মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৭৮

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6313768.html#pid6313768

🕰️ Posted on September 13, 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2127 words / 10 min read

Parent
৪ ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ  সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। পার্টি জিনিসটা কোনোদিনই বিদিশার পছন্দের তালিকায় ছিল না। চিরকালই তিনি একটু অন্তর্মুখী, লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের নিভৃত জগতে থাকতেই ভালোবাসেন। অথচ একটা সময় ছিল যখন না চাইতেও ওনাকে নিয়মিত পার্টিতে যেতে হতো। এক্সিকিউটিভ গালা, পাঁচতারা হোটেলের ককটেল নাইট কিংবা বিজনেসম্যানদের সাথে লাভিশ গেট-টুগেদারে তাকে উপস্থিত থাকতেই হতো। কিন্তু ইতালির সেই মর্মান্তিক ঘটনার পরে 'পার্টি' শব্দটাই বিদিশার কাছে একটা আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। বদ্ধ ঘরের ভেতরে উচ্চগ্রামের মিউজিক, থিকথিকে ভিড় আর আলো-আঁধারির খেলা দেখলেই ওনার দমবন্ধ হয়ে আসত। মনে হতো বাতাসের অক্সিজেন যেন কমে আসছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। আজও তিনি আসতে চাননি। কিন্তু এটা ওনার চাকরির জায়গা, পেশাদার জীবনের প্রথম বছরেই অফিশিয়াল নিমন্ত্রণ এড়িয়ে বাড়িতে বসে থাকা দৃষ্টিকটু দেখায়। তার উপর বিদিশার সিনিয়রিটি বলতে কিছুই নেই, চাকরির ছয়মাসও হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল এড়ানো অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়েই তাঁকে আজ এখানে আসতে হয়েছে। তবে, এখানে পা রাখার পর বিদিশার ভেতরের জমে থাকা আশঙ্কার মেঘটা খানিকটা হলেও হালকা হলো। পার্টি বলতে সাধারণ মানুষের মনে অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনা বা কানের পর্দা ফাটানো মিউজিকের ছবি ভেসে ওঠে, তার ছিটেফোঁটাও এখানে নেই।  অবশ্য তার বোঝা উচিত ছিল যে এটা একটা নামী কলেজের নিজস্ব এক্সক্লুসিভ পার্টি, যার নাম 'অফিসিয়াল নিউ ইয়ার্স ইভ গালা'। এখানে প্রবেশাধিকার কেবল ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার, কলেজের প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান আর হাতে গোনা কয়েকজন আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথির। এখানে ওসব হওয়া অসম্ভব। মেইন বিল্ডিংয়ে যে এরকম একটা জবরদস্ত হলঘর আছে সেই বিষয়ে বিদিশার কোন ধারণা ছিল না। দেখলেই বোঝা যায় যে এই ঘরটি ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হয়েছিল। তারা মেন বিল্ডিংয়ে ব্রিটিশ আমলে তৈরি যেসব বৃহৎ রুমে ক্লাস নেন, এই ঘরটির উচ্চতা তার প্রায় দ্বিগুণ। সিলিং জুড়ে সূক্ষ্ম প্লাস্টার অফ প্যারিসের কারুকার্য আর তার ঠিক মাঝখান থেকে ঝুলে রয়েছে সুবিশাল তিনটে বেলজিয়াম কাঁচের ঝাড়বাতি। সেই ঝাড়বাতির সোনালী মোলায়েম আলো পলিশ করা ইতালিয়ান মার্বেলে ঠিকরে পড়ে পুরো ঘর জুড়ে এক রাজকীয় রোশনাই তৈরি করেছে। দেওয়াল জুড়ে রয়েছে তামাটে ফ্রেমের তেলরঙের পোর্ট্রেট, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন খ্যাতনামা উপাচার্যদের গম্ভীর মুখগুলো যেন ওপর থেকে পুরো আয়োজনের ওপর নজর রাখছে। হলের উত্তর দিকে, দীর্ঘ বার্মিজ টিক কাঠের প্যানেল করা দেওয়ালের কোল ঘেঁষে সাজানো রয়েছে ক্যাটারিং টেবিল। সাদা ধবধবে টেবিলক্লথের ওপর রাখা রুপোলি ক্যান্ডেলস্ট্যান্ড। আর তার পাশে রাখা রয়েছে লাইভ ক্যাটেরিং কাউন্টার, নামী কেটারারের এক্সক্লুসিভ কন্টিনেন্টাল আর ইন্ডিয়ান বুফে স্টল। হলঘরের মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে ভারী সেগুন কাঠের রাউন্ড টেবিল, যার ওপর পাতা ধবধবে সাদা রেশমি টেবিল ক্লথ, তার মাঝখানে কাঁচের ফুলদানিতে তাজা রজনীগন্ধা ও লাল গোলাপের তোড়া। কোণের দিকে আর দেওয়াল ঘেঁষে রয়েছে বেশ কিছু লেদারের সোফা।   একপাশে কাঠের ব্যুফে কাউন্টারে রুপোলি ক্যাটলারির মৃদু টুংটাং শব্দ আর অন্য পাশে সুদৃশ্য কাট-গ্লাসের ট্রলিতে পরিবেশন করা হচ্ছে হালকা লাল ও সাদা ওয়াইন, শ্যাম্পেন এবং ফ্রুট ককটেল। বিদিশা আমন্ত্রিত অতিথিদের পোশাক-আশাক দেখে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এখানে, অধ্যাপকেরা প্রায় সবাই ডার্ক স্যুটে সুসজ্জিত, দু-একজন প্রবীণ প্রফেসর আবার সাবেকি বন্ধগলা আর সিল্কের উত্তরীয় জড়িয়ে এসেছেন। শিক্ষিকারা বেশিরভাগই পরেছেন বালুচরী, কাঞ্জিভরম কিংবা মাইসোর সিল্কের সাবেকি শাড়ি। গলার বা কানের অলঙ্কার অত্যন্ত সংযত। ক্যাটারিং বয়রা ধবধবে সাদা শার্ট, কালো ভেস্ট আর বো-টাই পরে নিঃশব্দে কাঁচের গ্লাসে কোল্ড ফ্রুট-পাঞ্চ আর অ্যাপেটাইজার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অতিথিদের হাতে ট্রে থেকে তুলে নেওয়া ককটেল বা মকের কাপ, ঠোঁটের কোণে মাপা ডিপ্লোম্যাটিক হাসি। কেউ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। কথা বলছেন নিচু স্বরে, পরিমিত গলায় যাতে কোনো অবস্থাতেই ঘরের ডেকোরাম নষ্ট না হয়। বিদিশা হলঘরের এক্কেবারে উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটা কোণে লেদার সোফায় গা বাঁচিয়ে বসলেন। আজকের এই সন্ধ্যার জন্য বিদিশা বেছে নিয়েছেন অত্যন্ত মার্জিত এবং রুচিসম্মত একটি পোশাক। ওনার পরনে একটি পেস্তা-সবুজ রঙের  খাঁটি বেনারসী সুতি-সিল্কের শাড়ি। শাড়ির কোল জুড়ে জরি দিয়ে বোনা ছোট ছোট কলকা আর চওড়া পেতলে-রুপোলি বর্ডার যা হলের বেলজিয়াম ক্রিস্টালের আলোয় এসে এক চমৎকার দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা কনুই-হাতা ব্লাউজ, পিঠের দিকটা শালীনভাবে ঢাকা। গলায় একছড়া পাতলা প্ল্যাটিনামের চেইনে বসানো একটা মুক্তোর লকেট আর কানে দুটো ছোট্ট সোনার টপ; এছাড়া তাঁর শরীরে বাড়তি কোনো গহনা নেই। ডান হাতের কবজিতে একটা সরু লেদার-স্ট্র্যাপ ঘড়ি। চুলটা পেছনের দিকে কায়দা করে ফ্রেঞ্চ রোপ বিনুনি করে কাঁধের একপাশে ফেলা। মুখে হালকা মেকআপ আর ঠোঁটে লিপস্টিক। বিদিশা আলতো করে নিজের কোলের ওপর রাখা পেস্তা-সবুজ ক্লাচ ব্যাগটা চেপে ধরে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের পরিচিত মুখগুলোকে খুঁজতে লাগলেন। তার সৌন্দর্য হলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন প্রফেসর ও আমন্ত্রিত অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করল ঠিকই, কিন্তু বিদিশা সেটা লক্ষ্য করলেন না।  