মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৬০
২
সকাল আটটা বাজতে দশ।
শীতের সকালের কুয়াশা পুরো চত্বরটাকে একটা আবছা, স্লেট-রঙা চাদরে মুড়ে রেখেছে। উত্তর দিক থেকে ভেসে আসা হিমশীতল বাতাসটা মেহগনি গাছের পাতার ওপর জমতে থাকা শিশিরকে ছুঁয়ে এসে ফুটবল মাঠের উপর দিয়ে বয়ে যাবার সময় যেন চামড়ায় সুচ ফুটিয়ে দিচ্ছিল।
মাঠটা কলেজের মেইন একাডেমিক বিল্ডিংয়ের ঠিক পেছনে নয়, কিছুটা উত্তর-পশ্চিম কোণ ঘেঁষে বিস্তৃত। ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাঠের চার ধার ঘেঁষে রয়েছে গ্যালারি, যা মেটাল নেট দিয়ে ঢাকা। উত্তর দিকে কিছুটা গেলে কলেজের ফাঁকা অনাবাদী জমি; যা ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ওখানে চট করে কেউ যায় না। উত্তর-পশ্চিমে গেলে চোখে পড়বে নর্থ ব্লকের হোস্টেলগুলো। এখানে অনেক সিনিয়র স্টুডেন্টরা থাকে।
শেষ ডিসেম্বরের এই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় মাঠের ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে একনাগাড়ে ল্যাপস মেরে চলেছে অয়ন।
তার পরনে একটা ডার্ক ব্ল্যাক ফিটেড কম্প্রেশন টি-শার্ট, গ্রে রানিং ট্রাউজার্স আর পায়ে স্পাইক স্নিকার্স। হুডিটা মাঠের বাইরের বেঞ্চে রাখা।
বিগত কুড়ি মিনিটে সে একবারের জন্যও থামেনি।
ফুসফুসে কনকনে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে আর মুখ থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়ার মতো সাদা ভাপ। কপালের চারপাশ বেয়ে ঘামের বিন্দু ঝরে পড়ে গালের ফিকে হয়ে আসা হলদেটে কালশিটের দাগগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। পাঁজরের চোটটা কড়া পেইন কিলারের দৌলতে এখন আর আগের মতো টনটন করছে না ঠিকই, তবে টানা দৌড়ের চাপে হ্যামস্ট্রিংয়ের পেশিগুলো টান টান হয়ে শক্ত রূপ ধারণ করেছিল।
মিস ব্যানার্জী অয়নকে সাহায্য করার চেষ্টা করলেও, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের বাকি অধ্যাপকেরা ঘটনাটা মোটেও সহজভাবে নেননি। শেষ কয়েকটা দিন অয়নের ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো গেছে।
এক মাস ক্লাস বাঙ্ক মারার ফল সে প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছে।
দৌড়ানোর মাঝেই অয়নের মনটা আচমকা পিছিয়ে গেল গত সপ্তাহে।
মিস ব্যানার্জীর নির্দেশমতো পরের দিনই ল্যাবে গিয়েছিল অয়ন। ল্যাবে ঢোকামাত্রই প্রফেসর পাল নিজের চশমার ওপর দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে একটা তীব্র কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন,
"ওহ! দ্য গ্রেট অয়ন চ্যাটার্জী! তা হঠাৎ করে কলেজের কথা মনে পড়ল যে? নাকি মারপিটের ফাঁকে একটু পড়াশোনা করার ইচ্ছা জাগল ?"
পুরো ল্যাবের সামনে প্রফেসর পালের খোঁচাটা নীরবে হজম করে নেওয়া ছাড়া অয়নের কাছে আর কোন উপায় ছিল না।
সে শুধু মাথা নিচু করে বলেছিল, "আই অ্যাম সরি, স্যার। আমি আগামী তিন দিনের মধ্যে সব পেন্ডিং ল্যাব এক্সপেরিমেন্ট সাবমিট করে দেব।"
প্রফেসর পাল বিরক্তি দেখিয়ে আর কিছু না বললেও ঠিক একই কথা শুনে প্রফেসর চ্যাটার্জী ছেড়ে দেননি। কড়া শিক্ষিকা হিসেবে এমনিই তার বেশ নামডাক আছে।
তিনি অয়নের কথা শুনে চোখের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখা মোটা প্র্যাক্টিক্যাল রেজিস্টার খাতাটা সশব্দে বন্ধ করেছিলেন। আওয়াজটা এত জোরে হয়েছিল যে পুরো নিস্তব্ধ স্টাফরুমে সেটা যেন প্রতিধ্বনি তৈরি করেছিল। আওয়াজটা এত জোরে হয়েছিল যে অয়নের মনে হয়েছিল শব্দটা রুমের সুউচ্চ সিলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে ওর দিকে ছিটকে এল।
"এক মাস ! পুরো তিরিশ দিন আপনি ক্লাসে পা রাখেননি, মিঃ চ্যাটার্জী। উইদআউট এনি রিজন।"
প্রফেসর চ্যাটার্জী কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, তার গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা।
"মিস ব্যানার্জী হয়তো আপনার ওপর একটু বেশিই সহানুভূতিশীল, তাই আপনাকে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমার ক্লাসের আপনার অ্যাটেন্ডেন্স পার্সেন্টেজ ফর্টি-ফাইভের নিচে।
ইউনিভার্সিটি রুল অনুযায়ী আপনার অ্যাডমিট কার্ড হোল্ড হওয়ার কথা, সেটা জানেন নিশ্চয়ই ?"
