একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA - অধ্যায় ৪
চতুর্থ পর্ব:
ঢাকা শহরের মতিঝিলের আকাশচুম্বী ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর সতেরো তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে সেই আলিশান কেবিন। ঘরের এসিটা আগের মতোই নিখুঁত ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করা, মার্বেল পাথরের মেঝেতে জুতোর কোনো শব্দ হয় না, জানলার বাইরে বিকেলের পড়ন্ত রোদে ব্যস্ত ঢাকার চঞ্চল রাস্তাঘাট। কিন্তু এই নিখুঁত ও শীতল পরিবেশের ভেতর আজ এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছে।
চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের মহামূল্যবান মেহগনি কাঠের এক্সিকিউটিভ টেবিলে বসে আছেন। তাঁর সামনে খোলা রয়েছে কয়েক কোটি টাকার একটি নতুন প্রজেক্টের ফাইল, যার ওপর বড় বড় অক্ষরে ফিনান্সিয়াল অডিট রিপোর্ট প্রিন্ট করা। কিন্তু বিগত দুই ঘণ্টা ধরে তিনি ওই ফাইলের একটি লাইনও পড়তে পারেননি। তাঁর ডান হাতের মন্টব্লংক পেনটা স্থির হয়ে টেবিলের ওপর পড়ে আছে।
তাঁর মাথার ভেতরে কেবল একটাই মুখ বারবার ক্যালাইডোস্কোপের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে—ইতি।
সেই ফর্সা মুখাবয়ব, খোপা করে বাঁধা চুল, বড় বড় মায়াবী চোখ, আর পরনের সেই হালকা হলুদ শাড়ি ও খোলামেলা ব্লাউজের অবয়ব। গতকাল দুপুরে মালেকের ছোট্ট ফ্ল্যাটে যা ঘটেছিল, তারপর থেকে আলতাফ সাহেবের ভেতরের সমস্ত শৃঙ্খলা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ত্রিশ বছরের কর্পোরেট জীবনে তিনি কখনো কোনো বিষয়ের প্রতি এতখানি অমনোযোগী হননি। তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। বুকটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে।
তিনি চেয়ার থেকে হঠাৎ এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন। বড় কাঁচের জানলার সামনে এসে হাত দুটো পকেটে গুঁজে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু বাইরের কোনো দৃশ্যই তাঁর চোখে পড়ছিল না। তাঁর মনে শুধু বাজছিল ইতির সেই কাঁপাকাঁপা গলার ফিসফিসানি—"স্যার... বসুন না।"
তাঁর মনের ভেতর একটা তীব্র ছটফটানি শুরু হলো। তিনি আর এক মুহূর্তও এই এসির ঠান্ডা বাতাসে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর এই ব্যাকুলতার কোনো যুক্তি নেই, কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই—তবুও তাঁর পা দুটো যেন আর তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
-----
আলতাফ সাহেব আর দেরি করলেন না। তিনি নিজের স্যুট কোটটা গায়ে জড়িয়ে, টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা পকেটে পুরে সতেরো তলা থেকে সরাসরি লিফটে নিচে নেমে এলেন।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে মূল গ্লাস ডোর দিয়ে যখন তিনি বাইরে প্রাঙ্গণে এলেন, তখন দুপুরের রোদটা একটু নরম হয়ে এসেছে। কোম্পানির বিশাল মেইন গেটের সামনে তখন ডিউটি করছে আবদুল মালেক। মেরুন রঙের সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম পরে মালেক অত্যন্ত সততার সাথে গেটে দাঁড়িয়ে আসা-যাওয়া করা গাড়িগুলোর দিকে খেয়াল রাখছে।
চেয়ারম্যান সাহেবকে নিজের দিকে হেঁটে আসতে দেখে মালেক চমকে উঠল। সে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সম্মান ও ভক্তির সাথে স্যালুট ঠুকল।
খুব বড় গলায় ও বিনীত সুরে মালেক বলে উঠল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার! আপনি এই সময়ে বাইরে? কোনো স্পেশাল ভিজিটর বা মিটিং আছে কি বাইরে, স্যার?"
কিন্তু আলতাফ সাহেব মালেকের দিকে তাকালেনও না। তাঁর মুখটা পাথরের মতো কঠিন ও গম্ভীর করা। তিনি মালেকের স্যালুটের কোনো জবাব না দিয়ে, বরফের মতো শীতল দৃষ্টিতে কেবল এক পলক তার দিকে তাকিয়ে সোজা নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
মালেক একটু থমকে গেল। সে অবাক হয়ে ভাবল, চেয়ারম্যান সাহেব কি কোনো কারণে রেগে আছেন? নাকি কোনো বড় কোনো কর্পোরেট টেনশনে আছেন?