নন্দিতাদিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয়ই যথারীতি শেষ মুহূর্তে কোনো ঝামেলার কারণে আসতে পারেননি বা হয়তো লেট করছেন। রাহুল বোস এখনও আসেননি মনে হচ্ছে। হঠাৎ এক জায়গায় চোখ পড়তেই বিদিশার মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গেল। হলের পূর্ব দিকে, ক্যাটেরিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে সুব্রত সেন একদল লোকের সাথে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলছেন। বিদিশার দৃষ্টি অনুভব করেই হয়তো সুব্রত সেন আচমকা ঘাড় ঘোরালেন। দুজনের চোখাচোখি হলো। মুহূর্তের মধ্যে সুব্রত সেনের চোখে ভয় আর অস্বস্তি মেশানো ভাব খেলে গেল। কিন্তু, বিদিশা সেটার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত শীতলভাবে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। পার্টির এই টানটান শৃঙ্খলা, ধ্রুপদী আবহ আর গম্ভীর পরিবেশের মাঝেও বিদিশার মনে ধীরে ধীরে অস্বস্তি দানা বাঁধতে লাগল। যতদিন তিনি নিছক একজন গৃহবধূ ছিলেন, গৃহকোণের চার দেওয়ালে বন্দি ছিলেন, ততদিন ওনার মনে হতো এই সংসারটা তিনি একা হাতে আগলাচ্ছেন।  অথচ, বিনিময়ে না পেয়েছেন ভালবাসা আর পেয়েছেন প্রাপ্য সম্মান। তার স্বামী থেকেও নেই; তার পরম আদরের সন্তান একটিবারও তার কথা না ভেবে বাড়ি ছেড়ে তাকে একা ফেলে হোস্টেলে চলে এল। বিদিশার মনে সবার ওপর পুঞ্জীভূত অভিমান জমেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, এই খাঁচা থেকে বেরিয়ে কাজের জগতে যোগ দেবার পরে এই একাকীত্ব বোধহয় কেটে যাবে। নিজের একটা জগত তৈরি হবে, মনের শূন্যতাটুকু মুছে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হলো?  তাঁর একাকীত্ব একবিন্দুও কমেনি। কলেজ থেকে ফিরে যখন তিনি নিজের বাড়িতে পা রাখেন, তখন নিঝুম বাড়িখানা তাঁকে গিলতে আসে। কিন্তু, বছরের পর বছর এভাবে থাকতে থাকতে এই অনুভূতির সাথে বিদিশা মানিয়ে নিয়েছেন।  তার ওপর কলেজে যোগ দেওয়ার পর তিনি যা দেখলেন, তা ওনার কল্পনারও বাইরে ছিল।  বিদিশা কখনো চাকরি করেননি। তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কম। তিনি ভাবতেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানেই হলো পবিত্র জায়গা, আদর্শের জায়গা। কিন্তু এখানে আসা অবধি তিনি দেখলেন নোংরা পলিটিক্স, রেষারেষি, কাদা ছোড়াছুড়ি, হিংসা আর পেছনে ছুরি মারা।  তিনি এক বুক আদর্শ নিয়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আর এখন তাকে শুনতে হচ্ছে এর আগে এই কলেজের এক্স স্টুডেন্টরা নাকি মার্ডার অবধি করেছে। তার ওপর এখন যুক্ত হয়েছে ওনার অতীত জীবনের রহস্য। 'দেবাশ্রয়'-এ গিয়ে নিজের মায়ের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে তিনি যে ধাঁধার মুখে পড়েছেন, তাতে বিদিশার মন আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। সুচরিতা মুখোপাধ্যায়, তার মা; রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন নিজের সাথে পরিবারের কোনো মহামূল্যবান সম্পদ নিয়ে? কোন সম্পদ? বাগবাজারের ঐ বাড়িতে পরের বার ঢুকতে দেবে বলে তো মনে হয় না।  