সেইসময় ফিজিক্স স্টাফরুম প্রায় ফাঁকা ছিল। শুধু হাজির ছিলেন থার্মোডাইনামিক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সুরজিৎবাবু। তিনি আড়চোখে একবার অয়নকে দেখে নিয়ে নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।
তার মুখে এক ধরনের সূক্ষ্ম, কৌতুকপূর্ণ মেজাজ।
অয়ন দাঁড়িয়ে ছিল টেবিলের উল্টোদিকে। পরনে একটা সাধারণ কালচে-ধূসর গোল গলার টি-শার্ট আর জিন্স। কাঁধে ঝোলানো পুরোনো রুকস্যাক। এক মাস আগের অয়ন হলে কী করতো বলা মুশকিল, হয়তো এই অপমানের জবাবে মুখ ঘুরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত।
কিন্তু আজকের অয়ন সেটা করল না। সে নিজের কাঁধটা সোজা রাখল। কথা বলার সময় তার চোখের মনি দুটো এতটুকুও কাঁপল না।
"আমি জানি আমার ভুল হয়েছে, ম্যাম।"
অয়নের গলাটা শান্ত, পরিষ্কার।
"প্র্যাক্টিক্যাল রেজিস্টারের বাকি আটটা এক্সপেরিমেন্টের রিডিং আর গ্রাফ আমি আগামী সোমবার বিকালের মধ্যে আপনার টেবিলে জমা করে দেব।"
প্রফেসর চ্যাটার্জী চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
"আটটা কঠিন এক্সপেরিমেন্টের ডেটা ক্যালকুলেশন দু-দিনে ? আপনি কি রসিকতা করছেন ? অন্য স্টুডেন্টদের থেকে টুকে জমা দেবেন ভাবছেন?"
"না, ম্যাম। ডাটাগুলো ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে নেওয়া অরিজিনাল র-রিডিং থেকেই ক্যালকুলেট করব। আপনি ইচ্ছে করলে পরশুদিন ল্যাবে দাঁড়িয়ে আমার ভাইভা নিতে পারেন। যদি একটাও ভুল পান, আমার অ্যাডমিট কার্ড আটকে দেবেন। আই ওন্ট কমপ্লেন।"
নবনীতা চ্যাটার্জী কয়েক মুহূর্ত ওর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে অয়নের মুখটা পড়তে চেষ্টা করলেন।
ছেলেটার কথাগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে ঠিকই কিন্তু তার মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণভাবও রয়েছে।
"ঠিক আছে।"
ভেতরের কৌতূহলটা চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নবনীতা খাতাটা আবার নিজের দিকে টেনে নিলেন।
"সোমবার বিকেল চারটে। একটা ক্যালকুলেশন মিস হলে প্র্যাক্টিক্যাল মার্কস জিরো বসাব।"
অয়ন শুধু হালকা মাথা নোয়াল।
"থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাম।"
সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একবার নিজের কবজিটা দেখেছিল, বেলা আড়াইটে। পেটে খিদে নেই, মাথায় এক মাস ধরে জমা হওয়া পড়াশোনার সুবিশাল পাহাড়। অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে লালে লাল হয়ে থাকা শূন্যতা ওর মনস্তত্ত্বে নাড়া দিয়েছিল।
অয়ন বুঝতে পারছিল, আবেগের ঘোরে মায়ের ওপর ক্ষোভে হোস্টেলের ঘরে নিজেকে বন্দি রেখে, সে আসলে নিজের ভবিষ্যতের উপর নিজেই কুড়ুল মেরেছিল।
আজ তার পাশে কেউ নেই। না আছে মা আর না আছে বন্ধু-বান্ধব।
তবে এই নির্মম উপলব্ধির পরও অয়নের ভেতরে কোন অস্থিরতা জন্ম নেয়নি। কারণ অয়ন মনে মনে মেনে নিয়েছিল, এখন তার সামনে শুধুই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আর সেটা তাকে একাই লড়তে হবে।
আবেগের দিন শেষ, এখন গাধার মতো খেটে নিজের হারিয়ে যাওয়া জমি উদ্ধার করতে হবে।
সেই চরম জেদ থেকেই গত শুক্রবার থেকে রবিবার, এই তিনদিনে অয়ন ঘুমিয়েছে মাত্র দশ ঘণ্টা। রাত জেগে একদিকে সুরঙ্গনা ব্যানার্জীর থিওরি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করা আর অন্যদিকে একই সাথে প্রফেসর চ্যাটার্জীর আট-আটটা কঠিন প্র্যাক্টিক্যালের জটিল ক্যালকুলেশন, গ্রাফ প্লটিং আর ভাইভার প্রিপারেশন নেওয়া।
গতকাল অর্থাৎ সোমবারে সে সব ক্লিয়ার করে এসেছে ঠিকই, কিন্তু লড়াই তো কেবল শুরু।
দৌড়ের গতি একটু কমাল অয়ন। বুক ভরে ঠান্ডা বাতাস টেনে নিয়ে আবার ভাবল। অন্য সাবজেক্টের শিক্ষকদের ক্লাসে তো এখনও যাওয়াই হয়নি। সেখানে গেলে না জানি আরও কত কী শুনতে হবে, কত অ্যাসাইনমেন্ট ক্লিয়ার করতে হবে !
