একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA - অধ্যায় ৫
পঞ্চম পর্ব:
রান্নাঘরের ছোট্ট গ্যাস চুলার ওপর রাখা কেটলির জলটা ফুটে ওঠার পর ইতি খুব যত্ন করে দুধ, চা পাতা আর সামান্য আদা দিয়ে এক কাপ সুবাসিত লাল-দুধ চা তৈরি করল। একটা সুন্দর সিরামিকের কাপে সেই ধোঁয়া ওঠা চা ঢেলে সে যখন ড্রয়িংরুমে ফিরে এল, তখন পুরো ঘরটা আলতাফ সাহেবের মুখের জ্বালানো দ্বিতীয় সিগারেটের নীল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
আলতাফ সিরাজ চৌধুরী তখনো সোফায় একা বসে গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছিলেন। তাঁর চোখের সেই তীক্ষ্ণ কর্পোরেট দৃষ্টি এখন কেমন যেন এক গভীর উদাসীনতা ও ক্লান্তিতে ঢাকা। তাঁর মুখের সামনে রাখা গোল্ডফ্লেকের কেস থেকে আরেকটি সিগারেট তখন সবেমাত্র পুড়তে শুরু করেছে।
ইতি এসে অত্যন্ত সাবধানে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখল। তার পরনের হালকা হলুদ শাড়ি আর খোলামেলা ব্লাউজের স্নিগ্ধতা সেই ধোঁয়া ওঠা ধূসর পরিবেশেও এক অদ্ভুত আলোর আভা ছড়াচ্ছিল। সে নরম গলায় ডাকল, "স্যার... চা বানিয়ে এনেছি। একটু দেখুন তো কেমন হয়েছে।"
আলতাফ সাহেব তাঁর আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে হালকা করে গুঁজে নিভিয়ে ফেললেন। তিনি নিজের দৃষ্টি ইতির ওপর স্থির করে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় বললেন, "দাঁড়াও ইতি, চা তো এনেছই। কাপটা এখানে রাখো, আর সোফায় আমার পাশে এসে বসো তো একটু।"
কথাটা শোনার পর ইতি সামান্য চমকে উঠল। সে কিছুটা ইতস্তত করল, তার ফর্সা মুখাবয়ব হালকা লাল হয়ে উঠল। সে দ্বিধান্বিত গলায় বলল, "আমি... মানে, আমি তো এখানে দাঁড়িয়েই দিতে পারব স্যার। আপনার পাশে বসাটা কি ঠিক হবে?"
আলতাফ সাহেব এবার একটু জোরালো এবং নির্দেশমূলক অথচ মায়াবী গলায় বললেন, "কোনো অন্যায় বা ভুল হচ্ছে না। বলছি বসো, পাশে এসে বসো। তোমার সাথে কিছু কথা আছে।"
মালিক বা কোম্পানির সর্বোচ্চ কর্মকর্তার এই সরাসরি আদেশের সামনে ইতি আর না করতে পারল না। সে অত্যন্ত সংকোচ ও দ্বিধার সাথে সোফার এক কোণে, আলতাফ সাহেবের ঠিক পাশেই বসল। তাদের দুজনের শরীরের মাঝখানের দূরত্বটুকু তখন এতটাই কম যে ইতির শাড়ির আঁচল আলতাফ সাহেবের সুটকোটের কাপড়ের সাথে হালকা ছুঁয়ে গেল।
-----
আলতাফ সাহেব চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। কাপে চুমুক দেওয়ার আগে তিনি ইতির দিকে এক পলক তাকালেন, তারপর চায়ে একটা ছোট চুমুক দিলেন। আদার হালকা ঝাঁঝ আর দুধের নিখুঁত মিশ্রণে চায়ে এক চমৎকার স্বাদ এসেছে।
তিনি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের এক অচেনা ও ধূসর অতীত।
"চা চমৎকার হয়েছে, ইতি," আলতাফ সাহেব বলতে শুরু করলেন। তাঁর গলাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি নরম ও থমথমে শোনাল। "জানত, গত ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি শুধু টাকা, প্রফিট, ব্যালেন্স শিট আর কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ার পেছনে ছুটেছি। মানুষ ভাবে আলতাফ সিরাজ চৌধুরী একজন অত্যন্ত সফল মানুষ, যার জীবনে কোনো অভাব নেই। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে কী পরিমাণ শূন্যতা লুকিয়ে আছে, তা কেউ জানে না।"
ইতি খুব মন দিয়ে তাঁর কথা শুনছিল। সে বড় বড় চোখ দুটো মেলে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন একজন রূপকথার রাজার দুঃখের গল্প শুনছে।