বিদিশা বুঝতে পারছিলেন, তিনি এক চরম ঘূর্ণাবর্তের মাঝে এসে পড়েছেন। নিস্তরঙ্গ নদী ভেবে যেখানে পা দিয়েছিলেন, সেখানে একটা মারাত্মক চোরাবালি যে অপেক্ষা করছিল সেটা তার জানা ছিল না। এখন আর পিছিয়ে আসার কোনো রাস্তা নেই।  "আরে, মিস গাঙ্গুলি! এখানে একা একা বসে কী চিন্তা করছেন?" চেনা কন্ঠের আওয়াজে বিদিশার চিন্তার সূত্র আচমকা ছিঁড়ে গেল। তিনি মুখ তুলে তাকালেন। সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন অনামিকা রায়।  বিদিশা আশা করেননি এখানে এভাবে অনামিকার দেখা পাবেন। অনামিকার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না তাঁর। মনে মনে অপ্রস্তুত হলেও, তিনি নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা মার্জিত হাসির আড়ালে ঢেকে সৌজন্যবোধ দেখিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। "নমস্কার মিস রায়। না, বিশেষ কিছু নয়... একটু রিল্যাক্স করছিলাম।" "রিল্যাক্স? এরকম মনমরা হয়ে একা একা বসে থাকতে আছে নাকি? আসুন আমার সাথে, আজ আপনাকে আমাদের কয়েকজন ফ্যাকাল্টিদের সাথে আলাপ করিয়ে দিই!" চেনা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমায় কথাগুলো বলে অনামিকা বিদিশার এক হাত ধরে তাকে একপ্রকার টেনেই দাঁড় করিয়ে দিলেন।  বিদিশা আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই অনামিকা ওনাকে প্রায় টেনে নিয়ে এলেন হলের মাঝামাঝি একটি সুদৃশ্য রাউন্ড টেবিলের পাশে। সেখানে ইতিমধ্যেই চার-পাঁচজন কমবয়সী শিক্ষিকা আড্ডায় মগ্ন। বিদিশার দেখে মনে হল এদের সবার বয়স ছাব্বিশ থেকে তিরিশের কোঠায়।  "গার্লস! মিট মিস বিদিশা গাঙ্গুলি, ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের নতুন সেনসেশন!"  অনামিকা কায়দা করে বিদিশাকে ইন্ট্রোডিউস করলেন। মেয়েরা সবাই বিদিশাকে দেখে মৃদু হেসে সৌজন্য বিনিময় করল। তারপর অনামিকা একে একে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। কেউ ইতিহাস, কেউ অর্থনীতি, কেউ সমাজতত্ত্ব আবার কেউ বাংলা সাহিত্যের ফ্যাকাল্টি।  বিদিশার ম্যাথ ডিপার্টমেন্ট মেইন বিল্ডিংয়ে অবস্থিত। সেখানে ম্যাথ বাদ দিয়ে অন্য কোন সাবজেক্টের ক্লাস এখন আর নেওয়া হয় না। ক্লাসরুম, টিচার্স লাউঞ্জ আর লাইব্রেরী বাদ দিলে বিদিশা নিজের কেবিন ছেড়ে কোথাও বেরোন না। তাই এসব টিচারদের সাথে তাঁর দেখা হবার প্রশ্নই ওঠে না। বিদিশা টেবিলে বসবার দু-তিন মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারলেন, এদের আলোচনার বিষয়বস্তু অ্যাকাডেমিক্স বা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নয়। এদের আলাপের মূল কেন্দ্রবিন্দু হল কলেজের কমবয়সী, আকর্ষণীয় পুরুষ ছাত্ররা! "না রে, ফোর্থ সেমিস্টারের রোহনটাকে দেখবি..."  ইকনমিক্সের তরুণী শিক্ষিকা জ্যুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলছিলেন,  "স্পোর্টস মিটের দিন যখন বাস্কেটবল কোর্টে স্লিভলেস গেঞ্জি পরে ড্রিবল করছিল... ওফ! ওয়াট আ ফিজিক! ক্লাসে যখন অ্যাটেনডেন্সের জন্য ম্যাম বলে তাকায়, মনে হয় যেন সোজাসুজি বুলেটের মতো এসে বিঁধছে!" "আরে ছাড় তো তোর বাস্কেটবল প্লেয়ার!"  