অথচ, সামনেই সেমিস্টার এক্সাম। এসব প্র্যাক্টিক্যাল আর অ্যাসাইনমেন্টের চক্করে মূল সিলেবাসের প্রিপারেশন সে এখনো শুরুই করতে পারল না।
তবে এই পরিস্থিতির জন্য অন্য কেউ নয়, সম্পূর্ণভাবে সে নিজেই দায়ী।
মাঠের ঠিক বাইরে, লোহার সাইডলাইনের রেলিংয়ে একহাতে গরম চায়ের ভাঁড় আর অন্য হাতে স্টপওয়াচ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কোচ সেনগুপ্ত। ওনার পরনে একটা মোটা ট্র্যাকস্যুট, মাথায় উলের টুপি। উনি তীক্ষ্ণ চোখে অয়নের গতিবিধি, তার পেসিং আর পায়ের স্ট্রাইড পর্যবেক্ষণ করছেন।
অয়ন ল্যাপটা শেষ করে কোচ সেনগুপ্তর সামনে এসে থামল। সে দুই হাঁটুতে দু-হাত দিয়ে একটু ঝুঁকে গভীর শ্বাস নিতে শুরু করল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
"স্টপওয়াচ বলছে চার কিলোমিটার কুড়ি মিনিটে।" কোচ সেনগুপ্ত চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বললেন, তার গলায় নিস্পৃহ ভাব।
অয়ন সোজা হয়ে দাঁড়াল। তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছে হাঁফাতে হাঁফাতে ভাবে বলল,
"আই অ্যাম রেডি, স্যার। আমাকে আজকে টিমে রাখুন।"
কোচ সেনগুপ্ত ওনার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের মতো শব্দ করলেন।
"রেডি? কিসের রেডি? চার কিলোমিটার ল্যাপস মেরে তোমার কোয়াড্রিসেপস কাঁপছে, চ্যাটার্জী। অ্যাথলেটিক ফিটনেস আর ম্যাচ ফিটনেসের মধ্যে তফাত বোঝো ? তোমার এখনকার ম্যাচ ফিটনেস একদম জিরো।
গত এক মাসে একটাও ম্যাচ খেলোনি আর তুমি ভাবছ সোজা ফার্স্ট ইলেভেনের সাথে গেমে নেমে যাবে?"
"আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, স্যার... "
"তোমার কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেটা বোঝার জন্য আমি এখানে আছি। একবার হ্যামস্ট্রিং বা কুঁচকির মাসল পুল করলে পুরো স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপটা তোমাকে বেঞ্চে বসে কাটাতে হবে। আমি কোন কথা শুনব না। আজকে শুধুই লাইট ড্রিলস, কোন প্র্যাকটিস ম্যাচ নয়। আগে পাঁচটা কোণ-ড্রিল শেষ করো, তারপর ল্যাটারাল জাম্প। ওসব জেদ এখানে এসে দেখাবে না।"
কোচ সেনগুপ্ত কড়া গলায় জবাব দিলেন। অয়ন কোচের সাথে কোনরকম তর্কে গেল না। সে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে ডাবল-কোন রাখা জায়গাটার দিকে হেঁটে গেল।
কোণ-ড্রিল আর ল্যাটারাল জাম্প কমপ্লিট করে পরের আধ ঘণ্টা সে একটানা লেডার ড্রিলস, শর্ট স্প্রিন্ট আর বল কন্ট্রোল ড্রিল করল। ফুটওয়ার্ক করার সময় তার মিঃ প্রধানের বলা কথাটা মনে পড়ছিল - "পেশাদার বক্সিং বা ক্যারাটের ফুটওয়ার্ক ফুটবলেও সাহায্য করে।"
মিস্টার প্রধানের কথাগুলো মনে পড়তেই অয়ন খেয়াল করল, আজকে তার বডি ব্যালেন্স আগের চেয়ে স্টেডি। টার্ন নেওয়ার সময় তার শরীর হেলে পড়ছে না আর টার্ন নিতে আগের থেকে একটু হলেও সময় কম লাগছে।
সে মনে মনে ঠিক করল পরের ক্লাসে সে এই বিষয়ে মিঃ প্রধানের সঙ্গে কথা বলবে।
৩
মাঠে বল গড়াচ্ছে।
প্রথমে একদম রাজি না হলেও, প্র্যাকটিস ম্যাচের শেষ দশ মিনিটে কোচ সেনগুপ্ত অয়নকে অপনেন্ট টিমের বিপক্ষে নামিয়েছেন। তবে একইসাথে সে যেন বেশি স্ট্রেইন না নেয় সে বিষয়ে বারবার সতর্কও করে দিয়েছেন।
অয়নের ম্যাচ ফিটনেস কোথায় আছে, সেটা ফিরিয়ে আনতে কতদিন লাগবে, সেটা দেখে নেওয়ার জন্য কোচের কাছে এই সময়টুকু যথেষ্ট।
অনেক দিন পরে মাঠে নেমে অয়ন খুব একটা খারাপ খেলেনি। একটা লং পাস রিসিভ করে সে খুব আলতো ছোঁয়ায় বলটাকে সহজেই নিজের নিয়ন্ত্রণে আনল। সামনে থাকা দুজন ডিফেন্ডারকে কেবল একটা বডি ফেক আর হালকা ডিরেকশন চেঞ্জে পরাস্ত করে সে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়ল। পুরো মুভমেন্টটা এত মসৃণ এবং নিখুঁত ছিল, যে কোচ সেনগুপ্ত মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে হালকা করতালি দিয়ে উঠলেন।
