মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৭১
৪
২৮শে ডিসেম্বর, বিকেল পৌনে চারটে
কম্পিউটার সায়েন্স বিল্ডিংয়ের দোতলার করিডোরটা দিনের বেলাতেও বেশ অন্ধকার। সেন্ট্রাল সার্ভার রুমের এক্সহস্ট ভেন্টগুলো থেকে আসা হালকা গরম বাতাসের সাথে সাথে ভারী কুলিং ইউনিটের চাপা গর্জন পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এর ফলে নিস্তব্ধতার বদলে একটা চাপা, যান্ত্রিক গুঞ্জন চারপাশের আবহাওয়াকে আরও থমথমে করে তুলেছে। বাতাসে কেবল এসি থেকে আসা শুষ্ক কৃত্রিম হাওয়া আর রিমোট সার্ভার র্যাকগুলোর তপ্ত সার্কিটের চেনা গন্ধ।
করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে, একটা অব্যবহৃত লেকচার হলের দরজার আড়ালে, অন্ধকারের ভেতর মিশে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। আধা অন্ধকার করিডরে একবার ওকে দেখলে ঠাহর করা মুশকিল।
তার চোখ শিকারীর মতো ল্যাব-রুমের দরজার দিকে স্থির হয়ে আছে।
কিন্তু, এই সময় ক্লাসে না গিয়ে এখানে কী করছে সে ?
অয়ন সিধু আগরওয়ালের জন্য অপেক্ষা করছে।
সিধু এমন একটা ছেলে, যাকে এই কলেজের আন্ডারওয়ার্ল্ডের উইকিপিডিয়া বলা যায়। ফার্স্ট ইয়ারে কে কার সাথে প্রেম করছে, পরীক্ষার কোন হলে কোন টিচারের গার্ড পড়বে, সাজেশন, কার দুর্বলতা কোথায়, এসব ইনসাইডার ইনফরমেশন এই ক্যাম্পাসে সিধুর চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
টাকা দিলেই সেগুলো কিনতে পাওয়া যায়।
সিধু সুরঙ্গনার ক্লাসেও আছে তবে ওর সাথে অয়নের সরাসরি কোনদিন কথা হয়নি। সিধুও যেচে এগিয়ে এসে অয়নের সাথে কখনো আলাপ করার চেষ্টা করেনি। সে ঝামেলা থেকে একশো হাত দূরে থাকে।
তবে আজ অয়ন নিজেই ওকে খুঁজতে বেরিয়েছে। ওর সিধুকে দরকার।
এরকম নির্জন মুহূর্তগুলোতেই আমাদের মস্তিষ্ক অতীতের চিন্তায় ডুব দেয় সবচেয়ে বেশি। অয়নের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। গত দু'দিন ধরে ওর অবচেতন মন যে চিন্তাটাকে সযত্নে এড়িয়ে চলতে চাইছিল, সেটা এখন এই নির্জনতায় সিধুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সেগুলো ওর সামনে সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়াল।
পঁচিশ তারিখ সকালের ঘটনার পরের দিন থেকে অর্থাৎ পরশু দিন থেকে বৈশালী ফিজিক্স ক্লাসে আসছে না। আজ নিয়ে তিনদিন হল।
অয়ন করিডোরের অন্ধকার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিল। সেদিনের ঘটনাটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
বৈশালী কমপ্লেন করলে আবার প্রিন্সিপাল সান্যালের অফিস ভিজিট করতে হবে।
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
ওর মনের আয়নায় ভেসে উঠল সেদিন সকালের কথা। বৈশালীর নরম শরীরটার কথা। মেটাল নেটের সাথে ওর শরীরটাকে পিষে ফেলার সেই মুহূর্তগুলো। ডেনিম শর্টসের ওপর দিয়ে ওর নিতম্বে একটার পর একটা থাপ্পড়, বৈশালীর যন্ত্রণাকাতর অথচ কামার্ত শীৎকার...
সে অনুভব করল প্যান্টের ভেতর ওর লিঙ্গখানা শক্ত হয়ে আসছে।
কিন্তু সে নিয়ন্ত্রণটা হারালো কখন ?
ভাবতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বৈশালীর রাগে-ক্ষোভে লাল হয়ে ওঠা মুখটা আর কানে বেজে উঠল,
'কোন মায়ের গর্ভে তোমার মতো একটা কোল্ড, সেলফিশ দানব তৈরি হয়, আমার জানতে ইচ্ছে করে!'
মুহূর্তের মধ্যেই অয়নের শরীর শক্ত হয়ে গেল। মাথাটা দপদপ করে উঠল।
মুখে সে যাই বলুক, বৈশালী যখন ওকে গালি দিচ্ছিল, তখন ওর অতটা রাগ হয়নি। কিন্তু যেই ও অয়নের 'মা'-কে টেনে আনল, অমনি নিজের অজান্তেই ওর মনের ভেতরে একটা অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দরজা খুলে গিয়েছিল।
অয়ন নিজের মনেই থমকে গেল। সে সেদিন বৈশালীকে শাস্তি দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই তীব্র আক্রোশ, সেই ডমিনেশন... ওগুলো কি সত্যিই বৈশালীর জন্য ছিল?
না।
অয়নের শ্বাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এল। বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে ছ্যাঁৎ করে উঠল।
সে স্পষ্ট বুঝতে পারল সেদিন ও বৈশালীর ওপর নিজের যে রাগের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল, তার লক্ষ্য বৈশালী ছিল না।
তার অবচেতন মন আসলে অন্য কাউকে শাস্তি দিতে চাইছিল।
সেই নারীকে, যে ওকে জন্ম দিয়েছে, যে ওর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, ওকে একার হাতে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।
সেদিনের শাস্তিটা সে আসলে বিদিশাকে দিতে চেয়েছিল। সে বিদিশাকে ওইভাবে নিজের নিচে পিষে ফেলতে চেয়েছিল, তাকে নিজের আয়ত্তে আনতে চেয়েছিল।
সে নিজের মায়ের শরীরের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ আর আদিম কামনা মেটানোর জন্য বৈশালীকে একটা প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করেছে!
সত্যিটা উপলব্ধি করার সাথে সাথে অয়নের মনে হল ওর শ্বাসনালীতে যেন কেউ একটা বরফের টুকরো গুঁজে দিয়েছে। ওর শ্বাস আটকে গেছে।
অয়ন নিজের হাতটা তুলে বুকের বাঁ দিকে রাখল। হার্টবিট পাগলের মতো ছুটছে।
সে কি ধীরে ধীরে একটা সাইকোপ্যাথে পরিণত হচ্ছে?
নিজেকে হঠাৎ করেই খুব অচেনা আর খুব নোংরা মনে হলো ওর।
ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাব-রুমের দরজাটা খুলল।
অয়নের চিন্তার সুতোটা এক ঝটকায় ছিঁড়ে গেল।
সে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত বর্তমানের মাটিতে ফিরে এল। পেশিগুলো আবার শিকারির মতো টানটান হয়ে উঠল।
সে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকাল।
করিডোরের মাঝামাঝি একটা ল্যাব রুমের দরজা খুলে বেরোচ্ছে সিধু আগরওয়াল।
একটু মোটা, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, কাঁধে একটা ব্যাকপ্যাক। হাঁটার ধরনে একটা নার্ভাস, সতর্ক ভাব। সিধু কখনো সোজা পথে হাঁটে না, সব সময় দেওয়াল ঘেঁষে, চারদিক স্ক্যান করতে করতে হাঁটে।
সিধু করিডোর ধরে এগিয়ে এসে সোজা গিয়ে বাঁ দিকের ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকল।
অয়ন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিঃশব্দে, দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে এগোতে শুরু করল। করিডোরের মেঝেতে জুতোর কোন শব্দ হলো না।
৫
ওয়াশরুমের ভেতরটা স্যাঁতস্যাঁতে, ফিনাইলের উগ্র গন্ধের সাথে ভিজে ভাব, পরিবেশটাকে গুমোট করে তুলেছে। মাথার ওপরের টিউবলাইটটা ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশনের কারণে একনাগাড়ে একটু পর পর জ্বলছে নিবছে, যা এই কলেজের সাথে বেমানান। এর ওপর বেসিনের একটা কল থেকে একটানা জল পড়ে যাচ্ছে, টিপ... টিপ...টিপ
সিধু বেসিনে ঝুঁকে মুখে জল দিচ্ছিল। এমন সময়...