হিস্ট্রির এক শিক্ষিকা হেসে উঠে যোগ করলেন,  "ক্রিকেট টিমের ওই নতুন ফার্স্ট বোলারটাকে দেখেছিস? কী যেন নাম... অরিজিৎ? জিম থেকে যখন কম্প্রেশন টি-শার্ট পরে বেরোয়, মাসলগুলো দেখলে মনে হয় যেন প্রফেশনাল মডেল! গত সপ্তাহে অ্যাসাইনমেন্টের নাম করে আমার কেবিনে ২০ মিনিট বসে ছিল, গায়ের আফটারশেভের গন্ধে পুরো রুম ড্রাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল!" কথাগুলো শুনে বিদিশার মার্জিত রুচিবোধ আর নীতিবোধে এক তীব্র ধাক্কা লাগল। ওনার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কঠিন, শক্ত হয়ে উঠল। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্কের একটা নির্দিষ্ট পবিত্রতা ও সীমারেখা থাকা উচিত; এটা বিদিশার জীবনের মূল শিক্ষার অংশ। কমবয়সী ছেলেদের শরীর, মাসল আর তাদের তাকানো নিয়ে প্রফেশনাল টিচারদের এরকম প্রকাশ্য, চটুল রসিকতা বিদিশার মন একবিন্দুও গ্রহণ করতে পারল না। তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন যে কলেজের প্রথম দিন এক তরুণ প্রফেসরকে এক ছাত্রীর সাথে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন। এমন সময় হঠাৎই... বিদিশার মাথায় একটা শব্দ বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল। ফুটবল। "অয়ন তো ফুটবল খেলে!" এটা মনে আসা মাত্রই বিদিশার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল।  অয়ন এত সুন্দর ছিল যে, কেউ একবার ওকে কোলে নিলে, সে আর ওকে ছাড়তে চাইতো না। ধবধবে ফর্সা চামড়া, কুচকুচে কালো বড় বড় নিষ্পাপ চোখ, তুলতুলে নরম গাল, মিষ্টি হাসি আর দেবশিশুর মতো মুখ! কিন্তু , একইসাথে ও আবার ভীষণ স্পর্শকাতর আর লাজুকও ছিল। অচেনা কারো কোলে দু-মিনিটের বেশি টিকতে পারতো না। প্রথমে ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাত, তারপর মায়ের কোলে ফেরার জন্য আঁকুপাঁকু করত। যতক্ষণ না বিদিশা ওকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরতেন, ততক্ষণ ওর কান্না থামত না। বিদিশা কোলে নেবার সাথে সাথেই সে ওঁর কানের কাছে মুখ গুঁজে ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ওনার গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকত। আর তারপর?  অবধারিতভাবে দেখা যেত, তার ছেলেটার উপর কারোর না কারোর হিংসুটে নজর লেগে গেছে। সারা রাত আর ঘুমোত না অয়ন, পেটের যন্ত্রণায় কঁকাত, প্রচণ্ড জ্বর উঠত। বিদিশা সারা রাত জেগে কোল্ড-কমপ্রেস দিতেন, ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিতেন, নজর কাটানোর জন্য রাতে ওর কানের পেছনে কাজলের ফোঁটা লাগিয়ে দিতেন। এরকম কত রাত যে জেগে বিদিশা, অয়নের মাথায় জলপট্টি দিয়েছেন, নজরের নজরছাঁট পুড়িয়েছেন! অথচ, তাকে ত্যাগ করে হোস্টেলে চলে আসতে সেই ছেলে একবারের জন্য ভাবল না। মনের গোপন কুঠুরি থেকে ভেসে আসা ক্রুদ্ধ কন্ঠস্বরটা সঙ্গে সঙ্গে চাপা দিলেন বিদিশা।  