"হুম... ওর অ্যাটিটিউড যেমনই হোক, খেলে কিন্তু দারুণ।"
গ্যালারির ওপরের দিকে বসে থাকা দুজন মেয়ের একজন কফির ক্যানে চুমুক দিয়ে কথাটা বলল। অন্যজন কোনো উত্তর দিল না, যদিও তার চোখ দুটো অয়নের পিঠের দিকেই আটকে ছিল।
প্র্যাকটিস ম্যাচ শেষ হতে সাড়ে নটা বাজল। সবাই একে একে বেরিয়ে যেতে লাগল।
অয়ন বাইরেই বোতলের জলে মুখ-হাত ধুয়ে নিল। তার হাতে একদমই সময় নেই; অন্য সাবজেক্টের টিচারদের সে এখনও অবধি ফেস করার সময় পায়নি। ডর্মে ফিরে অল্প কিছু খেয়ে তাকে পড়তে বসতে হবে।
ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে সে হুডিটা গায়ে চড়িয়ে নিল।
ব্যাগটা কাঁধে তুলতে যাবে, ঠিক তখনই হিমশীতল বাতাস চিরে একটা পরিচিত পারফিউমের সুবাস ওর নাকে এল।
“হেই অয়ন! গড, ইউ লুক এক্সহস্টেড!"
অয়ন মুখ তুলে তাকাতেই স্থির হয়ে গেল।
মাঠের সাইডলাইন ধরে ওর দিকে হেঁটে আসছে দুজন মেয়ে।
সকালের হালকা রোদে বৈশালীকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। তার পরনে একটা বেগুনি রঙের ক্রপ-টপ, যা তার মেদহীন অনাবৃত পেট আর ধারালো কোমরকে স্পষ্ট করে তুলেছে, আর নিচে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ফেডেড ডেনিম শর্টস, যাতে তার দীর্ঘ, মসৃণ উরু অনাবৃত। ঠোঁটে গাঢ় প্লাম রঙের লিপস্টিক, হাই-পনিটেল করা চুল দুলছে, আর কপালে তোলা দামি রে-ব্যান সানগ্লাস। চোখে-মুখে এক উদ্ধত, অহংকারী সৌন্দর্য।
পাশে দাঁড়িয়ে জিনিয়া, ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
অয়নের মনে পড়ে গেল মিস ব্যানার্জীর ফিজিক্স ক্লাসে বৈশালীর ওর দিকে কটমট করে চেয়ে থাকার কথা।
অয়ন ডিনিয়ার দিকে ঘাড় নেড়ে একটু হাসার চেষ্টা করল।
“হ্যাঁ জিনিয়া।”
তারপর সোজাসুজি পয়েন্টে এল,
"তুমি কিছু বলবে ?"
জিনিয়া বৈশালীর দিকে একবার তাকাল, তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
"নেক্সট উইকে আমাদের নিউ ইয়ার্স পার্টি আছে। ইউ শুড কাম। একটা চেঞ্জ হবে তোমার জন্য।"
যেন ওরা কতদিনের বন্ধু। মাঝের ক'মাস যে কোন যোগাযোগ নেই সেটা মনেই হয় না।
অয়ন সামান্য ইতস্তত করল।
"জিনিয়া, আমি এখন একটু ব্যস্ত।"
সেমিস্টার এক্সামের আর একমাসও বাকি নেই। সিলেবাস কভার করার জন্য অনেক খাটতে হবে।
"কাম অন অয়ন ! প্লিজ, জাস্ট ফর ওয়ান আওয়ার? রাত ৯টার পর আসলেও চলবে।"
জিনিয়া অনুরোধের সুরে বলল।
অয়ন এক সেকেন্ড ভাবল।
"আই উইল ট্রাই।"
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সে জুতো পাল্টে স্নিকার্স পরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ইঙ্গিতটা পরিষ্কার।
কথা শেষ, তোমরা এবার আসতে পার।
সেটা বুঝতে পেরে জিনিয়া হেসে বলল, “গ্রেট! তাহলে আজ আমরা আসি, বৈশালী চল- ”
"তুই এগো, আমি আসছি।"
বৈশালী জিনিয়াকে এড়িয়ে গিয়ে সটান অয়নের দিকে পা বাড়াল।
জিনিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে গেল। নিজের বন্ধুকে সে ভালোই চেনে, অয়নকে সে এখন কী কী বলবে সেই বিষয়ে ওর ধারণা আছে। তবে সে বৈশালীকে সমর্থন করে না; ওর চোখে বৈশালীর বর্তমান বয়ফ্রেন্ড একটা জোকার ছাড়া আর কিছু নয়।
সে হেসে হাত নেড়ে অন্যদিকে হেঁটে চলে গেল।
সেই খাঁ খাঁ করা মাঠের এক কোণে, বিশাল গ্যালারির মেটাল ফেন্সিংয়ের পেছনে এখন শুধু অয়ন আর বৈশালী। সকালের রোদ এসে পড়ছে গ্যালারির সিটগুলোর ওপর। বাতাসে ঘাম আর ভেজা ঘাসের গন্ধ।
“কী চাও বৈশালী?”