'ক্লিক!'
দরজা লক হওয়ার শব্দটা ফাঁকা ওয়াশরুমের ঘরে ছড়িয়ে পড়লো। বদ্ধ বাথরুমে শব্দটা বেশ
জোরালো শোনাল।
আওয়াজ শুনে সিধু চমকে ঘাড় ঘোরাল। অয়নকে দেখে ওর কপালের ভাঁজ গভীর হলো।
অয়নের রেকর্ড ক্যাম্পাসে সবার জানা।
অয়ন কোন তাড়াহুড়ো করল না। সে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বেসিনের দিকে এগিয়ে এল। তারপর, পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে একটা কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট সিধুর দিকে বাড়িয়ে ধরল।
"আমার একটা ইনফরমেশন দরকার সিধু।"
অয়নের গলা একদম স্বাভাবিক।
সিধু চোখ পিটপিট করল। হাতের জলটা প্যান্টে মুছে নিয়ে নোটটার দিকে একবার তাকাল, তারপর অয়নের দিকে।
"কী ইনফরমেশন ভাই? আমার কাছে এখন কোন অ্যাসাইনমেন্টের সল্যুশন নেই।"
"অ্যাসাইনমেন্ট নয়। রুদ্রপ্রতাপ। তোদের রুডি। ওর সম্পর্কে জানতে চাই। ওর মুভমেন্ট, হ্যাংআউট, উইক পয়েন্ট।"
রুডির নামটা শোনামাত্র সিধুর মুখের রঙ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। ওর গলার কন্ঠাটা একবার ওঠানামা করল। সে পাঁচশো টাকার নোটটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
সিধু ঢোক গিলে বলল,
"ভাই... তুই ভুল দরজায় নক করছিস। আমি কিছু জানি না। তুই তোর টাকা নিয়ে যা।"
অয়ন মানিব্যাগ থেকে আরও একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করল।
"হাজার টাকা। জাস্ট কয়েকটা বেসিক ডিটেইলস। কেউ জানবে না তুই বলেছিস।"
সিধু এবার রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। টাকার লোভ ওর আছে, কিন্তু রুডির ভয় তার চেয়েও বেশি।
"তুই বুঝছিস না অয়ন!"
সিধু ফিসফিস করে বলল,
"রুডি কলেজের সাধারণ গুন্ডা নয়। টাকার জন্য আমি নার্সিংহোমে শুয়ে থাকতে পারব না ভাই। আমাকে যেতে দে।"
সিধু পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
অয়নের চোখের মণি দুটো এবার সরু হয়ে এল। সে নোট দুটো পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
সে বুঝতে পারল, সিধুর মনে টাকার লোভের চেয়ে রুডির ভয় অনেক বেশি। এমন কিছু করতে হবে যাতে সিধু মুখ খুলতে বাধ্য হয়।
অয়ন আর কথা বলল না।
সিধু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়নের ডান হাতটা সাপের মতো ছিটকে এসে সিধুর কলারটা মুঠো করে ধরল। তারপর সে এক হেঁচকায় সিধুকে পেছনের টাইলসের দেওয়ালে সজোরে চেপে ধরল।
সিধুর পিঠটা ঠান্ডা মার্বেলে আছড়ে পড়ল। অয়ন নিজের ডান হাতের কনুইটা সিধুর গলার ঠিক নিচে, কলারবোনের ওপর চেপে ধরল।
"উঁহ!"
সিধুর মুখ দিয়ে একটা যন্ত্রণাকাতর অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। ওর পা মেঝে থেকে এক ইঞ্চি ওপরে ভাসছে।
অয়ন নিজের মুখটা সিধুর মুখের একদম কাছে নিয়ে গেল। দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধান।
অয়নের চোখ দুটো কুচকুচে কালো, গলার স্বর ফিসফিসে, বরফের মতো ঠান্ডা।
"তুই ঠিকই বলেছিস, সিধু। রুডি হয়তো কাল সকালে তোর হাত-পা দুটোই ভেঙে দেবে..."