আলতাফ সাহেব নিজের ডান হাত দিয়ে নিজের কপালটা একটু চেপে ধরে বলতে লাগলেন, "আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন আমার পকেটে একটাও টাকা ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল আমার ঘাড়ে। ছোট ভাই-বোনগুলোর মুখে দু'মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য আমি দিনে আঠারো ঘণ্টা কাজ করেছি। রাস্তায় ঘুরেছি, না খেয়ে থেকেছি, তীব্র অপমান সহ্য করেছি। তখন আমার মাথায় একটাই ভূত চেপেছিল—আমাকে বড় হতে হবে, আমাকে টাকা কামাতে হবে। কারণ আমি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম, এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের কোনো দাম নেই, কোনো সম্মান নেই।"
ইতি ফিসফিস করে বলল, "সেটাই তো স্বাভাবিক স্যার। অভাব মানুষকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়।"
"ঠিক বলেছ, ইতি," আলতাফ সাহেব একটু থেমে আবার শুরু করলেন। "টাকা তো আমি ঠিকই কামালাম। আজকের এই 'সিরাজ এন্টারপ্রাইজ', এই বিশাল বহুতল ভবন, ব্যাংক ব্যালেন্স—সব আমার হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সাফল্যের সিঁড়ি বাইতে গিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো পেছনে ফেলে এসেছি। আমার কোনো বন্ধু ছিল না, কোনো আনন্দের মুহূর্ত ছিল না।"
তিনি ইতির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটা সত্য প্রকাশ করলেন, যা তিনি জীবনে কখনো কাউকে বলেননি।
"তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না, ইতি—আমার এই জীবনে কখনো কোনো নারীর সাথে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। আমি বিয়ে করিনি। সমাজ আমাকে 'চিরকুমার' বলে জানে। কিন্তু কেউ জানে না যে আমি স্বেচ্ছায় এই চিরকুমার জীবন বেছে নিয়েছিলাম। কারণ আমার বিশ্বাস ছিল, বিয়ে বা সংসার মানেই একটা পিছুটান, একটা দুর্বলতা। আমি চেয়েছিলাম আমার জীবনটা শুধু সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাবে। কিন্তু আজ এই ষাট বছর বয়সে এসে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন দেখি আমার চারপাশে শুধু টাকা আছে, সফলতার ইমারত আছে, কিন্তু পাশে ধরে রাখার মতো আপন বলতে কেউ নেই!"
-----
কথাগুলো বলতে বলতে আলতাফ সাহেবের গলাটা যেন সামান্য কেঁপে উঠল। তাঁর ষাটোর্ধ শক্তপোক্ত শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই নিঃসঙ্গ ও ক্লান্ত মানুষটা যেন হঠাৎ করে বেরিয়ে এল।
তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি হঠাৎ করে সোফায় ইতির ঠিক দিকে একটু ঝুঁকে পড়লেন এবং নিজের ডান হাত বাড়িয়ে ইতির সেই নরম, ফর্সা হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে ফেললেন।
ইতির হাতটা তখন আলতাফ সাহেবের হাতের ছোঁয়ায় সামান্য কেঁপে উঠল। সে আকস্মিক এই স্পর্শে হতবাক হয়ে গেল।
আলতাফ সাহেব অত্যন্ত কাতর ও ভারী গলায় বললেন, "ইতি... আজ এত বছর পর তোমার এই বাসায় এসে, তোমার হাতে তৈরি চা খেয়ে, তোমার সাথে কথা বলে আমার মনে হচ্ছে... আমি ভুল করেছি। বড় ভুল করেছি। টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায়, কিন্তু একটা মানুষের ছোঁয়া, একটা মানুষের ভালোবাসা কেনা যায় না। আজ আমি বুঝতে পারছি, আমি বড় একা... বড় বেশি একা! আমার জীবনে এখন একজন সত্যিকারের সঙ্গীর প্রয়োজন, যে আমার এই বিশাল শূন্য ফ্ল্যাটে আমার দিকে তাকিয়ে বলবে—'সারাদিন কোথায় ছিলে? একটু জল খাও।' কিন্তু আমার জীবনে কেউ নেই!"