কিন্তু মালেকের মাথায় ঘুণাক্ষরেও এই চিন্তা এল না যে, তাঁর এই অবহেলা বা উপেক্ষার পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ লুকিয়ে আছে। মালেক যেহেতু ডিউটিতে মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আছে, তার মানে একটাই—তার বাসাটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। আর এই একটা মাত্র তথ্যই আলতাফ সাহেবের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি অন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
আলতাফ সাহেব নিজের প্রিমিয়াম সেডান গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথেই গাড়ির এসি হুশ করেজেড়ে উঠল। তিনি স্টিয়ারিং হুইলে দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর হৃদস্পন্দন তখন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন—*ইতি এখন বাসায় একা। মালেক তো ডিউটিতে সারাদিন গেটেই থাকবে।*
এই একটিমাত্র সুপ্ত ভাবনা তাঁর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিল। তিনি গাড়িটাকে গ্যারেজ থেকে বের করে সোজা পুরান ঢাকার সেই চেনা গলিটার দিকে ছুটিয়ে দিলেন।
-----
আধঘণ্টা পর গাড়িটা সেই পুরোনো বিল্ডিংটার নিচে এসে বসল। আলতাফ সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে সোজা তিন তলায় উঠে এলেন। তাঁর পরনে সেই নিখুঁত স্যুট, চুলে সামান্য অগোছালো ভাব।
তিনি মালেকের ফ্ল্যাটের কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল। তিনি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজায় আলতো করে তিনবার টোকা দিলেন—*কটকটকট*।
ভিতর থেকে জুতোর মৃদু আওয়াজ এল। কেউ একজন দরজা খুলে দিল।
দরজাটা যখন পুরোপুরি ফাঁক হলো, তখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে দরজায় দাঁড়ানো ইতি থমকে গেল। তার চোখ দুটো বিস্ময়ে পুরোপুরি গোল হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আজ আবার এই ভরদুপুরে তাদের এই গরিবের ফ্ল্যাটের দরজায় স্বয়ং কোম্পানির চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন! আর এবার তো সাথে মালেকও নেই—মালেক তো !
ইতি পরনে সেই একই রকম ঘরোয়া পোশাকে ছিল—হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা স্লিভলেস ব্লাউজ। তার চুলগুলো আজও সুন্দর করে খোপা করে বাঁধা, কপালে সামান্য ঘামের ফোঁটা জমেছে। সে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সে দ্রুত দুই হাত জোড় করে নিচু হয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বলল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার! আপনি... আপনি হঠাৎ এই সময়ে? মালেক তো অফিসে, ও তো ডিউটিতে গেছে!"
আলতাফ সাহেব ঘরের ভেতরে ঢোকার জন্য এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখ দুটো ইতির মুখ থেকে নামিয়ে তার সুগঠিত শরীরের দিকে এক দৃষ্টিতে আটকে রইল। তাঁর দৃষ্টিতে এমন এক ধরনের তীব্র ক্ষুধা ও মোহ কাজ করছিল, যা দেখে ইতি সামান্য লজ্জা পেল এবং অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
আলতাফ সাহেব খুব ভারী ও নিচু গলায় বললেন, "জানি... মালেক অফিসে আছে, গেটে ডিউটি করছে। আমি জানি বলেই এসেছি।"
-----
ইতি দরজার সামনে থেকে একটু সরে গিয়ে পথ করে দিল। সে অত্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেল। একজন কোম্পানির চেয়ারম্যান এভাবে হুট করে গার্ডের বাসায় চলে আসাটা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, এর মধ্যে এক অদ্ভুত রহস্যময়তা রয়েছে।
ইতি দরজাটা পুরোপুরি মেলে ধরে নরম গলায় বলল, "আসুন স্যার... ভেতরে আসুন।"
আলতাফ সাহেব জুতো খুলে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন। ড্রয়িংরুমটা আগের মতোই পরিপাটি ও ছোট। তিনি সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে সোজা সেখানে বসে পড়লেন। তাঁর চোখ তখনো ইতির চালচলন ও শরীরের প্রতিটা বাঁকের ওপর নিবদ্ধ।
ইতি একটু দাঁড়িয়ে থেকে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, "স্যার... হঠাৎ কোনো সমস্যা হয়েছে কি? অফিসে কি মালেকের কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে, যার কারণে আপনি নিজে ছুটে এসেছেন?"