অয়ন ঘাড় তুলে ওর দিকে তাকাল। ওর গলার আওয়াজ একদম ফ্ল্যাট, তাতে কোনরকম আবেগ নেই।
বৈশালী এক পা এগিয়ে এল। ওর গায়ের পারফিউমের তীব্র গন্ধটা এসে অয়নের নাকে ধাক্কা মারলো। বৈশালীর চোখে-মুখে রাগের স্পষ্ট ছাপ।
"কী চাই? সিরিয়াসলি অয়ন? নিজেকে ভাবটা কী বল তো তুমি ? হু দ্য হেল ডু ইউ থিংক ইউ আর?"
ওর গলাটা রাগে কাঁপছিল।
অয়ন কোন জবাব দিল না। সে কেবল একটা শান্ত দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইল।
কলেজে সদ্য ভর্তি হবার পরে মায়ের প্রতি নিজের নিষিদ্ধ আকর্ষণ ভোলার জন্য অয়ন তখন নিয়মিত বিভিন্ন মেয়ের সাথে ডেটে যেত আর কিছুদিন পর পর তাদের ডিচ করত। বৈশালী সেই অতীত অধ্যায়েরই একটা পৃষ্ঠা, তবে নিঃসন্দেহে সবচাইতে স্পেশাল।
"ইউ জাস্ট ইউজড মি! রাইট?"
বৈশালীর গলার আওয়াজ চড়তে লাগল,
“তোমার লজ্জা করে না লোকের ইমোশন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে ? তোমাদের মতো বখে যাওয়া, সাইকো ছেলেদের স্বভাবই এটা! যেখানেই যাবে, সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে চলে আসবে। তোমরা মনে কর গোটা দুনিয়াটা তোমাদের ইশারায় নাচে, তাই না ? হাউ ক্যান ইউ বি সো হার্টলেস?"
অয়ন একটা লম্বা শ্বাস নিল, যেভাবে হোক তাকে এখানে নিজের মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতেই হবে। সে অত্যন্ত ধীরভাবে, ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
“আমি তোমাকে কোন প্রমিস করিনি বৈশালী।অ্যান্ড আই নেভার ইউজড ইউ। তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার সাথে ঘুরতে গিয়েছিলে।
উই ওয়ার নেভার আ থিং। ইট ওয়াজ ক্যাজুয়াল। এত নাটক করার কোনো অর্থ হয় না।”
“ক্যাজুয়াল? নাটক?”
বৈশালীর মুখের রঙ রাগে লাল হয়ে গেল। তার চোখ দুটো যেন আরো হিংস্র হয়ে উঠল। সে এক পা আরো এগিয়ে এসে অয়নের খুব কাছাকাছি দাঁড়াল, এতটাই যে ওর ঘন নিশ্বাস নিজের ঠোঁটে এসে পড়ছে বলে অয়নের মনে হল। রাগে-ক্ষোভে বৈশালীর সুন্দর মুখটা লাল হয়ে উঠেছে।
"তুমি এটাকে নাটক বলছ, অয়ন? ইউ রিয়্যালি হ্যাভ নো সাইড অফ কনসায়েন্স, রাইট? তোমার কাছে আমার ফিলিংসগুলো জাস্ট একটা নাটক ছিল ?
আমি কতখানি জেনুইন ছিলাম তোমার সাথে, আর তুমি আমাকে জাস্ট একটা ক্যাজুয়াল অপশন বানিয়ে রেখে দিলে?"
বৈশালী অয়নের বুকের কাছে আঙুল উঁচিয়ে বলে চলল,
"কোন ছাঁচে তৈরি তুমি অয়ন? ভালোবাসার নাটক করো, কিন্তু তোমার ভেতরে কোন মানুষের বাস নেই! কোন মা তোমাকে জন্ম দিয়েছে ? তোমার মতো একটা নিচু মানসিকতার সেলফিশ ছেলের শরীরের মধ্যে নিশ্চয়ই কোন না কোন নোংরা রক্ত বইছে! কোন মায়ের গর্ভে তোমার মতো একটা কোল্ড, সেলফিশ দানব তৈরি হয়, আমার জানতে ইচ্ছে করে!"