বড় হলে সবাই নিজের নিজের জগত বেছে নেয়। এতে রাগের কিছু নেই। আজ অয়ন নিজের আলাদা জগত বেছে নিয়েছে। কিন্তু, সেই জগতের চারপাশটা যে কতটা বিষাক্ত, সেটা কি সে জানে? চারপাশের হাসির শব্দগুলো বিদিশার কানে তীক্ষ্ণ কাচের টুকরোর মতো বিঁধছিল। তার চোয়াল হঠাৎ করে শক্ত হয়ে এল, শাড়ির নিচে বুকের খাঁচাটা রাগে, উত্তেজনায় দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। 'কী অসভ্য, নোংরা পরিবেশ!'  বিদিশা নিজের মনে মনে গর্জে উঠলেন। যে শিক্ষিকারা এখানে বসে অন্য ছাত্রদের শরীর নিয়ে এভাবে নোংরা আলোচনা করছে, সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের টিচাররা কখনো তার ছেলেটাকে নিয়ে এভাবে আলোচনা করেনি তো ? ভাবনাটা মনে আসতেই বিদিশার মুখটা তিতকুটে স্বাদে ভরে গেল। রাগে ওনার রক্ত গরম হয়ে উঠতে লাগল। নিজের ওপর চরম ক্ষোভ জন্মাল ওনার। তার ছেলেকে এই নোংরা, কালচারলেস কলেজে পড়তে পাঠানোই ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল! প্রেসিডেন্সি কিংবা সেন্ট জেভিয়ার্সের মতো নামী কলেজগুলো কি এমন খারাপ ছিল?  সেখানেও তো পড়াশোনার পরিবেশ, হেরিটেজ, কালচার সবই আছে! কিন্তু না! বাবুকে তো হোস্টেল লাইফ কাটাতে হবে! ওনার স্বাধীনতা চাই! আর বিদিশাও ছেলে বড় হয়েছে মনে করে ভীষণ কষ্ট হলেও তার আবদার হাসিমুখে মেনে নিলেন!  বিদিশার মনে হলো, সেদিন ওনার আরও শক্ত হওয়া উচিত ছিল। মা হিসেবে ওনার অয়নের উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত ছিল! আজ যদি ওনার শক্ত বাঁধন থাকতো, তবে অয়নকে এই রকম পরিবেশে পড়াশোনা করতে হতো না! "বিদিশা? কী হলো আপনার? হঠাৎ অমন গম্ভীর হয়ে গেলেন যে?" অনামিকার কৌতূহলী গলার প্রশ্নে বিদিশার কল্পনার জগত এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি সজাগ হয়ে দেখলেন, টেবিলের চার-পাঁচজোড়া চোখ ওনার মুখের শক্ত, থমথমে এক্সপ্রেশনের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। বিদিশা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। নিজের মেকি ভদ্রতা মুখোশটা মুখে টেনে এনে একচিলতে অপ্রস্তুত হাসি ফুটিয়ে বললেন, "না না... তেমন কিছু নয় মিস রায়। জাস্ট ভাবছিলাম, হঠাৎ ওয়েদারটা বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠেছে মনে হচ্ছে।" অনামিকা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বিদিশার নজর চলে গেল ব্যাঙ্কোয়েট হলের মূল এন্ট্রান্সের দিকে। ভারী মেহগনি কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করছেন রাহুল বোস। ওনার পরনে একটা গাঢ় নেভি-ব্লু ব্লেজার, ধবধবে সাদা শার্ট আর মার্জিত টাই।  রাহুলের উপস্থিতিই বিদিশার মনে স্বস্তির হাওয়া বয়ে নিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। এক লহমায় তার মুখ স্বতঃস্ফূর্ত হাসিতে ভরে গেল। তিনি এই নোংরা পরিবেশ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ খুঁজে পেলেন। তিনি অনামিকার দিকে তাকিয়ে হালকা ঘাড় নেড়ে মার্জিত ভাবে বললেন,  "এক্সকিউজ মি, মিস রায়। আমার ডিপার্টমেন্টের একজন ফ্যাকাল্টি এইমাত্র ঢুকলেন। আমাকে একটু ওনার সাথে কথা বলতে হবে।" অনামিকা কিছু বলার আগেই নির্জলা মিথ্যা কথাটা বলে বিদিশা তার শাড়ির আঁচলটা সামলে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
Parent