের মুখের একদম কাছে।
সুরঙ্গনা অয়নের কানের কাছে সামান্য ঝুঁকে, অত্যন্ত নিচু গলায় ফিসফিস করে বললেন,
"নট ব্যাড, অয়ন... তোমার স্ট্রাইকিং গ্রিপ আর কোর অ্যালাইনমেন্ট অসম্ভব রকমের ভালো। তুমি তো দেখছি আমায় অবাক করে দিলে!"
ওনার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসা গরম নিঃশ্বাস অয়নের কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়ল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হালকা শিহরণ বয়ে গেল, সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের শ্বাসের গতি স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল।
সুরঙ্গনা দু-পা পিছিয়ে এসে দুই হাত হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগলেন।
"হু দ্য হেল আর ইউ, চ্যাটার্জী?" সুরঙ্গনা হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন।
"তোমার এই ইমপ্যাক্ট অ্যাবসরপশন আর সিনক্রোনাইজেশন... এটা কোন ফিজিক্সের বই পড়ে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়! তুমি কোথাও মার্শাল আর্ট শেখ, রাইট?"
অয়ন দুই হাত থেকে ফোকাস মিট দুটো খুলে নিয়ে ধীরেসুস্থে পাশের বেঞ্চে নামিয়ে রাখল। তারপর তোয়ালেটা নিয়ে নিজের গলার ঘাম মুছতে মুছতে বলল,
"আপনাকে তো আগেই বললাম ম্যাম, একটু-আধটু অভ্যাস করি। আর আপনিই তো ক্লাসে শিখিয়েছেন, 'এভরি অ্যাকশন হ্যাজ অ্যান ইকুয়াল অ্যান্ড অপোজিট রিয়্যাকশন'।
একটা ১২০ পাউন্ড ফোর্সের কিক বা পাঞ্চ থামানোর সবচেয়ে সহজ রাস্তা হলো তার ভেক্টরটাকে সরাসরি নিজের বডি দিয়ে গ্রাউন্ডে পাঠিয়ে দেওয়া। রিজিড হলে ভেঙে যাবেন, ফ্লেক্সিবল হলে সারভাইভ করবেন।"
সুরঙ্গনা কয়েক সেকেন্ড অয়নের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ওনার ঠোঁটের কোণে আবার সেই মনোহারী হাসিটা আবার ফুটে উঠল।
"ফিজিক্সকে এভাবে রিয়েল-লাইফ স্পারিংয়ে অ্যানালাইজ করতে শুধু তুমিই পারো, মিঃ চ্যাটার্জী।"
সুরঙ্গনা তোয়ালে দিয়ে নিজের মুখ আর কপাল মুছতে মুছতে অয়নের আরও একধাপ কাছাকাছি এলেন।
ওনার ভেজা চুলের সুবাস আবার অয়নের নাকে ধাক্কা মারল। এবার সে গন্ধটা আইডেন্টিফাই করতে পারল। গন্ধটা সুরঙ্গনার চুল থেকে আসছিল।
সুরঙ্গনা তাঁর সেই মাদকতাময়, নিচু গলায় বললেন,
"তোমার এই 'একটু-আধটু' জ্ঞানটা কিন্তু দারুণ বিপজ্জনক! তবে আমার লাভই হলো... এতদিন এই ছাঁইপাশ ক্যাম্পাসে মনের মতো কোনো প্রফেশনাল স্পারিং পার্টনার পাচ্ছিলাম না। কাল সকালে কী করছ?"
কথাটা বলে সুরঙ্গনা জলের বোতলটা তুলে নিয়ে লম্বা এক চুমুক দিলেন। গলার মসৃণ চামড়া বেয়ে জলের দুটো ফোঁটা গড়িয়ে ওনার ট্রেনিং ভেস্টের খাঁজে হারিয়ে গেল। না চাইতেও অয়নের চোখ সেদিকে চলে গেল।
যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও সুরঙ্গনা একবার আড়চোখে ঘুরে অয়নের দিকে তাকালেন, ওনার চোখে আবার সেই পরিচিত, ফ্লার্টি ভাব ফিরে এসেছে।
"আমি প্রতিদিন এইসময় জিমে থাকি। পার্টনার হিসেবে তোমার কুশন দেওয়ার ক্ষমতা বেশ চমৎকার। কাল থেকে একদম সময়ে চলে এসো, চ্যাটার্জী। লেট হলে কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালের নম্বর কেটে নেব!"
কথাটা শেষ করে হালকা চালে সুরঙ্গনা জিমের লেডিজ রুমের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।
অয়ন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সুরঙ্গনার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে তখনও সেই মাতাল করা মিষ্টি গন্ধটা ভেসে বেড়াচ্ছে।
অয়নের বুকের ভেতর পেশির স্পন্দন এখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি। ফিজিক্সের লেকচার হলে যে গ্ল্যামারাস প্রফেসরকে সে দেখেছে, আজ এই জিমে তার এই সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ অয়নের মনে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন তৈরি করে দিয়ে গেল।
প্রফেসর সুরঙ্গনা সুন্দরী, আড়ালে সবাই তাকে সেক্সি ব্যানার্জী বলে ডাকে কিন্তু সবার মতো তিনি কখনো অয়নকে আলাদা আকর্ষিত করেনি।
কিন্তু, আজ জিমে তার রূপ ওর মনে একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়ে গেল।
তবে অয়ন এটাও জানে, কলেজের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষার ভয়াবহ চাপ, ফুটবল টিমের বেঞ্চ থেকে ফার্স্ট ইলেভেনে ফেরার লড়াই, এই অবস্থায় ফোকাস ধরে রাখাটা ভীষণ দরকার।
মাথা নাড়তে নাড়তে অয়ন তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে ডর্মের দিকে পা বাড়াল। কোন অবস্থাতেই সে নিজের ফোকাস হারাতে দেবে না।
২
২৭শে ডিসেম্বর, সাড়ে পাঁচটা
যোধপুর পার্কের বারো তলার হাই-রাইজ অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনির কাঁচের স্ল্যাবের ওপারে ডিসেম্বরের শেষ বেলার আবছা আলো। মিহি কুয়াশার চাদর নামতে শুরু করেছে, সাথে ডিসেম্বরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপাদাপি। ব্যালকনি চত্বরটা রিমোট-কন্ট্রোলড থার্মাল ব্লাইন্ডস দিয়ে ঘেরা। হালকা ধূসর মার্বেলের মেঝের উপর পাতা দামি পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর বসে আছে বৈশালী।
তার পরনে একটা আলগা, নেভি-ব্লু সিল্কের রেশমি হাউজ-গাউন। কোল্ড-কাট স্লিভের ফাঁক দিয়ে তার মসৃণ কাঁধ উন্মুক্ত, খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর অযত্নে ছড়িয়ে আছে। গাউনের সামনের বেল্টটা আলগা হয়ে বুকের ওপরের গভীর খাঁজটাকে অনাবৃত করে রেখেছে, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
To be continued...