ও চুপচাপ বৈশালীর অপমানজনক কথাগুলো হজম করে নিচ্ছিল; কিন্তু, 'মা' শব্দটা শোনামাত্রই অয়নের ভেতরে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি লাগল।
গত এক মাস ধরে যে নামটাকে সে বুকচাপা যন্ত্রণার নিচে পুঁতে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, যার স্মৃতিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল, তার নামটা বৈশালীর মুখে এরকমভাবে শুনে ওর মাথার ভেতরের রগগুলো মুহূর্তের মধ্যে দপদপ করে উঠল।
রাগে তার চোখের মণি দুটো কুঁকড়ে এল।
চোখের পলকে অয়নের চেহারার শান্ত ভাবটা মিলিয়ে গেল। কথা না বলে সে নিঃশব্দে এক পা এগোতেই তার মুখের হিংস্র ভাব দেখে বৈশালী ভয়ে পিছিয়ে গেল। অয়নের এই মূর্তির সাথে তার পরিচয় আছে। অয়নের ছায়াটা বৈশালীর পুরো শরীরের ওপর এসে পড়তেই ও এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল। বৈশালীর নিঃশ্বাস আটকে এল...কিন্তু অয়ন তার উপর এগিয়ে এসে গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, একটা কথাও বলল না। কেবল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
তার চোখেমুখে একটা অবজ্ঞা ফুটে উঠল। সে যে বৈশালীর এই ভয় পাওয়াটা উপভোগ করছে, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। নিজের দুর্বলতা আর অয়নের চোখের অসীম তাচ্ছিল্য বৈশালীর ইগোতে তীরের মতো গিয়ে বিধল।
মুহূর্তের মধ্যে ভয়ের জায়গাটা দখল করে নিল তীব্র অপমানবোধ আর নিজের প্রতি ক্ষোভ। যে ছেলেটা তাকে ইউজ করে ফেলে দিয়েছে সে তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে তাচ্ছিল্য দেখাচ্ছে ? অয়নের চোখে ওর দুর্বলতা ধরা পড়ে যাবার অপমানটা ও কিছুতেই হজম করতে পারছিল না।
মাথা ঠিক রাখতে পারল না বৈশালী।
গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে, তীব্র রাগে ফুঁসে উঠল সে,
"ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড ! তোমাকে আমি এমন শিক্ষা দেব...!”
ডানহাত তুলে অয়নকে চড় মারতে গেল বৈশালী।
কিন্তু, তার হাতটা অয়নকে স্পর্শ করার আগেই সে কুইক রিফ্লেক্সে বৈশালীর কবজিটা শূন্যে ধরে ফেলল। অয়নের আঙুলগুলো লোহার চিমটের মতো বৈশালীর নরম, গম-রঙা চামড়ায় বসে গেল।
“ডোন্ট।”
অয়ন অত্যন্ত নিচু গলায় সতর্ক করল। মেয়েটা সত্যিই ওর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে ভালবাসে।
বৈশালী ব্যথায় ফুঁসে উঠল, কিন্তু একইসাথে অয়নের হাতের স্পর্শ, ওর শরীরের আঁচ, বৈশালীর শরীরের ভেতর দিয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত শিহরণ বইয়ে দিল।
“ছাড়ো আমায়! ইতর কোথাকার !”
বৈশালী দাঁতে দাঁত চেপে অয়নকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করল, কিন্তু শক্তিতে অয়ন তার চেয়ে বহু গুণ এগিয়ে। সে একচুলও নড়ল না।
চোখের পলকে সে বৈশালীর অন্য হাতটাও একইভাবে ধরে ফেলল।
তারপর এক মোচড়ে বৈশালীর দুটো হাতই ওর মাথার ওপর তুলে গ্যালারির কোল্ড মেটাল ফেন্সিংয়ের সাথে চেপে ধরল।
“উফ...!”
মেটাল নেটের সাথে ধাক্কা খেতেই বৈশালীর পিঠটা ঝনঝন করে উঠল। অয়ন বৈশালীর একদম কাছাকাছি এগিয়ে এল। তাদের মাঝখানে এক ইঞ্চি দূরত্বও খালি নেই।
নিজেকে ছাড়ানোর জন্য বৈশালী মোচড়া মুচড়ি করে বেরোনোর চেষ্টা করল, কিন্তু পেছনে ঠান্ডা মেটাল নেটিং আর সামনে অয়নের চওড়া, পাথরের মতো শক্ত বুকের খাঁচা। ওর পালানোর সব রাস্তা বন্ধ।
তার উপর, স্পোর্টস শর্টসের ওপর দিয়ে অয়নের উরুর শক্ত কঠিন পেশি সরাসরি এসে চেপে বসেছে ওর শর্টস পরা পায়ের ওপর। চামড়ায় চামড়ার ঘষা লাগতেই বৈশালীর মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল। ও ছিটকে সরে যেতে চাইল, কিন্তু পা দুটো যেন মাটির সাথে জমে গেছে। না চাইতেই নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, ওর বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
বৈশালী চোয়াল শক্ত করে রাগটা ধরে রাখতে চাইল। ওর চোখে একদিকে প্রচণ্ড রাগ আর অপমানের আগুন, অন্যদিকে অয়নের এই আচমকা শারীরিক আধিপত্যের ফলে সেই রাগের নীচে জমা হতে থাকা অবদমিত তীব্র আকর্ষণ।