আলতাফ সাহেব সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন। তিনি পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে কপালটা মুছে শান্ত অথচ অদ্ভুত এক সুরে বললেন, "না, ইতি। অফিসে কোনো সমস্যা হয়নি। মালেকও ভালো কাজ করছে। আসলে... আমি এদিক দিয়ে একটা অফিশিয়াল কাজে যাচ্ছিলাম। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে হঠাৎ মনে হলো..."
তিনি একটু থামলেন। ইতির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, "গত পরশু দিন তোমাদের এখানে এসে তোমার হাতের রান্না খেয়েছি ঠিকই, কিন্তু তোমার হাতের চা তো আমার খাওয়া হয়নি। গতকাল সারাদিন অফিসে শুধু ওই চা আর তোমার কথাটাই মাথায় ঘুরছিল। তাই ভাবলাম, আজ যখন কাজের ফাঁকে এদিক দিয়ে যাচ্ছিই, তখন একটু ঘুরে যাই।"
কথাটা শোনার পর ইতির ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে কখনো কল্পনাও করেনি যে দেশের এত বড় একজন নামকরা শিল্পপতি তার হাতের চা খাওয়ার জন্য এতটা আকুল হয়ে একা একা তাদের এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে চলে আসবেন! তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আনন্দে ও সঙ্কোচে দুলে উঠল।
ইতি মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বলল, "স্যার! চা খাওয়ার জন্য তো এত দূর আসলেন! তা ছাড়া আমার হাতের চা... আপনি এত বড় মানুষ, আমার হাতের চা আপনার পছন্দ হবে কি না কে জানে!"
আলতাফ সাহেব সোফার হাতলে হাত রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, "তোমার হাতের চা পছন্দ না হওয়ার কোনো কারণ নেই। তুমি জলদি এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো তো দেখি। যেমন করে পারো, নিজের হাতে বানিয়ে নিয়ে এসো।"
"জি আচ্ছা স্যার, আমি এখনই বানাচ্ছি," বলে ইতি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল।
-----
ইতি রান্নাঘরের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে ড্রয়িংরুমটা পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আলতাফ সাহেব একা বসে রইলেন সোফায়। তাঁর বুকটা তখন প্রবল বেগে ধুকপুক করছে। তিনি পকেট থেকে তাঁর সেই সিলভার রঙের গোল্ডফ্লেকের কেসটা বের করলেন। তারপর একটা অত্যন্ত দামি বিদেশি সিগারেট বের করে মুখে গোঁজলেন। পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুন জ্বেলে একটা দীর্ঘ টান দিলেন।
মুখ দিয়ে ঘন ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী তিনি ছোট ড্রয়িংরুমের ছাদের দিকে ছেড়ে দিলেন। সিগারেটের তীব্র সুবাস চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু সিগারেটের এই ধোঁয়া তাঁর মনের আগুন নেভাতে পারল না, বরং তা আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। এই দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাট, যেখানে কোনো বিলাসবহুল আসবাব নেই, কোনো দামি এসি নেই—অথচ এই চার দেওয়ালের ভেতরে এমন এক মায়াবী নারী বাস করে, যা তাঁর বিশাল অট্টালিকা বা আলিশান ফ্ল্যাটের সমস্ত জৌলুসকে ফিকে করে দিয়েছে।
তিনি মনে মনে ভাবলেন—*মালেক কোথায়, আর ইতি কোথায়! এই মেয়েটি কি সত্যিই ওই সাধারণ গার্ডটার সাথে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য জন্ম নিয়েছে? এ কি কোনো সাধারণ মানুষের ঘর করার যোগ্য? না... এর প্রকৃত জায়গা তো অন্য কোথাও হওয়া উচিত ছিল।*
আলতাফ সাহেবের মনের গহীনে সেই নিষিদ্ধ এবং তীব্র আকাঙ্ক্ষাটা আবার ফুঁসে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতির সেই সদ্য ধোয়া খোপার চুল আর শাড়ির আঁচলের ফাঁক থেকে উঁকি দেওয়া সুগঠিত কোমর।
রান্নাঘর থেকে চায়ের কেটলিতে জল ফোটার মৃদু সাঁই সাঁই শব্দ ভেসে আসছে। সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে আলতাফ সাহেবের হৃদস্পন্দন আরও দ্রুত হতে লাগল। তিনি জানেন না এই খেলায় তিনি কোথায় গিয়ে ঠেকবেন, তবুও তিনি আর পিছিয়ে আসার কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারছেন না। সিগারেটের শেষ টান দিয়ে তিনি অ্যাশট্রেতে সেটা গুঁজে ফেললেন, আর ইতির ফিরে আসার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে সোফায় সোজা হয়ে বসে রইলেন।