ইতির বুকটা আলতাফ সাহেবের এই অসহায় রূপ দেখে কেঁপে উঠল। সে একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী হলেও তার অন্তরের কোমলতা ও মায়া এতটুকু কম ছিল না। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটি আজ তার সামনে একজন একেবারে ভাঙা মানুষের মতো বসে আছেন—দৃশ্যটা সে সহ্য করতে পারছিল না।
ইতি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে, অত্যন্ত মায়ায় ভরা এক দৃষ্টি নিয়ে নিজের হাতটা আলতাফ সাহেবের হাতের ভেতরে রেখেই আলতো করে উল্টো তাঁর হাতটা চেপে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।
সে নরম ও মিষ্টি গলায় বলল, "স্যার... দয়া করে এমন কথা বলবেন না। আপনার মন খারাপ করবেন না তো! আপনি তো এত বড় একটা মানুষ, কত মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন, কত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। আমরা গরিব মানুষ হলেও আপনাকে দেবতার মতো সম্মান করি, ভক্তি করি। আমার স্বামী মালেক সারাদিন আপনার কথা বলে। সে তো সবসময় বলে, সিরাজ স্যার আমাদের দেবতা, উনি না বাঁচালে আমরা কবেই না খেয়ে মরে যেতাম। আপনার মতো মানুষের মনে এত কষ্ট কেন থাকবে স্যার? প্লিজ, আপনি মন খারাপ করবেন না।"
---
আলতাফ সাহেব ইতির সেই সান্ত্বনার সুরে যেন কিছুটা শান্তি পেলেন। তিনি ইতির হাতের নরম উষ্ণতা অনুভব করতে করতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি একটু সামলে নিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা, ইতি... সত্যি করে বলো তো। মালেক তো খুব সাধারণ একজন সিকিউরিটি গার্ড, সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করে, সামান্য বেতন পায়। তুমি তো দেখতে এত সুন্দর, তোমার তো আরও অনেক ভালো জায়গায় বা সচ্ছল পরিবারে বিয়ে হতে পারত। তুমি কি এই গরিব সংসারে মালেককে বিয়ে করে সত্যিই সুখী হতে পেরেছ?"
ইতির মুখে তখন এক মৃদু ও লাজুক হাসি ফুটে উঠল। সে তার মাথাটা একটু নিচু করে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বলল, "সুখ-অসুখ তো মানুষের মনের ব্যাপার, স্যার। আমার জীবন তো এমন কিছু বিলাসবহুল ছিল না যে আমি খুব রাজরানি হয়ে থাকব। মালেক মানুষটা খুব ভালো, সে সারাদিন অনেক পরিশ্রম করে আমাকে ভালো রাখার জন্য। সে আমায় খুব ভালোবাসে।"
সে একটু থেমে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে বলল, "আর আমাদের এই যে আজ একসাথে সংসার করার সুখ, এর মূল কারণ তো শুধু আপনি, স্যার! আপনি যদি সেদিন মালেককে ওই চাকরিটা না দিতেন, যদি মায়া করে ওর কান্নায় ১০,০০০ টাকা মাইনে ঠিক না করতেন, তবে আজ আমাদের এই সংসারটাই হতো না। হয়তো না খেয়ে বা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আমাদের দিন কাটত। তাই আমাদের এই ছোটখাটো সুখের পেছনে একমাত্র আপনারই দয়া রয়েছে।"
ইতি আরও বলল, "বেতন কম হলেও কী হবে স্যার, আমরা তো আর দশটা মানুষের মতো লোভী নই। মালেক যা আনে, আর আমি যেভাবে পারি—দুটো ডাল-ভাত রান্না করে আমরা মিলেমিশে মানিয়ে চলার চেষ্টা করি। আমাদের কোনো বড় চাহিদা নেই। শুধু আপনাদের মতো বড় মানুষের আশীর্বাদ মাথার ওপর থাকলে আমাদের আর কিছু লাগবে না।"
আলতাফ সাহেব ইতির এই সরল ও লোভহীন কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তাঁর মনের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে। তিনি ভাবছেন—যে মেয়েটি এত সুন্দর, এত মায়াবী, যে চাইলে যেকোনো বড় জায়গায় নিজের ভাগ্য খুঁজতে পারত, সে আজ এই সামান্য সিকিউরিটি গার্ডের সাথে একটা ছোট ফ্ল্যাটে কি দারুণ তৃপ্তি নিয়ে বেঁচে আছে!
কিন্তু একই সাথে আলতাফ সাহেবের মনে সেই পুরোনো জেদ আর তীব্র আকর্ষণটা আরও প্রবল হয়ে উঠল। তিনি মনে মনে বললেন—*এই মেয়েটি এই সাধারণ গার্ডের সাথে থাকার জন্য তৈরি হয়নি। এর আসল জায়গা আমার পাশে, আমার সেই বিশাল সাম্রাজ্যের ছায়ায়।*
তিনি ইতির হাতটা নিজের হাত থেকে ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নিলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি তখনো ইতির মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল। বাইরের আকাশটা তখন আস্তে আস্তে গোধূলির আলোয় লালচে হয়ে আসছে, আর ঘরের ভেতরে দুই মানুষের মাঝে তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত, রহস্যময় ও নিষিদ্ধ গল্পের নতুন এক অধ্যায়।
https://i.ibb.co.com/mVGnrHKk/IMG-202608...19-748.png