এমন সময় ওর চোখে চোখ রাখতে বৈশালীর শ্বাস আটকে এল। অয়নের চোখ দুটো এখন কুচকুচে কালো, সেখানে দয়া বা ভালবাসা, কোনটাই নেই।
“তুমি একইরকম রয়ে গেছ, বৈশালী। একটুও বদলাও নি।”
অয়ন ওর একদম মুখের ওপর ঝুঁকে, ডান হাতে ওর চিবুকটা তুলে ধরে ফিসফিস করে বলল। কথা বলার সময় ওর গরম শ্বাস এসে বৈশালীর নরম ঠোঁটের উপর আছড়ে পড়ছিল।
“তোমার এই ক্ষোভ, এই রাগ... এটা কী আমার প্রতি তোমার ঘৃণার জন্য? না ! এটা তোমার স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছু নয়। যখন কোনকিছু তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যায়, তখন তুমি ঠিক এভাবেই পাগলের মতো আচরণ করো।”
কথাগুলো বলার সময় অয়নের চোখের সামনে আচমকা চন্দ্রিমার ছবিটা ভেসে উঠল। দুজনের মধ্যে ভালোই মিল আছে। ওকে আবার ওই মেয়েটার সাথে ছয় মাস কাটাতে হবে। কথাটা চিন্তা করতেই অয়নের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল।
"ঠিক এইজন্য আমি তোমার সাথে ব্রেকআপ করেছিলাম।”
বৈশালীর চোখে চোখ রেখে অয়ন কথাগুলো ছুঁড়ে দিল।
খোঁচাটা খেয়ে রাগে ওর চোখমুখ লাল হয়ে উঠল।
“ইউ... ইউ অ্যারোগ্যান্ট...” বৈশালী গালি দিতে গেল, কিন্তু ওর গলা কেঁপে উঠল।
অয়ন বৈশালীর কথা শেষ হতে দিল না। তার অন্য হাতটা ততক্ষণে বৈশালীর সরু কোমর পেঁচিয়ে ওকে এক ঝটকায় নিজের শরীরের দিকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
দুজনের মাঝে ব্যবধানের শেষ সেন্টিমিটারটুকুও মুছে গেল।
বৈশালীর চোখের সামনের পৃথিবীটা এবার ঘুরতে শুরু করল। তার মুখ দিয়ে আর কোন শব্দ বেরলো না। সে পরিষ্কার টের পেল অয়নের স্পোর্টস শর্টসের ভেতর আটকে থাকা শক্ত, উত্তপ্ত পুরুষাঙ্গটা ওর তলপেটের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বৈশালীর মেদহীন তলপেটে এক অচেনা বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল।
বৈশালী এতক্ষণ তার শারীরিক অনুভূতিগুলোকে রাগ আর অভিমান দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছিল। কিন্তু, এবার সে আর পারল না। অয়নের এই তীব্র শারীরিক অনুভূতির নিচে এতদিনের জমানো রাগ, ক্ষোভ, অভিমান গলে জল হয়ে যেতে লাগল। ওর চোখ দুটো ভিজে আসা আবেগে আধবোজা হয়ে এল, হৃদস্পন্দন পাগলের মতো ধুকপুক করছে।
অয়ন বৈশালীর চোখে এই মানসিক পরিবর্তনটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল।
সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না, বৈশালীর হাত দুটো ওপরে ধরে রেখেই এক মোচড়ে ওকে উল্টে দিল।
জালের ঠান্ডা লোহা বৈশালীর গাল, বুক আর ক্রপ-টপের ওপর থেকে উন্মুক্ত পেটের উপর চেপে বসল।
অয়ন পেছন থেকে একদম সেঁটে দাঁড়াল। বৈশালীর পিঠের ওপর ওর চওড়া বুকের চাপ।
বৈশালী শ্বাস টানতে টানতে নিজের অজান্তেই তার দুটো হাত দিয়ে জালের লোহা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
তার শরীরের ভেতরের রাগটা এখন তীব্র শারীরিক ব্যাকুলতার রূপ নিতে শুরু করেছে। সে আর নিজেকে এখান থেকে সরাতে চাইছে না। বরং, অয়নের এই ডমিনেশন তার শরীর-মনকে এক অদ্ভুত উত্তেজনায় অবশ করে ফেলছে।
অয়ন বৈশালীর কোমরের দুই পাশ দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ওকে সামান্য ওপরের দিকে টেনে নিজের দিকে সাঁটিয়ে নিল। তার কঠিন শরীরের সম্পূর্ণ চাপ এসে বৈশালীর পিঠ আর নিতম্বের উপর পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ওদের পোশাকের ব্যবধানটুকু পার হয়ে অয়নের স্পোর্টস শর্টসের ভেতর টানটান হয়ে ওঠা শক্ত লিঙ্গটা বৈশালীর পাতলা ফেডেড ডেনিম শর্টসের ওপর দিয়ে ওর উঁচিয়ে থাকা গোল পাছার খাঁজে সরাসরি গিয়ে সরাসরি ঘষা খেল।
বৈশালীর শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র বিদ্যুত তরঙ্গ নেমে গেল। সে অবশ হয়ে মেটাল জালের ঠান্ডা লোহাটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
“শাস্তি পাওয়ার অভ্যাস তো তোমার পুরোনো, তাই না বৈশালী।"
উত্তরের অপেক্ষা না করে অয়ন এক হাতে বৈশালীর চুলটা মুঠি করে ধরে ওর মাথাটা সামান্য পেছনে টেনে আনল আর অন্য হাতটা সজোরে নামিয়ে আনল বৈশালীর কোমরের নিচে। ডেনিম শর্টসের ওপর দিয়েই অয়নের চওড়া, ভারী হাতটা বৈশালীর বাম নিতম্বে সশব্দে আছড়ে পড়ল।
ঠাস!
“আহহহ...!”