অয়ন কনুইয়ের চাপটা সামান্য বাড়াল, সিধুর শ্বাস আটকে আসতে শুরু করেছে।
"কিন্তু আমি এখন, এই মুহূর্তে তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তুই যদি আমাকে খবর না দিস, তবে কাল সকাল পর্যন্ত তোর হাত-পা, রুডির ভাঙার জন্য আস্ত থাকবে, তার গ্যারান্টি তুই দিচ্ছিস কীভাবে?"
সিধুর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসার জোগাড়। সে অয়নের কীর্তিকলাপের সাথে পরিচিত। ফেস্টের দিন যা হয়েছিল, সেটা কেউ ভোলেনি।
"ব...বলছি! বলছি ভাই, ছেড়ে দে!"
সিধু হাঁপাতে হাঁপাতে দুই হাত তুলে সারেন্ডার করল।
অয়ন কলারের গ্রিপটা সামান্য আলগা করল, কিন্তু ওকে দেওয়াল থেকে ছাড়ল না।
"বল।"
"রুডি... রুডি এমনিতে ক্যাম্পাসে খুব একটা থাকে না।"
সিধু দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে বলতে শুরু করল,
"কিন্তু প্রতি বছর নিউ ইয়ার্সের পার্টিগুলোতে ও আসে। একটু রাত করে... দশটার পর। সাথে পার্সোনাল সিকিউরিটি আর মেয়ে থাকে।"
"কোন পার্টি ?" অয়ন ভুরু কুঁচকালো।
"আমি... আমি জানি না ভাই। স্টুডেন্ট কাউন্সিল অফিশিয়ালি কোনো পার্টি অর্গানাইজ করে না। কাউন্সিলের মেম্বাররা ক্যাম্পাসের পপুলার স্টুডেন্টদের থ্রো করা প্রাইভেট পার্টিগুলোতে ঘোরে।"
"এরকম কটা পার্টি হচ্ছে এবার?"
"অনেকগুলো, তবে মেইন পার্টি তিন-চারটেই হয়। সব ইনভাইট-অনলি। প্রচুর মদ, ড্রাগস থাকে... আর, ওসব পার্টিতে শুধু স্টুডেন্টরা যায় না।"
"আর কে যায়?" অয়ন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
সিধু ঢোক গিলল।
"আমাদের কলেজের কালচার তো জানিসই। অনেক লেডি প্রফেসরও এই পার্টিগুলোতে আসে। বয়ফ্রেন্ডদের সাথে নাচাগানা করে, ড্রিঙ্ক করে। ওপেন সিক্রেট।"
কথাটা সিধু হয়তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য একটা বাড়তি ইনফরমেশন হিসেবে দিয়েছিল। কিন্তু শব্দগুলো অয়নের কানে পৌঁছতেই ও একটা তীব্র ঝাঁকুনি খেল।
'লেডি প্রফেসররাও আসে।'
মুহূর্তের মধ্যে অয়নের চোখের সামনে গতকাল সকালের জিমের দৃশ্যটা ভেসে উঠল।
সুরঙ্গনা।
হলুদ স্পোর্টস ব্রায়ের খাঁজ থেকে উঁকি দেওয়া ভারী বুক, ঘামে ভেজা নির্মেদ উন্মুক্ত পেট, গোটা শরীরে জমে থাকা পুঁতির মতো স্বচ্ছ ঘামের বিন্দু, তার শরীর থেকে ভেসে আসা মাতাল করা মিষ্টি গন্ধ, গালের হালকা রক্তিম আভা, ওর একদম কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলা।
অয়নের মনে হচ্ছিল জিমের স্পেসে একান্তই তাদের দুজনের একটা প্রাইভেট এক্সক্লুসিভ জোন তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এখন, সিধুর কথা শুনে অয়নের মাথায় অন্য একটা কল্পনা দানা বাঁধল।
নিউ ইয়ার্সের পার্টি। আবছা আলো, কান ফাটানো মিউজিক, অ্যালকোহলের গন্ধ। আর সেখানে সুরঙ্গনা ব্যানার্জী... একটা রিভিলিং পার্টি ড্রেস পরে কোন বারে বা ডান্স ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে মদের গ্লাস। সে মদ্যপ অবস্থায় অন্য কোন কলিগ বা কোন স্টুডেন্টের সাথে হাসাহাসি করছে, ঘনিষ্ঠ ভাবে নাচছে। কেউ ওর সরু কোমরে হাত রাখছে, ওর ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে চুমু খাচ্ছে।
দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসতেই অয়নের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা একটা তীক্ষ্ণ, জ্বালা ধরানো যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল।
ঈর্ষা? পজেসিভনেস?