বৈশালীর মুখ থেকে একটা অনিয়ন্ত্রিত শীৎকার ঠিকরে বের হয়ে এসে গ্যালারির চারকোণায় ছড়িয়ে গেল। তীব্র ব্যথার চাবুক বৈশালীর পুরো নিতম্বে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র, আদিম কামনার স্রোত ওর মেরুদণ্ড বেয়ে সোজা মাথার দিকে উঠে গেল।
অয়ন থামল না। সে বৈশালীর চুল ধরে টেনে ওর কানটাকে নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এলো।বৈশালীর পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল।
"তোমার অহংকারটা বরাবরই একটু বেশি, বৈশালী। তুমি ভেবেছিলে চিৎকার করে, গালি দিয়ে আমাকে অপরাধী বানিয়ে দেবে ?
নাও ইটস পানিশমেন্ট টাইম।”
সে আবার হাতটা ওঠাল, এবার আরও জোরে বৈশালীর অন্য পাশের নিতম্বে চালাল। ডেনিম কাপড়ের ওপর দিয়ে সেই আঘাতের শব্দ আবারও গোটা মাঠে ছড়িয়ে পড়ল।
ঠাস!
“ওহ গড... অয়ন... প্লিজ...”
বৈশালীর পা দুটো কেঁপে উঠল। তার হাঁটু দুটো অবশ হয়ে আসছে। মেটাল নেটিং আঁকড়ে না ধরলে হয়তো সে ওখানেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। নিতম্বের তীব্র জ্বলন আর কামনার তীব্রতায় তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তার সংক্ষিপ্ত ডেনিম শর্টসের নিচে থাকা প্যান্টি ততক্ষণে ভেজা কামরসে সিক্ত হয়ে উঠেছে।
পিছন থেকে অয়নের শক্তিশালী উরুর চাপ, তার শরীরের ওজন পেছন থেকে বৈশালীকে একদম পিষে ফেলছিল।
“এখনও বদলা নেওয়ার ইচ্ছা আছে তো , বৈশালী ?”
অয়ন বৈশালীর কানের লতিটা কামড়ে ধরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
এবার জবাবে বৈশালী আর কোন গালি দিল না। কোন প্রতিরোধও করল না। সে ব্যাকুলভাবে নিজের নিতম্বটা পেছন দিকে অয়নের পুরুষাঙ্গের ওপর আরেকটু চেপে হালকা দুলিয়ে দিল, অয়নের শক্ত পুরুষাঙ্গের ওপর ঘষে নিয়ে
নিজেকে সঁপে দিল।
“অয়ন... ইউ ফাকিং ডেভিল... প্লিজ...”
৪
মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ি দেখছিল জিনিয়া। ঘড়ির কাঁটা সোয়া দশটা ছুঁইছুঁই। পৌনে একঘণ্টা হতে চলল, অথচ বৈশালীর আসার কোনো নামগন্ধ নেই!
কী এত কথা হচ্ছে দুজনের মধ্যে? অথচ, ও প্রথমে মাঠে ঢুকতেই চাইছিল না !
জিনিয়া একটা সরু সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার হালকা রিং ছাড়ল।
বিপ... বিপ...
স্মার্টফোনের ভাইব্রেশনে তার চিন্তার সূত্র কেটে গেল। ভুরু কুঁচকে পকেট থেকে ফোনটা বের করল জিনিয়া। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে দেবমাল্যর নাম, বৈশালীর বর্তমান রিচ-কিড বয়ফ্রেন্ড।
অ্যানসার না করে মেসেজ বক্সটা খুলল জিনিয়া। দেবমাল্য পাঠিয়েছে:
"হাই জিনিয়া, বৈশালী কি তোমার সাথে আছে? ও লাস্ট এক ঘণ্টা ধরে আমার কল পিক করছে না। এনি প্রবলেম?"
মেসেজটা পড়া মাত্রই জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা কৌতুকপূর্ণ হাসি ফুটে উঠল।
সে একবার দূরে স্পোর্টস কমপ্লেক্সের খাঁ খাঁ করা গ্যালারিটার দিকে তাকাল। তার চোখ জোড়া একবার দূর নির্জন গ্যালারির ধাতব ফেন্সিংয়ের আড়ালে, যেখানে ও শেষবার অয়ন আর বৈশালী একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল; জিনিয়া চোখ সরু সেদিকে তাদের খুঁজতে ব্যর্থ চেষ্টা করল।
কিছু কিছু মানুষ কাকোল্ড হওয়ার জন্যই জন্মায়।
সে একহাতে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ধীরেসুস্থে দেবমাল্যের জন্য মেসেজ টাইপ করতে শুরু করল:
"রিল্যাক্স দেব। বৈশালীর গাড়ির টায়ারে একটা পাংচার হয়েছিল। আমরা গ্যারেজেই আছি, ও আধা ঘণ্টার মধ্যে ফ্রি হয়ে তোকে কল করবে।"
সেন্ড বোতামে চাপ দিয়ে জিনিয়া ফোনটা পকেটে রেখে দিল। তারপর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মনে মনে হাসল,
আফটারঅল, বেস্টফ্রেন্ডকে কভার করা আর তাকে সেফ রাখাটা ওর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
‘বেচারা দেবমাল্য! তোর গার্লফ্রেন্ড এখন তার এক্সের কাছে স্পেশাল ক্লাস নিচ্ছে। তুই আপাতত চুপচাপ বসে আঙুল চোষ!’