অয়ন নিজের এই অনুভূতিটাকে তীব্রভাবে অপছন্দ করল, কিন্তু সেটাকে অস্বীকার করতে পারল না।
সুরঙ্গনা স্বাধীনচেতা, প্রচণ্ড আনপ্রেডিক্টেবল একজন মহিলা। সে যা খুশি করতে পারে।
নিজের অজান্তেই অয়নের হাতের মুঠো সিধুর কলারের ওপর আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল।
"আহ! অয়ন... লাগছে ভাই!"
সিধু কঁকিয়ে উঠল।
অয়ন ঘোর থেকে বেরিয়ে এল। নিজের দুর্বলতাটাকে সে মনের ভেতর তালাবন্ধ করে ফেলল।
"রুডি কোন পার্টিতে যাবে, তার কোন গ্যারান্টি নেই বলছিস ?"
অয়ন ঠান্ডা গলায় আবার জেরায় ফিরল।
"না... তবে..."
সিধু ঢোক গিলল। ওর চোখ দুটো ভয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে।
"তবে... আমার কাছে একটা উড়ো খবর আছে। বিক্রম হয়তো বৈশালীর নিউ ইয়ার্স পার্টিতে যেতে পারে। বৈশালী এবার বিশাল প্রাইভেট স্পেস ভাড়া করেছে।"
সিধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
"আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি না ভাই, তবে কাউন্সিলের কিছু কোর মেম্বার ওখানে ফর শিওর হাজির থাকবে।"
অয়নের ভ্রূ কুঁচকে গেল।
"বিক্রম বৈশালীর পার্টিতে যাবে কেন? বৈশালী তো ওর সার্কেলের কেউ নয়।"
"সেটাই তো পয়েন্ট!"
সিধু একটু সাহস পেয়ে বলল,
"ও বৈশালীদের পার্টিতে যেতে পারে মানে... হয়তো বিক্রমকে কেউ ইনভাইট করে এসেছে, অথবা... ওখানে এমন কেউ আসছে যাকে বিক্রম টার্গেট করেছে।
এর বেশি আমি কিচ্ছু জানি না ভাই, ভগবান কসম!"
অয়ন আস্তে আস্তে সিধুর কলারটা ছেড়ে দিল।
সিধু টলতে টলতে বেসিনের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।
অয়ন আর সিধুর দিকে তাকাল না। ওর চিন্তার মোড় এখন সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরে গেছে।
বৈশালী আর জিনিয়ার পার্টি। জিনিয়া ওকে সেদিন মাঠেই ইনভাইট করেছিল। ও ঘুরিয়ে 'না' বলে দিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পালটে গেছে।
বিক্রম যদি ওই পার্টিতে আসে, তবে বিক্রমের আসল মোটিভ বোঝার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।
অয়ন ধীরেসুস্থে পকেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে সিধুর পকেটে গুঁজে দিল।
"কিপ ইট। এই কনভারসেশনটার কথা যেন তৃতীয় কেউ না শোনে। যদি শোনে..."
"কেউ জানবে না ভাই! কেউ না!"
সিধু টাকাটা খামচে ধরে জোরে জোরে মাথা নাড়ল।
অয়ন পিছন ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াল। ছিটকিনিটা খুলে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে সে একবার ঘাড় ঘোরাল সিধুর দিকে।
অয়ন আর কোনো কথা না বলে ঘুরে ওয়াশরুম করিডোরের আবছা অন্ধকারে বেরিয়ে এল।
পরিস্থিতি খুব অদ্ভুতভাবে অন্যদিকে বাঁক নিয়েছে। ওকে ওই পার্টিটায় যেতেই হবে।
আবার ওকে বৈশালীর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।